রমজানে দ্রব্যমূল্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:২১ এএম
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:১৬ পিএম
দুয়ারে কড়া নাড়ছে সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র মাহে রমজান। এরই মধ্যে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম একটু একটু করে বাড়তে শুরু করেছে।
সংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির মাস রমজান। কিন্তু বাস্তবতায় এই মাসটি নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে বাড়তি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুয়ারে কড়া নাড়ছে সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র মাহে রমজান। এরই মধ্যে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম একটু একটু করে বাড়তে শুরু করেছে। এতে সাধারণ মানুষের অস্বস্তি বাড়ছে। ইফতার ও সেহরির চাহিদাকে পুঁজি করে ইতোমধ্যে ছোলা, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ এবং গরম মসলার দাম আরেক দফা বেড়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে এলাচ, কিশমিশ, আলুবোখারাসহ বিভিন্ন মসলার দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে, রাজধানীর বাজারে মসলার দামে হঠাৎ ঊর্ধ্বগতি ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। এমনিতেই বছরজুড়ে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করে। তবে রমজান মাসে এটি ভোক্তাদের জন্য আরও নাভিশ্বাসের কারণ হয়ে ওঠে।
৭ ফেব্রুয়ারি
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘রমজান মাসকে সামনে রেখে মসলার দামে অস্বস্তি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে
এ তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দিন আগেও যেসব মসলা সহনীয় দামে পাওয়া
যাচ্ছিল, সেগুলোর দাম হঠাৎই বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে এলাচের দাম। আগে যে এলাচ কেজিপ্রতি
৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, বর্তমানে তা ৫ হাজার ৫০০ টাকা। একইভাবে আলুবোখারার
দাম ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০০ এবং কিশমিশের ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০০ টাকা ছাড়িয়েছে। অন্যান্য
মসলার দামেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। শেষপর্যন্ত আকাশছোঁয়া এ দাম কোথায় গিয়ে
থামবে তা নিয়ে এখনই ভোক্তাদের যত চিন্তা।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি
পোহাতে হয় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের। অথচ প্রতিবারই রমজান এলে সরকারের
সংশ্লিষ্টরা সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেন। বলা হয়, রমজানে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোরভাবে
বাজার পর্যবেক্ষণ করা হবে। বলা হয়, রমজানে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা হবে। কিন্তু
বাস্তবতা তথৈবচ। আদতে হয় না এসবের কোনোকিছুই। ঘটে না আশ্বাসের প্রতিফলনও। এবারও
তার ব্যতিক্রম হয়নি।
এ
কথা সত্য যে, রমজান মাসকে কেন্দ্র করে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কিছুটা বাড়েÑ এটি স্বাভাবিক।
সেই কারণে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে জোগানও নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু চাহিদা বাড়লেই অস্বাভাবিক
হারে দাম বাড়বে কেন? এই প্রশ্ন বরাবরের। দেখা গেছে, দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ থাকার
পরও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। একশ্রেণির ব্যবসায়ী পণ্য গুদামজাত করে রেখে সুযোগ
বুঝে দাম বাড়ান। আর ভোক্তাÑ বিশেষ করে, দিনমজুর, নিম্ন-আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগেন।
বাজারে সরবরাহ সংকটের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট,
দুর্বল বাজার তদারকি এবং সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপের অভাব।
বেদনাদায়ক
বিষয় হলো, রমজান যে সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়, বাজারব্যবস্থায় তার প্রতিফলন দেখা যায় না।
যে মাসে মানুষ একে অপরের কষ্ট অনুভব করার কথা, সে মাসেই মুনাফার লোভে মানুষের ঘামঝরা
টাকার ওপর আঘাত আসে। ইফতার সামগ্রির সম্ভার ছোট হয়ে আসে, অনেক পরিবারের জন্য পুষ্টিকর
খাবার হয়ে যায় বিলাসিতা। সরকার প্রতিবছরই আশ্বাস দেয়Ñ বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সিন্ডিকেট
ভাঙা হবে, ভ্রাম্যমাণ আদালত চলবে। বাস্তবে এসব উদ্যোগ অনেক সময়ই লোক দেখানো হয়ে থাকে।
দুয়েকদিন অভিযান চলে, তারপর সব আগের জায়গায় ফিরে যায়। দেখা যায়, এই সময়টায় টিসিবি ও
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভর্তুকি পণ্য সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি আনলেও তা প্রয়োজনের তুলনায়
অপ্রতুল এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হন।
আমরা
মনে করি, রমজান সামনে রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরও আগাম ও কঠোর প্রস্তুতি প্রয়োজন
ছিল। শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, দরকার শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা, স্বচ্ছ আমদানি নীতি
এবং গুদামজাতকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। একই সঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংস্থাকে
আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে হবে। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের নৈতিক দায়িত্বের
কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি। ব্যবসা করা অপরাধ নয়, মুনাফা করাও অন্যায় নয়, কিন্তু
রমজানের মতো পবিত্র মাসে অতিরিক্ত মুনাফা মানুষের কষ্ট বাড়ালে তা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ
হয়। ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে বাজার আচরণের সামঞ্জস্য না থাকলে সমাজে বিশ্বাসের সংকট
তৈরি হয়।
মনে রাখা দরকার, রমজান মাস কেবল ইবাদতের মাস নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বোধ
জাগ্রত করার মাস। দ্রব্যমূল্যের এই অস্বস্তি দূর করা না গেলে রমজানের মূল শিক্ষাÑ সংযম
ও সহমর্মিতা ব্যর্থ হয়ে যায়। তাই এখনই সরকার, ব্যবসায়ী ও সমাজÑ সব পক্ষকে
দায়িত্বশীল হতে হবে। ব্যবসায়ীদের সামাজিক ন্যায়বোধ
জাগ্রত করতে হবে। নইলে প্রতিবছরই রমজান আসবে, আর সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস
আরও ভারী হবে।