× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জাতীয় সংসদ নির্বাচন

সুষ্ঠু ভোটের প্রত্যাশা পূরণ হবে কি

ড. আলা উদ্দিন

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৪ এএম

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৮ এএম

ড. আলা উদ্দিন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ড. আলা উদ্দিন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে অপেক্ষা বাড়ছে। নির্বাচন মানে শুধু সরকার গঠনের একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রয়োগের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্র। ভোটের মাধ্যমে মানুষ রাষ্ট্রকে জানায় তার সম্মতি, আপত্তি, আশা এবং প্রত্যাশার কথা। তাই সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য ভোটের প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, এটি জনজীবনের শান্তি, নিরাপত্তা এবং আস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নির্বাচনের দিনগুলো যদি আস্থা ও শৃঙ্খলার মধ্যে কাটে, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্কও শক্ত হয়।

গত কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা অনেক নাগরিককে সতর্ক করেছে। নানা এলাকায় ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয়, রাজনৈতিক হয়রানির আশঙ্কা, অনিয়মের অভিযোগ কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ না থাকার ধারণা বহু মানুষের মনে জমেছে। কেউ ভোট দিতে চেয়েও পারেননি, কেউ দিয়েছেন কিন্তু নিজের ভোটের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহে ছিলেন, আবার কেউ অংশ নেননি এক ধরনের অনাস্থা থেকে। এসব অভিজ্ঞতার সামাজিক প্রভাব কম নয়। পরিবার, পাড়া-মহল্লা, কর্মক্ষেত্র সব জায়গায় রাজনৈতিক বিভাজন ঘনীভূত হয়, সন্দেহ বাড়ে, সহাবস্থানের ভাষা দুর্বল হয়। সুষ্ঠু নির্বাচন তাই রাজনৈতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক স্বস্তিরও শর্ত।

নির্বাচন মানে শুধু সরকার গঠনের একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রয়োগের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্র। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

এখানে শান্তির প্রত্যাশা বলতে শুধু নির্বাচন-পূর্ব সহিংসতা কমে যাওয়াকে বোঝালে চলবে না। শান্তি মানে নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে ভয়মুক্ত চলাফেরা, মতপ্রকাশের নিরাপত্তা এবং আইনগত সুরক্ষার ওপর আস্থা। নির্বাচনের সময় যদি গ্রেপ্তার আতঙ্ক, হামলার শঙ্কা, কেন্দ্র দখলের গুজব কিংবা সংঘর্ষের খবর ছড়ায়, তাহলে মানুষ ঘরবন্দি হয়, অর্থনীতি থমকে যায় এবং সমাজে অস্বস্তি জমে। বিপরীতে নির্বাচন যদি স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হয়, মানুষকে কেন্দ্র পর্যন্ত যেতে বাধা না দেওয়া হয়, তাহলে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। একটি সুষ্ঠু ভোটের প্রভাব তাই নির্বাচনের দিনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

ভোটকে উৎসব বিবেচনা করা হয়, কারণ এখানে নাগরিক সমতার একটি মুহূর্ত আসে। ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, নারী-পুরুষ, পেশাজীবী-শ্রমজীবী সবাই একই সারিতে দাঁড়িয়ে একই অধিকার প্রয়োগ করে। এই সমতার অনুভূতি সমাজকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে, যদি প্রক্রিয়াটি বিশ্বাসযোগ্য হয়। উৎসবের অর্থ শুধু পোস্টার, মিছিল বা স্লোগান নয়; উৎসব মানে ভয় কম থাকবে, কেন্দ্রের পরিবেশ হবে শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং ফলাফলের পরও সহনশীলতা থাকবে। মানুষ যেন ভোট দেওয়ার পর নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরতে পারে, এই নিশ্চয়তাই ভোট উৎসবের আসল মানদণ্ড। এই নিশ্চয়তা না থাকলে উৎসবের ভাষা কেবল প্রচারণায় আটকে যায়।

সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ভিত্তি শুরু হয় নির্বাচন ঘোষণার আগেই। ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, সীমানা নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক কমানো, প্রার্থীর সমান প্রচারের সুযোগ, জনসভা করার অনুমতি এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণ এগুলো নির্বাচনকালীন আস্থার প্রথম শর্ত। মাঠে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হলে ভোটারের মনে আগেই ধারণা তৈরি হয় যে, প্রতিযোগিতা অসম। আর প্রতিযোগিতা অসম মনে হলে ভোটার কেন্দ্রে যেতে আগ্রহ হারায়। ফলে নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রশ্নটি তাই একক কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়, এটি একটি সামষ্টিক শৃঙ্খলার নাম।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে দৃশ্যমান। তফসিল ঘোষণা, প্রতীক বরাদ্দ, প্রার্থিতা যাচাই এসব প্রশাসনিক কাজের বাইরে কমিশনের বড় দায়িত্ব হলো আস্থা তৈরি করা। কেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতি, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, ব্যালট বা ইভিএম ব্যবহারের স্বচ্ছতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির দ্রুততা ভোটারের বিশ্বাস গড়ে তোলে। নির্বাচনের দিন কোথাও অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার প্রতিক্রিয়া দ্রুত ও দৃশ্যমান না হলে গুজব ছড়ায় এবং উত্তেজনা বাড়ে। কমিশন যদি নিয়ম প্রয়োগে ধারাবাহিক হয় এবং সব দলের জন্য একই মানদণ্ড বজায় রাখে, তাহলে প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক কমে। আস্থা তৈরি হলে শান্তির সম্ভাবনাও বাড়ে।

আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু ভোটের আরেকটি বড় স্তম্ভ। নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা দিতে গিয়ে যদি পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে, তাহলে নিরাপত্তাই উল্টো আতঙ্কে রূপ নেয়। আবার নিরাপত্তা শিথিল থাকলে দখল, ভয় দেখানো বা সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে। চ্যালেঞ্জ হলো, কেন্দ্রের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখা কিন্তু ভোটারকে ভয় না দেখানো। নারী ভোটার, বয়স্ক মানুষ এবং প্রথমবার ভোট দেওয়া তরুণদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ আরও জরুরি, কারণ তাদের একবারের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের অনীহা তৈরি করতে পারে। শান্তির প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে নিরাপত্তাকে মানবিক ও নিরপেক্ষ হতে হবে, শক্তি প্রদর্শন নয়।

রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণও এখানে নির্ধারক। সুষ্ঠু নির্বাচনের ভাষা অনেক সময় মঞ্চে শোনা যায়, কিন্তু মাঠে কর্মীদের আচরণে তার প্রতিফলন না থাকলে লাভ হয় না। প্রচার-প্রচারণা, মাইকিং, মিছিল, প্রার্থীর গাড়িবহর এগুলো নিয়ে সংঘর্ষ বহু এলাকায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে ওঠে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতায় পরিণত করলে নির্বাচনের পরও এলাকার সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত থাকে। দলগুলোর দায়িত্ব হলো কর্মীদের শৃঙ্খলায় রাখা, উস্কানিমূলক বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিযোগী হিসেবে দেখা। এই সংস্কৃতি যত শক্ত হবে, ভোট তত বেশি শান্তিপূর্ণ হবে এবং ফল ঘোষণার পরও সহাবস্থান সহজ হবে।

ভোটারদের অংশগ্রহণ সুষ্ঠু নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু। ভোটার যদি মনে করেন তিনি নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন এবং তার ভোট গণনায় গুরুত্ব পাবে, তাহলে উপস্থিতি বাড়ে। উপস্থিতি বাড়লে অনিয়ম করা কঠিন হয়, কারণ জনসমাগম নিজেই এক ধরনের নজরদারি তৈরি করে। তবে ভোটার উপস্থিতি কেবল উৎসাহের বিষয় নয়, এটি নিরাপত্তা ও আস্থার ফল। কেন্দ্রভিত্তিক পরিবহন, কাজের সময়ের চাপ, দূরত্ব এবং তথ্যের ঘাটতিও অনেককে পিছিয়ে দেয়। নির্বাচনকে উৎসবের মতো করতে হলে ভোটারকে কেন্দ্রমুখী করতে হবে, আবার ভোটারকে কেন্দ্রমুখী করতে হলে প্রক্রিয়াকে আগে বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। এই সম্পর্কটি একে অন্যকে শক্ত করে।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্বাচনের সময়ে বড় ভূমিকা পালন করে। সঠিক তথ্য দ্রুত পৌঁছলে আতঙ্ক কমে, কিন্তু ভুল তথ্য ছড়ালে উত্তেজনা মুহূর্তে বেড়ে যায়। ফলাফলের গুজব, কেন্দ্র দখলের অসত্য ভিডিও, কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করতে পারে। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হলো ঘটনাকে যাচাই করে প্রচার করা এবং রাজনৈতিক প্রচারণাকে সংবাদ হিসেবে না চালানো। একই সঙ্গে কমিশন ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো তথ্য দ্রুত প্রকাশ করা, যাতে গুজবের জায়গা কমে। তথ্যের স্বচ্ছতা শান্তির সহায়ক, কারণ অস্বচ্ছতা থেকেই সন্দেহ জন্মায় এবং সন্দেহ থেকেই সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে।

সুষ্ঠু ভোটের শান্তি কেবল ভোটের দিনে থেমে থাকে না, এটি নির্বাচনের পরের রাষ্ট্র পরিচালনায়ও প্রভাব ফেলে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে সরকার ও বিরোধী পক্ষের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক কম হয়, সংসদীয় কার্যক্রম কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে এবং নীতি বাস্তবায়নে স্থিতি আসে। বিনিয়োগ, ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক থাকলে সড়কে আন্দোলন, পাল্টা কর্মসূচি এবং আইনশৃঙ্খলা চাপের মধ্যে পড়ে যায়। শান্তির প্রত্যাশা তাই এক অর্থে অর্থনীতি ও উন্নয়নের প্রত্যাশাও। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যত গ্রহণযোগ্য হবে, রাষ্ট্রের গতিও তত মসৃণ হবে।

এই কারণেই ২০২৬ সালের নির্বাচনকে অনেকেই একটি নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন। নতুন অধ্যায় মানে শুধু নতুন সরকার নয়, নাগরিক অধিকার পূর্ণ মর্যাদায় কার্যকর হওয়ার একটি সুযোগ। মানুষ চায় এমন একটি নির্বাচন যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিশোধ থাকবে না; মতভেদ থাকবে, কিন্তু ভয় থাকবে না; জয়-পরাজয় থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না। নির্বাচনের আগের পরিবেশ থেকে শুরু করে ফল ঘোষণার পরের আচরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ যদি শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার মধ্যে থাকে, তাহলে সমাজে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে আসে। সেই স্বস্তিই শান্তির সবচেয়ে বাস্তব রূপ।

শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোট শান্তির প্রত্যাশা পূরণ করবে কি না, তা নির্ভর করে প্রক্রিয়াকে কতটা বিশ্বাসযোগ্য করা যায় তার ওপর। ভোটাধিকার বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হলে মানুষ রাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলে। নির্বাচন তখন কেবল রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে নির্বাচনী ব্যবস্থায় আস্থার সংকট কমানো জরুরি, কারণ আস্থাহীন রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সমাজকেও দ্বিধাবিভক্ত করে। তাই এই নির্বাচন শুধু একটি তারিখ নয়, এটি নাগরিক জীবনের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার একটি পরীক্ষা, যেখানে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক ভোটই শান্তির সবচেয়ে বড় আশা।


ড. আলা উদ্দিন

অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা