সুমাইয়া সিরাজ সিমি
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৬ এএম
আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:১৭ এএম
এপস্টিন নথি আমাদের শেখায়, বিচারহীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা।
একজন অপরাধী কারাগারের ভেতরে মারা যায়, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত ক্ষমতার কাঠামো অক্ষত থাকেÑ এটাই কি ন্যায়বিচার? এই প্রশ্নটাই আজ নতুন করে ফিরে এসেছে এপস্টিন নথি প্রকাশের পর। জেফ্রি এপস্টিনের মৃত্যু বহুদিন আগেই হয়েছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ছায়া এখনও বিশ্ব-রাজনীতি, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থার গায়ে লেপ্টে আছে। কারণ এই মৃত্যু কোনো শেষ অধ্যায় ছিল না; বরং তা ছিল এমন এক দরজার বন্ধ হয়ে যাওয়া, যার ওপরে ছিল অসংখ্য অস্বস্তিকর সত্য।
এপস্টিন নথি বলতে যেগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো কোনো একক দলিল নয়। এগুলো আদালতের নথি, সাক্ষ্যবিবরণী, ই-মেইল, ফোনালাপের উল্লেখ, ফ্লাইট লগ এবং দেওয়ানি মামলার দলিলের সমষ্টি, যেগুলো দীর্ঘদিন সিলগালা অবস্থায় ছিল। আদালতের আদেশে এসব নথি প্রকাশ পেয়েছে মূলত ভুক্তভোগীদের করা মামলার সূত্র ধরে, যেখানে জনস্বার্থের যুক্তিতে গোপনীয়তার দেয়াল আংশিক ভাঙা হয়েছে। এত বছর পর প্রকাশের কারণও এখানেইÑ ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত নামগুলো প্রকাশ করলে যাদের ক্ষতি হতে পারে, সেই বিবেচনাই এতদিন নথিগুলোকে আড়ালে রেখেছিল। এবার আদালত বলেছে, সবকিছু গোপন রাখা ন্যায়বিচারের পক্ষে যায় না।
এই নথি প্রকাশের পর জন-আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে নাম। কার নাম আছে, কার নাম নেইÑ এই তালিকা নিয়েই উত্তেজনা। ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, খ্যাতনামা আইনজীবী অ্যালান ডার্সহোভিটজ, প্রযুক্তি দুনিয়ার প্রভাবশালী বিল গেটস বা ইলন মাস্কÑ এমন অনেক নামই নথিতে এসেছে বিভিন্ন সূত্রে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব নামের উপস্থিতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যোগাযোগ, যাতায়াত বা সাক্ষ্যে উল্লেখমাত্র; অপরাধ প্রমাণ নয়। অথচ এখানেই আসল প্রশ্নটা হারিয়ে যায়Ñ নাম নয়, নীরবতা নিয়ে কেন আমরা কথা বলি না।
কারণ প্রকৃত সমস্যা হলোÑ কারা অভিযুক্ত, বরং কেন তদন্ত এগোয় না। কেন এত নাম থাকা সত্ত্বেও মামলার কাঠগড়ায় দাঁড়ায় কেবল হাতেগোনা কয়েকজন। গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, সাজা পেয়েছেন। কিন্তু তার চারপাশে যাদের নাম ঘুরেফিরে এসেছে, তাদের অধিকাংশই আইনের বাইরে থেকে গেছেন। ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে যেন প্রমাণের মানদণ্ড বদলে যায়। যেখানে একজন সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে অভিযোগই যথেষ্ট, সেখানে প্রভাবশালীদের জন্য চাই আরও নিখুঁত, আরও অলৌকিক প্রমাণ। এই দ্বিমুখী মানদণ্ডই এপস্টিন নথির সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক।
এই নীরবতার আড়ালে হারিয়ে যায় ভুক্তভোগীরা। যারা শিশু বা কিশোর বয়সে এপস্টেইনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিল, তাদের জীবননথির পাতায় শুধু সাক্ষ্য হিসেবে থেকে যায়। আলোচনায় আসে না তাদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষত, ভেঙে পড়া শৈশব, সমাজের অবিশ্বাস। নামের ঝলকানিতে তারা কেবল ফুটনোটে পরিণত হয়। প্রশ্ন জাগে, ন্যায়বিচারের কেন্দ্রে যদি ভুক্তভোগীরা না থাকে, তবে সেই বিচার কাদের জন্য। ক্ষমতার সামনে কি সত্য সব সময়ই হেরে যায়, নাকি আমরা হেরে যেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
এপস্টিনের মৃত্যু এই প্রশ্নকে আরও গভীর করেছে। উচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে থাকা একজন গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত কীভাবে মারা গেল, কেন নজরদারিতে এমন ব্যর্থতা ঘটলÑ এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর আজও নেই। এই মৃত্যু যেন অনেক সম্ভাব্য স্বীকারোক্তি, অনেক অপ্রকাশিত সত্যকে কবর দিয়ে দিয়েছে। নথি প্রকাশ হলেও মূল সাক্ষী অনুপস্থিত। ফলে বিচার প্রক্রিয়া অপূর্ণ থেকে যায়, আর সন্দেহ ঘনীভূত হয়।
এই জায়গা থেকেই এপস্টেইন নথি কেবল পশ্চিমা বিশ্বের সমস্যা হয়ে থাকে না। বাংলাদেশের পাঠক হিসেবেও আমাদের এখানে থামা উচিত। কারণ আমাদের সমাজেও কি আমরা একই চিত্র দেখি না? প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তদন্ত কমিটি হয়, নথি তৈরি হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফল শূন্য। বিচার যেন ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে থমকে যায়। এখানে যেমন নাম থাকে, তেমনই নীরবতাও থাকে। সরাসরি তুলনা না করলেও মিলগুলো চোখ এড়ায় না।
এপস্টিন নথি আমাদের শেখায়, বিচারহীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। যখন ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাব একসঙ্গে জড়ো হয়, তখন আইন তার ধার হারাতে শুরু করে। এই বাস্তবতায় নাম প্রকাশ বড় বিষয় নয়, বরং বিচার কার্যকর না হওয়াটাই আসল সংকট। আমরা যদি কেবল কার নাম আছে, তা নিয়েই উত্তেজিত থাকি, তবে মূল প্রশ্নটি চাপা পড়ে যাবে।
শেষ পর্যন্ত তাই এপস্টিন নথি যদি সত্যিই কিছু প্রমাণ করে, তাহলে সেটা কোনো ব্যক্তির অপরাধ নয়, বরং একটি সভ্যতার নৈতিক ব্যর্থতা। প্রশ্ন হলো, এই ব্যর্থতা আমরা স্বীকার করতে প্রস্তুত তো? নাকি প্রতিবারই একজন এপস্টিন মরবে, কিছু নথি প্রকাশ পাবে, আর ক্ষমতার কাঠামো অক্ষত রেখেই আমরা পরের কাণ্ডের জন্য অপেক্ষা করব?
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়