মো. নূর হামজা পিয়াস
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩১ এএম
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিককে অননুমোদিত সাব-এজেন্টদের মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছিল। এই মধ্যস্বত্বভোগীরা বা দালালরা গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে বড় স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণার জালে ফেলছে। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের অর্থনীতির দৃশ্যমান স্তম্ভগুলোর আড়ালে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী অবদানকারী গোষ্ঠী রয়েছে প্রবাসী শ্রমিকরা। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার শক্তিশালী রাখা, চলমান আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
তারা দূর প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে যে অর্থ দেশে পাঠান, তা কেবল পরিবার নয়, পুরো অর্থনীতিকেই সচল রাখে। অথচ এই নীরব নায়কদের জীবনের গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে। উন্নয়নের পরিসংখ্যানে তাদের অবদান যতটা উচ্চকিত, বাস্তব জীবনে তাদের সুরক্ষা ততটাই নীরব ও দুর্বল।
প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় বাজেট পর্যন্ত বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। এই অর্থ শিক্ষার খরচ মেটায়, চিকিৎসা নিশ্চিত করে, দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখে এবং ছোট উদ্যোগে পুঁজি জোগায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করেই একটি পরিবার সামাজিকভাবে টিকে থাকে। কিন্তু এই আর্থিক সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ত্যাগ, অনিশ্চয়তা ও মানবিক বঞ্চনার গল্প, যা প্রায়শই নীতিনির্ধারণী আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
অভিবাসনের শুরু থেকেই প্রবাসী কর্মীরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। বিদেশে কাজের আশায় তারা উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে অর্থ প্রদান করেন। প্রতিশ্রুত চাকরি, বেতন ও কর্মপরিবেশ বাস্তবে ভিন্ন হওয়ায় অনেকেই প্রতারণার শিকার হন। এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিকরা আর্থিকভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন। অভিবাসনের প্রতিটি ধাপেই তাদের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।
শ্রম অভিবাসনের ফলে বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক লাভ পায়, তা কোনোভাবেই অনস্বীকার্য নয়। কিন্তু এই অর্জনের আড়ালে যে মানবিক মূল্য বা ‘হিউম্যান কস্ট’ দিতে হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এক গল্প বলে। আমরা যখন রেমিট্যান্সের ডলারের হিসাব করি, তখন ভুলে যাই সেই ডলারগুলো আনতে গিয়ে কতজন শ্রমিক নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, কতজন নির্যাতিত হয়েছেন। ১১৪টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত গবেষণাটি প্রকাশ করে যে, আমাদের প্রবাসীদের সাফল্যের গল্পের পেছনে রয়েছে ব্যাপক অবৈধ ও অন্ধকার অনুশীলন।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিককে অননুমোদিত সাব-এজেন্টদের মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছিল। এই মধ্যস্বত্বভোগীরা বা দালালরা গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে বড় স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণার জালে ফেলছে। তারা নিয়োগের কোনো বৈধ কাগজ বা নিশ্চয়তা ছাড়াই শ্রমিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। যেহেতু এই সাব-এজেন্টদের কোনো আইনি জবাবদিহিতা নেই, তাই প্রতারণার শিকার হওয়ার পর শ্রমিকরা তাদের আর খুঁজে পান না। নিয়োগ প্রক্রিয়ার এই অস্বচ্ছতা প্রবাসীদের জীবনকে শুরুতেই এক বিশাল ঋণের বোঝায় তলিয়ে দিচ্ছে।
প্রবাসীদের প্রতারিত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো নথিপত্রবিহীন বিশাল আর্থিক লেনদেন। সাব-এজেন্ট বা দালালরা সাধারণত নগদ টাকায় লেনদেন করে এবং কোনো রসিদ প্রদান করে না। ফলে যখন আইনি প্রতিকার চাওয়া হয়, তখন শ্রমিকরা কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন না। আমাদের আইনি কাঠামো প্রমাণ বা নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে, যা শোষিত শ্রমিকের বিপক্ষে চলে যায়। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দালাল চক্র অবলীলায় পার পেয়ে যাচ্ছে এবং নতুন নতুন শ্রমিককে প্রতারণার জালে ফেলছে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান অভিবাসন নীতিমালা এবং আইনি কাঠামো যেন শোষকদের সুরক্ষাই বেশি দেয়। সালিশি ব্যবস্থাটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্টদের পক্ষে কাজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। নীতিমালায় কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। গবেষণার ফলাফল জোর দিয়ে বলছে, আমাদের আইনগুলো এখন সেকেলে হয়ে পড়েছে এবং এগুলোকে দ্রুত যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। সাব-এজেন্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং লাইসেন্সধারী এজেন্টদের কার্যক্রম তদারকি করা এখন সময়ের দাবি।
আইনি প্রতিকার পাওয়া একজন শ্রমিকের অধিকার, কোনো দয়া নয়। কিন্তু আমাদের বিচারব্যবস্থায় একজন সাধারণ প্রবাসীর প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত। মামলা পরিচালনার ব্যয় এবং দীর্ঘসূত্রতা তাদের বিচার থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ডিজিটাল মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ এবং দ্রুত ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা গেলে দালালদের দৌরাত্ম্য কমে আসত। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রম খাতটি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়বে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলবে।
অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) মধ্যে সমন্বয়ের বড় অভাব রয়েছে। গবেষণা সংস্থাগুলো যে তথ্য-উপাত্ত প্রদান করে, তা অনেক সময় নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব পায় না। OKUP-এর মতো সংস্থাগুলো মাঠ পর্যায়ে যে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছে, তা সমাধানের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। যদি সরকারি ও বেসরকারি খাত একযোগে কাজ করে, তবেই অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা সম্ভব এবং শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করা সহজ হবে।
অভিবাসন প্রক্রিয়াকে শতভাগ ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। পাসপোর্টের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের সমন্বয় এবং অনলাইনে নিয়োগপত্র যাচাই করার ব্যবস্থা থাকলে জালিয়াতি কমত। প্রতিটি রিক্রুটিং এজেন্টের কার্যক্রমের রেটিং বা ট্র্যাক রেকর্ড জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। এর ফলে শ্রমিকরা বুঝতে পারবেন কোন এজেন্ট নির্ভরযোগ্য। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যারা সরাসরি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করবে।
প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। নিরাপদ ও সম্মানজনক অভিবাসন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই করবে। অন্যদিকে অবহেলা ও শোষণ চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এই খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকরা নীরবে দেশের জন্য যা করে চলেছেন, তার প্রতিদান হিসেবে তারা ন্যূনতম সুরক্ষা ও মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রাখেন। উন্নয়নের গল্প তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই উন্নয়নের কারিগররা নিরাপদ থাকেন। নীতিনির্ধারকদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে অর্থনৈতিক সংখ্যার পেছনে ছোটা নয়, মানুষের অধিকার রক্ষাই হোক শ্রম অভিবাসনের মূল ভিত্তি।
মো. নূর হামজা পিয়াস
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ