× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রেক্ষাপট নির্বাচন

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলা কোন পথে

হাবিব বাবুল

প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৬ পিএম

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলা কোন পথে

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসে দেশটি শুধু একটি সরকার বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না, বরং নির্ধারণ করছে তার ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা, সমাজব্যবস্থা ও নাগরিক জীবনের দিকনির্দেশনা। ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ভোটের দিন নয়Ñ এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র নির্ধারণের দিন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠবে, বাংলাদেশ কি ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও একমাত্রিক শাসনব্যবস্থার পথে হাঁটবে, নাকি বহুত্ববাদ, সহনশীলতা ও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে বহুত্ববাদের চেতনা থেকে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ- সবকিছুই ছিল সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও মতাদর্শিক বৈচিত্র্যের সম্মিলিত সংগ্রাম। এই ভূখণ্ডে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান; বাঙালি, আদিবাসী- সবাই মিলেই রাষ্ট্র গঠনের লড়াই করেছে। কাজেই বাংলাদেশের আত্মপরিচয় কখনোই এককমাত্রিক ধর্মীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদারনৈতিক গণতন্ত্র এই ঐতিহাসিক বাস্তবতারই আধুনিক রাজনৈতিক প্রকাশ।

আজ যে দ্বন্দ্বটি সামনে এসেছে, তা মূলত দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে। একদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার নামে এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের অধীন হয়ে পড়ে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে যে রাষ্ট্রচিন্তার কথা বলা হচ্ছে, তার আদর্শিক অনুপ্রেরণা আমরা ইরান বা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতায় দেখতে পাইÑ যেখানে ধর্ম রাষ্ট্রের ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব স্থাপন করে, নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, নারীর অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে রয়েছে পশ্চিমা ধাঁচের হলেও কেবল পশ্চিমানুকরণ নয়Ñ একটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, যেখানে বহুমতের ভিত্তিতে সমন্বিত শাসন, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।

উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মূলশক্তি হলো তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। এখানে রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা মতাদর্শের পক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট হয় না। বরং সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে। ধর্ম এখানে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হাতিয়ার নয়। এই ব্যবস্থায় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। বাংলাদেশ যেমন একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, তেমনি এটি সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার পরীক্ষাক্ষেত্রও বটে। উদারনৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া এই ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব নয়।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও উদারনৈতিক গণতন্ত্র বাংলাদেশের জন্য অধিকতর কার্যকর পথ। বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে- রপ্তানি, শ্রমবাজার, প্রবাসী আয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগÑ সবকিছুই একটি স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা বা আদর্শিক একনায়কত্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ কমায় এবং উন্নয়নকে থামিয়ে দেয়। আফগানিস্তান বা ইরানের দিকে তাকালেই এর বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায়।

উদারনৈতিক গণতন্ত্র মানে কেবল নির্বাচন নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এখানে বিরোধী মতকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখা হয় না, বরং গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, বিচারব্যবস্থা নির্বাহী ক্ষমতা থেকে স্বাধীন থাকে এবং নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে। এই কাঠামোই দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে, ক্ষমতার অপব্যবহার কমায় এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।

ধর্মীয় রক্ষণশীল শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলোÑ এটি ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে না। একবার রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যার অধীনে চলে গেলে, সেই ব্যাখ্যার বাইরে থাকা সবাই হয়ে পড়ে সন্দেহভাজন। নারী, সংখ্যালঘু, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা এমনকি ভিন্ন মতের মুসলমানরাও তখন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে পড়ে। বাংলাদেশ যেমন একটি তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ, যেখানে শিক্ষিত যুবসমাজ বিশ্বমুখী চিন্তায় অভ্যস্তÑ তাদের স্বপ্ন, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনাকে ধর্মীয় কড়াকড়ি দিয়ে আটকে রাখা মানে জাতির ভবিষ্যৎকেই সংকুচিত করা।

উদারনৈতিক গণতন্ত্র নারীর ক্ষমতায়নকে কেবল সামাজিক দাবি হিসেবে নয়, রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতিÑ সবখানেই নারীর সমান অংশগ্রহণ ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এই ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি দেখিয়েছে। ধর্মীয় রক্ষণশীল শাসন সেই অগ্রগতিকে উল্টোপথে ঠেলে দেবে, যা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর।

এই নির্বাচন তাই কোনো দল বা ব্যক্তির পক্ষে-বিপক্ষে নয়; এটি একটি মূল্যবোধের নির্বাচন। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিককে বিশ্বাস করে, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিককে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়? আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে ভিন্নতা শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ?

জার্মানি থেকে বাংলাদেশকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে আমি দেখেছিÑ ইউরোপের উন্নতির পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর জার্মানি বুঝেছে, রাষ্ট্র যদি একক মতাদর্শে বন্দি হয়, তবে তা ধ্বংস ডেকে আনে। সেই শিক্ষা বাংলাদেশের জন্যও প্রযোজ্য। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, উদারনৈতিক গণতন্ত্রই সবচেয়ে টেকসই ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।

১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জনগণের সামনে একটি স্পষ্ট পছন্দ থাকবে। এই পছন্দ শুধু আজকের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পথে হাঁটা মানে ঝুঁকি নেইÑ এ কথা বলা যাবে না। তবে এটি এমন একটি পথ, যেখানে সংশোধনের সুযোগ থাকে, ভুল থেকে শেখার সুযোগ থাকে এবং সর্বোপরি মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপর। বহুত্ববাদী, উদারনৈতিক গণতন্ত্রই পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও সম্মানজনক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। এই নতুন যাত্রায় দিকনির্দেশনা ঠিক করার দায়িত্ব এখন জনগণের হাতেই।


হাবিব বাবুল

জার্মান ভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা