× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গৃহকর্মী নির্যাতন

আবার তোরা মানুষ হ

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৩ পিএম

নির্যাতন হঠাৎ রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি দীর্ঘদিনের নিষ্ঠুরতার অপব্যবহার, যেখানে দুর্বলকে চেপে ধরার সংস্কৃতি স্বাভাবিক। প্রতীকী ছবি

নির্যাতন হঠাৎ রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি দীর্ঘদিনের নিষ্ঠুরতার অপব্যবহার, যেখানে দুর্বলকে চেপে ধরার সংস্কৃতি স্বাভাবিক। প্রতীকী ছবি

আমাদের বিবেক কতটা অন্ধ হয়ে গেছে! মানবতা কোথায় হারিয়ে গেছে। আভিজাত্য ও বিত্তের মোড়কে আমরা কতটা পৈশাচিকতাকে লালন করছি। রাজধানীর উত্তরা; চোখ জুড়ানো উন্নয়ন, অভিজাত আবাসন আর সমাজের দৃষ্টিতে আধুনিক জীবনের প্রতীক। সেই উত্তরাতেই আবারও খুলে পড়ল আমাদের মুখোশ; উৎকটভাবে বেরিয়ে পড়লো নির্মম-নিষ্ঠুরতার এক ছবি। সেখানে ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীকে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও তার স্ত্রী গ্রেপ্তার হয়েছেনÑ এই সংবাদ কেবল একটি অপরাধের খবর নয়, এটি যেন আমাদের সমাজের বিবেকের বিরুদ্ধে একটি তীব্র কটাক্ষপূর্ণ অভিযোগপত্র। 

জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার ওই গৃহকর্মীর নাম মোহনা। ২০২৫ সালের জুন মাসে অভাবের তাড়নায় শিশুকন্যাকে বাসার কাজে দিয়েছিল তার পরিবার। তখন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, মেয়েটির পড়াশোনার যাবতীয় খরচ বহন করা হবে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও নেওয়া হবে। কিন্তু যোগদানের মাস কয়েক পর থেকেই বদলে যায় সেই আশ্রয়দাতা পরিবারের আচরণ। শুরু হয় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিশুটির দেখা করতে বাধা দেওয়া থেকে শুরু করে শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন। গত ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় শিশুটিকে যখন তার মায়ের কাছে ফেরত দেওয়া হয়, তখন মেয়ের বীভৎস দগদগে ক্ষত দেখে মা সংজ্ঞা হারানোর উপক্রম হন।

অথচ এক সময় ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে গৃহকর্মী হিসেবে ঘরে এনেছিলেন শিশুটিকে। সেই আশ্রয়ই শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো এক পৈশাচিক নরককুণ্ডে। এখন হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে শিশুটি। তার শরীরে পোড়া ক্ষত, সেলাই ও জখমের চিহ্ন। ২ ফেব্রুয়ারি ভুক্তভোগীর বাবা উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করেন। মামলার পর রাত ৩টায় উত্তরা ৯নং সেক্টরের বাসা থেকে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়। ইতোমধ্যে এমডি হিসেবে তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার। শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের ঘটনায় তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে সচেতন ও বিবেকবান নাগরিকদের পক্ষ থেকে। নিন্দা জানিয়েছে দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও। গণমাধ্যমে আলাদা বিবৃতিতে নিন্দা জানিয়েছে শ্রমিক অধিকার জাতীয় অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্স ও ডোমেস্টিক ওয়ার্কার এমপ্লয়ার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ। সবাই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।

বলতেই হয়, যে ঘরে নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের কথা, সেই ঘরেই যদি ভয়, মারধর ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা জমে ওঠে, তবে আমরা কোন সভ্যতার দাবি করি? গৃহকর্মী একজন মানুষ, একজন শ্রমজীবী নারী বা পুরুষ; যার শ্রমে সচল থাকে শহুরে পরিবারের প্রতিদিনের জীবন। অথচ সেই মানুষটিকেই যদি অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়, তবে দোষ কেবল একজন মালিক বা মালকিনের নয়; দোষ আমাদের নীরব সামাজিক সম্মতিরও। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় আরও বেশি প্রশ্ন তোলে। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত একটা শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের এমডি; অর্থ, ক্ষমতা ও প্রভাবের শীর্ষে থাকা একজন মানুষ। তার স্ত্রীর সঙ্গেও জড়িয়েছে একই অভিযোগ। বলা যায়, নির্যাতন এখানে হঠাৎ রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি দীর্ঘদিনের নিষ্ঠুরতার অপব্যবহার, যেখানে দুর্বলকে চেপে ধরার সংস্কৃতি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই ধরনের নির্যাতন আমাদের চারপাশ তথা সমাজে নতুন নয়। মাঝেমধ্যেই আমরা দেখি গৃহকর্মীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন, শোনা যায় তালাবদ্ধ করে রাখার কথা, খাবার না দেওয়ার অভিযোগ। কিছু ঘটনা হয়তো আলোচনায় আসে, বেশিরভাগই চাপা পড়ে যায়। কারণ ভুক্তভোগীরা দরিদ্র, অসহায়; তাদের কণ্ঠস্বর শোনার মতো সামাজিক শক্তি নেই। ফলে অপরাধের শাস্তির দৃষ্টান্তও হাতে গোনা।

তবে এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ প্রশংসার দাবি রাখে। গ্রেপ্তারই প্রমাণ করেÑ অপরাধীর পরিচয় যত বড়ই হোক, আইন সবার জন্য সমান। আমরা মনে করি, গ্রেপ্তারই শেষ কথা নয়। প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ বিচার, নির্যাতনে গুরুতর আহত শিশুটির উপযুক্ত চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন। যেন এটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকেÑ গৃহকর্মী নির্যাতন কোনো ‘ঘরের ভেতরের বিষয়’ নয়, এটি অমানবিক ও গুরুতর অপরাধ।

আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের আত্মসমালোচনা জরুরি। আমরা কি গৃহকর্মীদের মানুষ হিসেবে দেখি, নাকি কেবল ‘কাজের লোক’ হিসেবে ব্যবহার করি? তাদের কাজের সময়, বিশ্রাম, সম্মানÑ এসব কি আমরা নিশ্চিত করি? আসলে এই মানবিকতা কেবল বক্তৃতায় নয়, আচরণেও প্রমাণিত। উত্তরার এ ঘটনা আমাদের সামনে আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় ভেসে উঠেছে ক্ষমতার দম্ভ, সামাজিক বৈষম্য আর ভয়ংকর নীরবতা। এখন প্রশ্নÑ আমরা কি আবারও ভুলে যাব, নাকি সত্যিই বদলাতে চাইব? মনে রাখতে হবে, মানবিক রাষ্ট্র গড়তে হলে গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা দিয়েই সেই যাত্রা শুরু করতে হয়।

এই ঘটনায় আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষা আর আইন প্রয়োগ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। গৃহকর্মীদের নিরাপদ রাখার জন্য সমাজের সকল স্তরে, পরিবারের, প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে সম্মিলিত দৃষ্টি ও উদ্যোগ অপরিহার্য। তবেই আমরা বলতে পারব, গৃহকর্মীরা সমাজে সত্যিই নিরাপদ। মানুষের ছদ্মাবরণে সমাজে বিচরণকারী অমানুষদের উদ্দেশ্য বলতে চাই : আবার তোরা মানুষ হ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা