× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর জরুরি

ডা. ইয়াসমিন এইচ আহমেদ

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:১৩ পিএম

ডা. ইয়াসমিন এইচ আহমেদ, জনস্বাস্থ্য গবেষক ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের (বিএইচডব্লিউ) উপদেষ্টা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ডা. ইয়াসমিন এইচ আহমেদ, জনস্বাস্থ্য গবেষক ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের (বিএইচডব্লিউ) উপদেষ্টা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গতকাল ছিল বিশ্ব ক্যানসার দিবস। এ বছর এই দিনটি পালিত হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সময়ে। বাংলাদেশ ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন দ্বারপ্রান্তে। নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হলে প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হওয়া উচিত- তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে ঝুলিয়ে না রেখে আইনে পরিণত করা। কারণ বাংলাদেশে ক্যানসারের যে ভয়াবহ বাস্তবতা, তার পেছনে সবচেয়ে বড়, প্রমাণিত এবং প্রতিরোধযোগ্য কারণ এখনও তামাক। বাংলাদেশে ক্যানসারের সামগ্রিক চিত্র উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার (আইএআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর নতুন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার এবং মৃত্যু হয় প্রায় ১ লাখ মানুষের। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মুখ ও ফুসফুসের ক্যানসার, যার বড় কারণ হিসেবে তামাক ব্যবহারকে চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্টভাবে দায়ী করছে। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ (জিবিডি) ২০১৯ দেখায়, তামাক ধূমপানজনিত ক্যানসারে বিশ্বজুড়ে মৃতের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি এবং এশিয়ায় বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই এর বড় অংশ সংঘটিত হচ্ছে। (Global Burden of Disease, The Lancet)

বাংলাদেশে ক্যানসার এত বেশি হওয়ার প্রধান কারণ হলো তামাকের সহজলভ্যতা ও ব্যাপক ব্যবহার। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ অনুযায়ী, দেশের ৩৫.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করেÑ সংখ্যায় যা প্রায় ৩৭.৮ মিলিয়ন মানুষ। এর মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ মানুষ ধূমপান করে এবং প্রায় ২৮ শতাংশ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করে। অর্থাৎ, শুধু সিগারেট নয়Ñ জর্দা, গুল, সাদা পাতা বা পান-তামাকÑ সবই ক্যানসার ঝুঁকির বড় উৎস।

ধোঁয়াবিহীন তামাকের ক্ষেত্রে তথ্য আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশে পরিচালিত একটি হাসপাতালভিত্তিক কেস-কন্ট্রোল গবেষণায় দেখা গেছে, ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারীদের মুখগহ্বর ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৮.৮ গুণ বেশি। (Ullah et al., Tobacco Use Insights, 2025) নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশিÑ ১৪ গুণেরও বেশি। গবেষণাটি হিসাব করে দেখিয়েছে, দেশে পুরুষদের প্রায় ৪১ শতাংশ এবং নারীদের প্রায় ৭৬ শতাংশ মুখগহ্বর ক্যানসার ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের কারণে হয়ে থাকে। (Tobacco Use Insights, 2025) বিশ্ব ক্যানসার দিবসে ক্যানসার প্রতিরোধের কথা বলতে গেলে, এই তথ্যগুলো উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। 

সিগারেটের ক্ষতি আলাদা করে বলার কিছু নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, ফুসফুস ক্যানসারের সবচেয়ে বড় কারণই হলো ধূমপান। যারা ধূমপান করেন, তাদের ফুসফুস ক্যানসারে মারা যাওয়ার ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ গুণ বেশি। বাংলাদেশে পুরুষদের ফুসফুস ক্যানসারে মৃত্যুর পেছনেও সিগারেটের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সিগারেট ফুসফুস ক্যানসারের প্রধান ঝুঁকির কারণ এবং ধূমপায়ীদের মধ্যে ফুসফুস ক্যানসারে মৃত্যুর ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় ১৫-২০ গুণ বেশি। বাংলাদেশে পুরুষদের ফুসফুস ক্যানসার মৃত্যুর বড় অংশই ধূমপানের সঙ্গে যুক্ত। (WHO, Tobacco & Cancer Factsheet)

এই স্বাস্থ্য সমস্যার খেসারত শুধু মানুষ নয়, দেশের অর্থনীতিকেও দিতে হচ্ছে। তামাক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। এর আর্থিক ক্ষতিও কম নয়Ñ তামাকজনিত রোগে দেশের ক্ষতি হয় প্রায় ৩০৫ বিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির প্রায় ১.৪ শতাংশ। এর সঙ্গে তুলনায় একই বছরে তামাক থেকে সরকারের রাজস্ব ছিল এর অনেক কম। অর্থাৎ, তামাক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে না, বরং  ক্যানসার ও অন্যান্য রোগের মাধ্যমে অর্থনীতিকে দুর্বল করে। তামাক থেকে সরকার যে রাজস্ব পায়, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ হয়ে যায় তামাকজনিত রোগের পেছনে। এই রোগে শুধু মানুষ মারা যায় নাÑ অনেকেই  ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে ভোগেন বা স্থায়ীভাবে অসুস্থ বা পঙ্গু হয়ে কর্মক্ষমতা হারান। কর্মসংস্থানের বাইরে চলে যান, ধীরে ধীরে পরিবার ও সমাজের ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ান। 

তরুণদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। গ্লোবাল ইয়ুথ টোব্যাকো সার্ভে (জিওয়াইটিএস) ২০১৩ দেখিয়েছে, ১৩-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ইতোমধ্যে সিগারেট বা অন্যান্য তামাকপণ্যের সংস্পর্শে এসেছে এবং অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়েও সহজে সিগারেট কিনতে পারছে। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এক-তৃতীয়াংশ কমানোর লক্ষ্য ঠিক করলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্য অনুযায়ী অগ্রগতি এখনও খুব কম। এসডিজি ৩.৪ অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে  ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগে অকাল মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালে অকাল মৃত্যুহার নামিয়ে আনার কথা প্রায় ৬-এ। কিন্তু এসডিজি ট্র্যাকারের সর্বশেষ তথ্য ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। বাস্তবে এই মৃত্যুহার কমার বদলে ২০১৮ সালের প্রায় ১৯ থেকে ২০২২ সালে বেড়ে প্রায় ২৫-এ পৌঁছেছে এবং ২০২৩ সালেও তা প্রায় ২৪-এর কাছাকাছি রয়ে গেছে। অর্থাৎ, যেখানে আমাদের দ্রুত নিচের দিকে নামার কথা ছিল, সেখানে আমরা এখনও অনেক ওপরে অবস্থান করছি। এই ব্যবধান স্পষ্ট করে বলছে, বর্তমান গতিতে চললে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তাই এসডিজির-এর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে তামাক নিয়ন্ত্রণে শক্ত আইন, অধ্যাদেশকে দ্রুত আইনে রূপান্তরের কোনো বিকল্প নেই। (SDG Tracker, Chief Advisor Office, GoB)

এই বাস্তবতায় তামাক নিয়ন্ত্রণ সংশোধনী অধ্যাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে তামাকের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাক বিক্রি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, সিগারেট ও অন্যান্য তামাকপণ্যের প্যাকেটে বড় ও স্পষ্ট স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করা এবং জর্দা-গুলসহ ধোঁয়াবিহীন তামাকের উৎপাদন ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জনসমাগমস্থলে ধূমপান নিষেধ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাক বিক্রি রোধ, বিক্রয় স্থানে তামাকপণ্যের প্রদর্শনী বন্ধ, আইন ভাঙলে জরিমানা ও শাস্তি বৃদ্ধি, আইন বাস্তবায়নকারী সংস্থার ক্ষমতা বাড়ানো এবং তামাক কোম্পানির প্রভাব ও ফাঁকফোকর কমানোর বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থা কেবল অধ্যাদেশে সীমাবদ্ধ থাকলে বাস্তব পরিবর্তন আসবে না। এগুলো আইনে রূপ নিলেই মানুষ ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশ পাবে, তরুণদের তামাক ব্যবহারে জড়ানোর ঝুঁকি কমবে এবং  ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগসমূহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

তামাকজনিত  ক্যানসার প্রতিরোধ সম্ভব, যদি রাষ্ট্র সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ে নেয়। তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে দ্রুত আইনে পরিণত করা মানে শুধু একটি আইন পাস করা নয়; লক্ষ্য মানুষের জীবন বাঁচানো, তরুণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি তামাকমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ উপহার দেওয়া। প্রতিবছর বিশ্ব  ক্যানসার দিবস পালন করা হলেও প্রকৃত অর্থ তখনই পূরণ হবে, যখন  ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়া হতে পারে সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।


ডা. ইয়াসমিন এইচ আহমেদ

জনস্বাস্থ্য গবেষক ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের (বিএইচডব্লিউ) উপদেষ্টা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা