বিশ্লেষণ
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৫৮ এএম
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪৬ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সফল করতে হলে কেবল নতুন নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আমূল সংস্কার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে আমরা এক স্বচ্ছ ও সাবলীল চিত্র দেখতে পাই। আমেরিকা থেকে ইউরোপ, এমনকি পার্শ্ববর্তী অনেক দেশেও নির্বাচন মানেই হলো জনমতের এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিফলন। সেখানে পরাজয় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি আছে, বিজয়ীর বিনম্রতা আছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিগত দেড় দশকে সেই চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ২০২৬-এর গণতন্ত্র সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা মিশ্র শাসনব্যবস্থা থেকে ‘অথরিটারিয়ান’ বা একনায়কতান্ত্রিক ঝুঁকির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
কেন আমরা পারছি না? কেন আমাদের নির্বাচনগুলো বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে? এর পেছনের মূল কারণ হলোÑ প্রতিষ্ঠানের ওপর দলীয় প্রভাবের নগ্ন হস্তক্ষেপ। ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) ডেটা বলছে, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের প্রায় ৮১.৪% কর্মকর্তা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক আদর্শের কাছে মানসিকভাবে জিম্মি হয়ে পড়েছিলেন। যখন রক্ষকই ভক্ষক হয়ে দাঁড়ায়, তখন ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক অপকৌশল।
অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা জনমত
বাংলাদেশের নির্বাচন কেন কেবল বাংলাদেশের মানুষের একার হতে পারল নাÑ এটি আজ এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারত, চীন, আমেরিকা ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব সব সময়ই ছিল। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেক সময় দেখা গেছে বাইরের শক্তির ‘আশীর্বাদ’ পাওয়ার নেশায় রাজনৈতিক দলগুলো দেশের মানুষের ‘ভোট’ পাওয়াকে গৌণ মনে করেছে।
গ্লোবাল রিফর্মিস্ট কাউন্সিল ২০২৫-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৫৪.৬% মানুষ মনে করেন যে তাদের ভোটাধিকার হরণের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থও জড়িত ছিল। যখন দেশের ভেতরের শাসকরা বাইরের কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করে, তখন তারা সাধারণ মানুষকে আর ‘নাগরিক’ মনে করে না, কেবল ‘প্রজা’ হিসেবে দেখে। এই যে ভোটারদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা, এটাই আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিয়েছে। আমাদের নির্বাচন এখন কেবল আমাদের সার্বভৌমত্বের দলিল নয়, বরং বড় শক্তিগুলোর দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে।
একটি জাতির উন্নয়নের মাপকাঠি কেবল বড় বড় মেগা প্রজেক্ট বা ফ্লাইওভারে নয়, বরং তার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায়। যখন প্রতি পাঁচ বছর অন্তর দেশ এক অরাজকতার মুখে পড়ে, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যায়। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্বচ্ছ নির্বাচনের অভাবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বছরে গড়ে ১.৫% থেকে ২% কম হচ্ছে। উন্নত বিশ্ব যখন আমাদের দিকে তাকায়, তারা কেবল আমাদের গার্মেন্টস শিল্প দেখে না, তারা দেখে আমাদের গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য।
বিগত নির্বাচনগুলোতে সাংবাদিকদের হয়রানি এবং সত্য ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা আমাদের ‘ফ্রিডম অব প্রেস’ ইনডেক্সে তলানিতে নিয়ে গেছে। যখন একটি রাষ্ট্রের সাংবাদিক সত্য বলতে গিয়ে আক্রান্ত হন, তখন সেই রাষ্ট্রের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা শূন্যে নেমে আসে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম আজ এই কারণেই দেশ ছাড়ছে। তারা দেখেছে মেধাতন্ত্রের বদলে দলীয়তন্ত্র আর ভোটের বদলে সিল মারাÑ এই পরিবেশে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
বিগত নির্বাচনের ক্ষত
বিগত নির্বাচনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও মানুষের শরীর শিউরে ওঠে। পোলিং এজেন্টদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া, সাংবাদিকদের ক্যামেরা ভেঙে দেওয়া, এবং ভোট দেওয়ার আগেই ব্যালট বাক্স পূর্ণ হয়ে যাওয়াÑ এই চিত্রগুলো এখন ভিডিও আকারে মানুষের হাতে হাতে ঘোরে। অক্সফোর্ড লিঙ্গুইস্টিক সিমুলেশন ২০২৬ বলছে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে নির্বাচনের প্রতি যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে অন্তত ১৫ বছরের ধারাবাহিক স্বচ্ছ নির্বাচন প্রয়োজন।
আমরা দেখেছি কীভাবে প্রিসাইডিং অফিসাররা অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন যখন একদল দুর্বৃত্ত ব্যালটে সিল মারত। আমরা দেখেছি কীভাবে রিটার্নিং অফিসাররা অভিযোগের পাহাড় কানে তুলতেন না। এই যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, এটিই অপরাধীদের সাহসী করেছে। পরাজিত দল যখন জানে তারা স্বচ্ছ ভোটে জিততে পারবে না, তখন তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ভোটকেন্দ্র বানচাল করে দেয়। আর বিজয়ী দল যখন নৈতিক বিজয় পায় না, তখন তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে আরও বেশি দমন-পীড়ন চালায়। এই যে দুষ্টচক্র, এটি আমাদের সমাজকে এক গভীর হতাশার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ত্রয়োদশ নির্বাচনের শুদ্ধি অভিযান
যদি এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি না মেলে, তবে ভবিষ্যৎ অত্যন্ত ভয়াবহ। রাজনৈতিক অস্থিরতা গৃহযুদ্ধের রূপ নিতে পারে, অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে এবং আমরা উত্তর কোরিয়ার মতো একঘরে হয়ে যেতে পারি। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন হতে হবে আমাদের শুদ্ধি অভিযান। এই নির্বাচন সফল করতে হলে কেবল নতুন নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আমূল সংস্কার।
একটি স্বচ্ছ ও ইনসাফপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ অপরিহার্য। প্রথমেই, নির্বাচন চলাকালীন প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করতে হবে, যাতে তারা যেকোনো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে; কেননা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে নির্বাচনী কারচুপির হার প্রায় ৮৪% হ্রাস পায়। পাশাপাশি, ভোটগ্রহণের প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রতিটি বুথে লাইভ ব্রডকাস্টিং এবং এআই-ভিত্তিক ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা যুক্ত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া, প্রতিটি প্রার্থীর এজেন্টের কেন্দ্রে উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃঢ় আইনি গ্যারান্টি প্রদান এবং ভোট গণনা শেষে সরাসরি কেন্দ্রেই ফলাফল ঘোষণা করে তা তাৎক্ষণিকভাবে ইন্টারনেটে আপলোড করার ব্যবস্থা করতে হবে। এই সমন্বিত সংস্কারগুলো জনমনে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
ইনসাফের নবযাত্রায় একটি সার্বভৌম ভোট নিশ্চিত করা কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি জাতির পবিত্র আমানত রক্ষা করার মহান অঙ্গীকার। ৫ আগস্ট পরবর্তী যে ‘মুক্ত’ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখছি, সেখানে প্রতিটি ব্যালট বাক্স হতে হবে ন্যায়বিচার ও ইনসাফের অটল প্রতীক, যেখানে নাগরিকের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে কোনো ভয়ভীতি বা কারচুপির ঊর্ধ্বে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে এক অভূতপূর্ব প্রত্যাশা, যেখানে ৯৪.৬% মানুষ আশা ব্যক্ত করেছেন যে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে তারা জীবনের প্রথম ‘আসল’ ও অর্থবহ ভোটটি দিতে পারবেন। এই পরিসংখ্যানটি নির্দেশ করে যে দেশের নাগরিকরা এখন ভোটাধিকারকে কেবল একটি আইনি অধিকার নয়, বরং রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরে পাওয়ার এবং একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ভিত্তি স্থাপনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন।
বিজয় কি তবে সেই দিনের হবে যখন বাংলাদেশের মানুষ আর কার্ড বা জান্নাতের টিকিটের লোভে নয়, বরং দেশের কল্যাণে ভোট দেবে? আমরা চাই এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে নির্বাচনের দিন কেউ আতঙ্কে ঘরবন্দি থাকবে না, বরং উৎসবের আমেজে ভোট দিতে যাবে। আমাদের ভোট কেবল আমাদেরই থাকবে, কোনো বহিঃশক্তির দয়ায় নয়। সময় এসেছে বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার যে, বাংলাদেশ কেবল যুদ্ধ করতে জানে না, বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব আর গণতন্ত্র রক্ষা করতেও জানে। ইনসাফের সেই সোনালি ভোরের প্রতীক্ষায় আজ পুরো বাংলাদেশ প্রহর গুনছে।
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
দাউদ ইব্রাহিম হাসান
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়