বিশ্লেষণ
আমিরুল ইসলাম কাগজী
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:১৩ এএম
আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:১৪ এএম
কিছু নাম, কিছু শব্দ, কিছু বিশেষণ- এমনভাবে সৃষ্টি হয়েছে, যা একে অপরের হাতে হাত ধরে কাঁধে কাঁধ রেখে রেললাইনের মতো সমান্তরালে এগিয়ে যায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঠিক এমনই একটি শব্দ, যার গায়ে লেগে আছে জনপ্রিয়তা নামক একটি বিশেষণ। জিয়া মানে দায়িত্ববোধ। জিয়া মানে স্বাধীনতা। জিয়া মানে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায়ের নাম জিয়া। জিয়া নামটি বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে চিন্তা করা যায় না। বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এই নামটি (কিছু কু চিন্তাশীল মানুষ ব্যতীত)।
বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যারা শুধু একটি সময়ের নেতা নন তারা একটি ধারার প্রতীক, একটি দর্শনের নাম, একটি জাতীয় মানসিকতার প্রতিফলন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তেমনই এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার জনপ্রিয়তা কোনো সাময়িক আবেগ, দলীয় প্রচারণা কিংবা ক্ষমতার মোহ থেকে জন্ম নেয়নি, বরং তা গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের কর্ম, ত্যাগ, সততা, সাহসিকতা ও বাস্তববাদী রাষ্ট্রদর্শনের ওপর ভিত্তি করে। স্বাধীনতার পর বিপর্যস্ত বাংলাদেশকে নতুন করে দাঁড় করানোর সংগ্রামে জিয়াউর রহমান যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এত জনপ্রিয় কেন? কয়েক দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও তার নাম উচ্চারিত হলে মানুষের মনে আস্থা, শ্রদ্ধা ও আবেগ জাগ্রত হয়?
১. মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব ও জাতীয় পরিচয়ের নির্মাতা : জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি মহান মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা। তিনি কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন সম্মুখসমরের যোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে (রাত ২.১৫টা) অস্ত্র হাতে নিয়ে বজ্রকণ্ঠে তার সেই উচ্চারণ ‘ওই রিভোল্ট’। পরের দিন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তার কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। সেই ঘোষণা বিভ্রান্ত জাতিকে দিকনির্দেশনা দেয়, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সাহস ও প্রত্যয় জাগিয়ে তোলে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে বাংলাদেশের মানুষ থাকবে ততদিন এই বিদ্রোহ এবং স্বাধীনতার ঘোষণা অম্লান হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের মানুষ সব সময় সংগ্রামী নেতৃত্বকে শ্রদ্ধা করে। জিয়াউর রহমানের যুদ্ধক্ষেত্রের সাহস, সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া এবং জীবন বাজি রেখে দেশমাতৃকার জন্য লড়াই করাÑ এই গুণগুলো তাকে সাধারণ মানুষের চোখে একজন ‘আপন লোক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২. দায়িত্ববান দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করার এক অনন্য উদাহরণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে জিয়াউর রহমান কেমন অবদান রেখেছেন তার উদাহরণ পাওয়া যায় তৎকালীন ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী কামরুজ্জামান হেনার পিএস জিয়াউদ্দিন চৌধুরীর জবানিতে। তিনি লিখেছেন, আওয়ামী লীগের এমপি এবং রাজনৈতিক কর্মীরা যখন নানামুখী তদবির নিয়ে মন্ত্রীর কাছে আসতেন তখন অন্য একজন সেনা কর্মকর্তা আসতেন শুধু দেশের পুনর্বাসন কাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। তিনি আর কেউ নন তৎকালীন উপপ্রধান সেনাপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল চরম অস্থিরতা, অর্থনৈতিক ধ্বংস ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় ভরা। সেই সংকটময় মুহূর্তে জিয়াউর রহমান ক্ষমতালোভী রাজনীতিক হিসেবে নয়, বরং দায়িত্ব নিতে বাধ্য হওয়া একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে সামনে আসেন। তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন পরিস্থিতির তাগিদেÑ নিজের জন্য নয়, রাষ্ট্রকে বাঁচানোর জন্য। ১৯৭৫ সালের সেনা অভ্যুত্থান-পাল্টাঅভ্যুত্থান তার এই অনিচ্ছাকৃত কিন্তু দায়িত্বশীল উত্থান জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছিল। মানুষ বুঝেছিল, তিনি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করছেন না; বরং রাজনীতিতে এসে ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে চান দেশের কল্যাণে।
৩. বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ : জিয়াউর রহমানের অন্যতম বড় অবদান হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ধারণার প্রবর্তন। এটি ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং বাংলাদেশের ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জাতীয় পরিচয়। এই দর্শনের মাধ্যমে তিনি, ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সবাইকে জাতীয় ঐক্যের আওতায় আনেন। বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তাকে আঞ্চলিক রাজনীতির বাইরে এনে বিশ্বমুখী করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রচিন্তায় মর্যাদা দেন, আবার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করেন। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তাকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
৪. তৃণমূলমুখী রাজনীতি : জিয়াউর রহমান ছিলেন তৃণমূলমুখী নেতা। তিনি রাজনীতি করেছেন মাঠে-ময়দানে, গ্রামে-গঞ্জে। তার ‘হ্যাঁ-না’ বলা নেতৃত্ব মানুষ পছন্দ করত, কারণ তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন না। সমস্যা দেখলে সিদ্ধান্ত নিতেন, দায়িত্ব নিতেন, ব্যর্থ হলে স্বীকার করতেন। তিনি সরাসরি জনগণের সঙ্গে কথা বলতেন, তাদের সমস্যার কথা শুনতেন। তার বিখ্যাত উক্তি- ‘রাজনীতি মানুষের জন্য’- শুধু কথায় নয়, কাজে বাস্তবায়িত হয়েছে।
৫. বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক : একদলীয় শাসনের ধ্বংসাত্মক অভিজ্ঞতার পর জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা দেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন, বিরোধী মতকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরি করেন, যেখানে : জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার একসঙ্গে স্থান পায়। এই দল কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, একটি রাষ্ট্রদর্শনের জন্য গড়ে ওঠে, যা আজও লক্ষকোটি মানুষের বিশ্বাসের জায়গা।
৬. অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও উৎপাদনমুখী চিন্তা: স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত। জিয়াউর রহমান এই বাস্তবতা অনুধাবন করে উৎপাদনমুখী অর্থনীতির দিকে মনোযোগ দেন। তিনি কৃষিকে অগ্রাধিকার দেন, বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করেন, পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের পথ উন্মুক্ত করেন, গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করেন। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসে। সাধারণ মানুষ প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রের উন্নয়নের সুফল স্পর্শ করতে শুরু করে।
৭. পররাষ্ট্রনীতিতে মর্যাদা ও ভারসাম্য : জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল মর্যাদাশীল ও স্বাধীনচেতা। তিনি বাংলাদেশকে কোনো একক শক্তির বলয়ে আটকে রাখেননি। মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা বিশ্ব ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন পরিচিতি দেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বে একটি সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করে।
সার্ক গঠন করার মধ্য দিয়ে তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক মজবুত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পারস্পরিক হানাহানির বিপরীতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই ছিল সার্ক গঠনের অন্যতম পদক্ষেপ।
৮. সততা, সরলতা ও ব্যক্তিগত জীবন : জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ তার ব্যক্তিগত সততা ও সাদাসিধে জীবন। তিনি ক্ষমতায় থেকেও বিলাসিতা করেননি। তার পরিবার রাষ্ট্রের সম্পদে ভাগ বসায়নি। এই সততা তাকে সাধারণ মানুষের চোখে আলাদা করে তোলে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে দুর্নীতি একটি বড় সমস্যা, সেখানে জিয়াউর রহমানের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি আজও মানুষ স্মরণ করে শ্রদ্ধার সঙ্গে।
৯. শহীদ হওয়া ও অসমাপ্ত স্বপ্ন : ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ড জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়। তিনি শহীদ হন ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নয়, বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সংগ্রামের মাঝপথে। একজন নেতা যখন অসমাপ্ত স্বপ্ন রেখে শহীদ হন, তখন তিনি ইতিহাসে পরিণত হন। জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। মানুষ মনে করেÑ তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ আরও ভিন্ন হতে পারত। এই ‘অসমাপ্ততার বেদনা’ তার জনপ্রিয়তাকে আরও গভীর করেছে।
১০. উত্তরাধিকার ও চলমান প্রভাব : আজও জিয়াউর রহমান কেবল ইতিহাসের পাতায় আবদ্ধ নন। তার আদর্শ বহন করে চলছে বিএনপি, তার রাজনৈতিক দর্শন বহন করছেন তার উত্তরসূরিরা। বিশেষ করে তার পরিবারÑ বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানÑ এই আদর্শকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিএনপি আজ তার হাত ধরে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে তৃতীয় প্রজন্মে পদার্পণ করল।
মানুষ দেখে- এই ধারাটি এখনও টিকে আছে, এখনও লড়ছে। ফলে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা কেবল স্মৃতিচারণ নয়Ñ এটি একটি চলমান রাজনৈতিক বিশ্বাস।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জনপ্রিয় ছিলেন, আছেন এবং থাকবেনÑ কারণ তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়ক। তিনি রাজনীতি করেছেন মানুষের জন্য, ক্ষমতার জন্য নয়। তিনি দেশকে ভালোবেসেছেন নিঃস্বার্থভাবে, নিজের জীবন উৎসর্গ করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক শাসক এসেছেন, অনেক নেতা গেছেনÑ কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যারা জাতির হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিতে পেরেছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের অন্যতম। তাই আজও যখন মানুষ বলেÑ ‘জিয়া মানেই স্বাধীনতা, জিয়া মানেই বাংলাদেশ’Ñ তখন সেটি কোনো স্লোগান নয়, বরং ইতিহাসের গভীর সত্য।
আমিরুল ইসলাম কাগজী
সিনিয়র সাংবাদিক