× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শামসুল হক

ইতিহাসের ভুলে যাওয়া এক নায়ক

এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৭ এএম

শামসুল হক।

শামসুল হক।

শামসুল হক ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’-এর প্রতিষ্ঠাতাকালীন প্রথম সাধারণ সম্পাদক। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগই ১৯৫৫ সালে ‘আওয়ামী লীগ’-এ রূপান্তরিত হয়। যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগের এই প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হয়েও রাজনীতির ইতিহাসের আড়ালেই রয়ে গেছে শামসুল হকের নাম। ১৯৪৭-পরবর্তী রাজনীতিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় রাজনৈতিক সংগঠক ছিলেন শামসুল হক। বিশেষ করে দেশ ভাগোত্তর পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনৈতিক অভিযাত্রা এবং পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকারবিরোধী রাজনীতিতে তিনি ছিলেন প্রথম সারির নেতা। ছিলেন পাকিস্তান গণপরিষদের সংসদীয় কমিটির সদস্য। যার জন্ম হয়েছিল টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার এক নিভৃত গ্রাম মাইঠানে ১৯১৮ সালে ১ ফেব্রুয়ারি মামাবাড়িতে। তার পৈতৃক বাড়ি একই উপজেলার টেউরিয়া গ্রামে।

অপ্রিয় হলেও সত্য, তিনি আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে প্রায় বিস্মৃত। শামসুল হকের কথা এখনও অনেকেই জানেন না। যে দল তিনি গড়েছিলেন, যে দলে তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, ওই দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও তাকে ভুলতে বসেছিল। ঘটা করে কেউ শামসুল হকের জন্মদিন বা মৃত্যুদিনও পালন করে না। শামসুল হকের প্রথম জীবনে যতই বর্ণাঢ্য ও আলোকোজ্জ্বল হোক না কেন, শামসুল হকের শেষ জীবন ছিল কষ্টের ও মর্মান্তিক।

উল্লেখ্য, ১৯৪৪ সালের ৯ এপ্রিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অন্যতম নেতা পণ্ডিত আবুল হাশিম প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগ কর্মী শিবিরের অন্যতম সংগঠক ছিলেন শামসুল হক। এই কর্মী শিবির থেকেই পরবর্তীতে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরে আওয়ামী লীগ) জন্ম লাভ করে। তার নেতৃত্বেই এই কর্মী শিবির ১৯৪৫-৪৬ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগকে জনসাধারণের গণসংগঠনে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তান সৃষ্টিতে শামসুল হকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান অস্বীকার করা সম্ভব নয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তৎকালীন নেতৃত্ব অর্থাৎ খাজা নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমীন ও ইউসুফ আলি চৌধুরী (ওরফে মোহন মিঞা) গংরা মুসলিম লীগকে তাদের পকেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। এর প্রতিবিধানের লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে ১৫০ নং মোগলটুলির অফিসে শামসুল হক, কামরুদ্দীন আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান নানা চেষ্টা অব্যাহত রাখলেও কোনো ফলাফল হয় নেই। ফলে তারা নতুন সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন থেকে ২৪ জুন ঢাকা রোজ গার্ডেনে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের বিরোধী রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। মওলানা ভাসানী ছিলেন এই দলের সভাপতি। শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক, শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামটি থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্ররা সারা প্রদেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেয়। ছাত্রদের সেই আন্দোলনে যেসব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি সেদিন গ্রেপ্তার হন তাদের মাঝে ছিলেন শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ অন্যতম। এই দিনের সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রদের সঙ্গে চুক্তি করেন। চুক্তিপত্রটি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগে সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে শামসুল হকসহ বন্দি ছাত্রনেতাদের চুক্তিপত্রটি দেখিয়ে তাদের সম্মতি নিয়ে আসেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের অভিযোগে শামসুল হক গ্রেপ্তার হন এবং কারাবরণ করেন। কারাগারে সরকারের অত্যাচারের ফলে ১৯৫৩ সালে অত্যন্ত অসুস্থ শরীর ও মানসিক ব্যাধি নিয়ে কারামুক্তি লাভ করেন। আর সে সময়ই তাকে দল থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছিল। তার পরের ইতিহাস অত্যন্ত করুণ ও বেদনাদায়ক। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত মানসিক ভারসাম্যহীন শামসুল হককে পথে পথে ঘুরতে দেখেছেন অনেকেই। নতুন দল গঠনের জন্য পরিচিত অনেকের কাছে চাঁদাও চেয়েছিলেন তিনি। তারপর হঠাৎ তিনি নিখোঁজ হন। এই নেতার নিখোঁজ নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে রহস্যের সৃষ্টি হয়।

তার মৃত্যুর প্রায় ৪২ বছর পর ২০০৭ সালে শামসুল হক গবেষণা পরিষদ টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কদিম হামজানিতে তার কবর আবিষ্কার করে। ডা. আনসার আলী তালুকদার নামের একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ২০০৭ সালে টাঙ্গাইল শহরের ব্যাপারীপাড়ায় মেয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়ে উদ্ঘাটন করেন শামসুল হকের মৃত্যুরহস্য। তার বরাতেই জানা যায়, সেখানে এক বাড়িতে রঙিন একটি ক্যালেন্ডারে শামসুল হকের ছবি দেখতে পান তিনি। ক্যালেন্ডারে শামসুল হকের ছবির পাশে বাংলা হরফে লেখা ছিল ‘আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও ভাষা আন্দোলনের রূপকার’। 

শামসুল হক গবেষণা পরিষদের মাধ্যমেই দেশবাসী জানতে পারে, ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে জোকারচর গ্রামের মহিউদ্দিন আনসারী নামের এক নামকরা কংগ্রেস নেতা কলকাতা থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। ফেরার পথে কোনো এক স্থানে মানসিক ভারসাম্যহীন ও ভয়াবহ অসুস্থ অবস্থায় শামসুল হককে দেখতে পেয়ে তিনি বাড়িতে নিয়ে আসেন। সে সময় গ্রামের হাতেগোনা কয়েকজন সচেতন ও শিক্ষিত লোক ছাড়া শামসুল হককে কেউ চিনতেন না। অসুস্থ শামসুল হক মহিউদ্দিন আনসারীর বাড়িতে ৭ দিন থাকার পর জ্বরে ভুগে ১৯৬৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। স্থানীয় হোমিও চিকিৎসক শুকলাল দাস শামসুল হকের চিকিৎসা করেন। তিনি যেদিন মারা যান সেদিন ছিল শনিবার, ওই এলাকার হাটবার। হাটে গইজা খলিফার দোকান থেকে ডা. আনসার আলী ও কংগ্রেস নেতা মহিউদ্দিন আনসারীর মেজো ছেলে রইসউদ্দিন আনসারী কাফনের কাপড় কিনে আনেন। মহিউদ্দিন আনসারীর বাড়ির সামনের ছোট মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শামসুল হককে কদিমহামজানি কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ডা. আনসার আলী মনে করেন, মহিউদ্দিন আনসারী ছিলেন নামকরা একজন কংগ্রেস নেতা। অপরদিকে শামসুল হক ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনীতি করলেও তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ছিল। একজন কংগ্রেস নেতার বাড়িতে শামসুল হক মারা যাওয়ার ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক কলহ ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হতে পারেÑ এমন আশঙ্কা করেই শামসুল হকের মৃত্যুর ঘটনা গোপন রাখা হয়। এরপর এক সময় বিষয়টি সবাই ভুলে যায়।

এমন একদিন অবশ্যই আসবে যখন কেউ না কেউ এগিয়ে আসবেন আবেগ-কল্পনা-পূর্বনির্ধারিত ধারণা-দলীয় বা গোষ্ঠীগত দৃষ্টিভঙ্গি ও আচ্ছন্নতাÑ নেতা বা দলের প্রতি অন্ধভক্তিবাদ-আত্মমহিমার মোহ ইত্যাদির ঊর্ধ্বে উঠে নিরঙ্কুশ সত্যের আলোকে প্রামাণ্য ইতিহাস লিখতে। নিশ্চিত যে ইতিহাস আবার পর্যালোচিত হবেÑ যার যা প্র্যাপ্য তাকে তা দেওয়া হবে। ১ ফেব্রুয়ারি ছিল শামসুল হকের ১০৮তম জন্মবার্ষিকী। তার প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।


এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা