জলাভূমি দিবস
অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:২৪ পিএম
জলাভূমি কেবল প্রকৃতির একটি অংশ নয়, বরং এটি আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি, জীবনধারা এবং ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র। জলাভূমি আমাদের শেকড় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বাঙালি সংস্কৃতির নাড়ির টান পানির সঙ্গে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে হাওর, বাঁওড়, বিল এবং পুকুর কেবল বাস্তুসংস্থানের অংশ নয় এগুলো আমাদের ইতিহাসের সাক্ষী। জলাভূমিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এদেশের কৃষি, মৎস্য শিকার এবং লোকজ জীবন। লোকজ সংস্কৃতি ও উৎসবের উৎস জলাভূমিকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে আমাদের লোকসংগীত এবং লোকগাথা। ২ ফেব্রুয়ারি প্রতিবছর বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালন করা হয়। বিশ্ব জলাভূমি দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য : ‘জলাভূমি ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান : আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উদযাপন’।
দুর্ভাগ্যবশত, নগরায়ণ এবং অবৈধ দখলের ফলে আমাদের জলাভূমিগুলো আজ বিপন্ন। জলাভূমি হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো সেই হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া। জলাভূমি শুকিয়ে ফেললে কেবল মাছ বা উদ্ভিদ হারিয়ে যায় না, হারিয়ে যায় একটি অঞ্চলের, জীবনযাপনের ধরন এবং পরিবেশ রক্ষার প্রাচীন কৌশল। জলাভূমি রক্ষা করা মানে অস্তিত্ব এবং সংস্কৃতিকে রক্ষা করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, কাদা-পানির এই ঘ্রাণই আমাদের আসল পরিচয়।
একটি জলাভূমি নানাভাবে মানুষকে সহায়তা করে। মানুষের খাদ্য, পুষ্টি, বিনোদন, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রকে সুরক্ষা করা কৃষিকাজে সহায়তা করা, পেশাকে টিকিয়ে রাখা, প্রাণবৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখাসহ একটি অঞ্চলের জীবন-ব্যবস্থাপনাকে সহায়তা করে থাকে। বলা হয়Ñ ‘হাওর, জঙ্গল, মইষের শিংÑএ নিয়ে ময়মনসিং। শুধু কি হাওর-জঙ্গল? না, ছোট-বড় অনেক খালবিলও আছে প্রাচীন এ জেলায়। দেশের সবচেয়ে বড় বদ্ধ জলাশয় ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের ‘বড়বিলা’। আশ্বিন-কার্তিক মাসের শুরু থেকে শীতকালজুড়েই বিলে থাকে অসংখ্য শাপলা। দূর থেকে ফুল দেখলে মনে হয় লাল আর সবুজের মাখামাখি। সবুজ পাতায় ঢাকা পড়া বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর হাজারো রঙিন শাপলা বিছিয়ে রেখেছে তার আপন রূপ।
এক অদ্ভুত ধরনের খেলা হয় বড়বিলায়। প্রতিবছর মহান বিজয় দিবসে এই কুন্দা বাইচের আয়োজন করা হয়। কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার জন্য লোকপ্রযুক্তির তৈরি কুন্দা ব্যবহার করা হয়। সেই কুন্দা নিয়ে কৃষকরা বড়বিলার বুকে কুন্দা বাইচের প্রতিযোগিতায় নামেন। বড়বিলার জলরাশি এলাকার কৃষি সেচের পানির চাহিদা পূরণ করত। পানির স্তরকে টিকিয়ে রাখত। বিলের জলে জলজ খাবার উৎপন্ন হতো, যা দিয়ে গ্রামের মানুষ পুষ্টির চাহিদা পূরণ করত। বিলের মাছ বিলপাড়ের মানুষের চাহিদা মেটাত। অনেক বন্যপ্রাণী আশপাশে বসবাস করত। বর্তমানে দখল ও দূষণের কারণে বড়বিলা ছোট হয়ে আসছে। বিলের হিজল গাছগুলো কমে গেছে। পাখি আর বিল থেকে আগের মতো খাবার সংগ্রহ করতে পারে না।
বড়বিলার পাড়ে আছে শতবর্ষী গাছ কাঠগোলাপ। এ গাছের নিচে প্রতিবছর মারফতি গানের আসর বসে। সারারাত এ গান চলে। বিলে অনেক হিজল করচ গাছের বাগান ছিল কিন্তু বর্তমানে গোপালের বাঁধে ৫-৬টি হিজল গাছ আছে। সব গাছ কেটে ফেলেছে গাছখেকোরা। দেশের বৃহত্তম বদ্ধ জলাভূমি ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের বড়বিলা বিল দখলকারীদের জবরদখলে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। যে যার মতো বিলের জমি জবরদখল করে ফসলি জমি তৈরি করছে। এদিকে ৩ বছরের জন্য ইজারা নিয়ে ইজারাদার সরকারিভাবে খনন করা ৩টি পুকুরের পাড় কেটে নিজের পুকুরের সঙ্গে এক করে ফেলেছেন। স্থানীয় প্রশাসন জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।
বড়বিলায় মিঠা পানির পদ্ম, শাপলা, শালুক, কলমি, হেলেঞ্চা, সিংড়া, পানিফল, জলজ উদবিড়াল, কচ্ছপ, কাছিম, মেছো বিড়াল অনেক প্রাণীসহ দেশি প্রজাতির স্বাদুপানির মাছ কই, শিং, মাগুর, লাটি, খৈইস্যা। একসময় ভোঁদড় ও কাছিম পাওয়া যেত। এখন ভোঁদড় নেই; কাছিম মেলে খুব কম। সারা বছরই বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসে দর্শনার্থীরা। কিন্তু প্রতিবছর, বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে বিলের সরকারি খাসজমি মাটি দিয়ে ভরাট করে দখলে নিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। বড়বিলায় শীতের শুরুতে বালিহাঁস, বাটুল, চখাচখি, শামুকখোলা, ছোট সারস, ডুবরি, কাদাখোঁচা, পাতিহাঁস, বুটি হাঁসসহ হাজার হাজার অতিথি পাখির আগমন ঘটে। পাখির কলরবে মুখর থাকে বড়বিলা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শীতের সময় প্রতিদিন এক-দেড় হাজার ও অন্য সময় এক-দেড়শ পর্যটক আসে পদ্ম-শাপলায় ভরা বিলের সৌন্দর্য দেখতে। নৌকায় চড়ে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করে তারা। বিল ভরাট ও জীববৈচিত্র্য অনেকটা ধ্বংস হওয়ার কারণে অতিথি পাখি ও পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিলপাড়ে যাদের রেকর্ডকৃত জমি রয়েছে, তারাই বিলের জমি বেশি ভরাট করছেন। প্রতিবছর শুকনো মৌসুমে রাতে বিলের সরকারি খাসজমিতে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে ভরাটের ‘মহোৎসব’ চলে। বড়বিলায় অনেক জাতের মাছ পাওয়া যায়। বড়বিলার পাড়ের জেলেরা এই বিল থেকে সারাবছরই মাছ ধরে। নিজে খায় এবং স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে। বিলে সরপুঁটি, পুঁটি, ট্যাংরা, পাবদা, কই, মাগুর, শোল, টাকি, বুজুরী, গুতুম, ইছা, বৈচা, মলা, ঢেলা, শিং, গজার, বেদুরি, চান্দা, খৈইসা, চিকরা, কাঁকড়া, বোয়ালসহ সব প্রজাতির মাছ এখনও বড়বিলায় পাওয়া যায়। স্থানীয় বাজারে এসব মাছের অনেক চাহিদা।
প্রতিবছর সরকারি খাসজমি বেদখল হওয়ায় বিলের আয়তন ছোট হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বিলের বড় অংশ লিজ দেওয়া, ক্ষতিকর জালের অতি ব্যবহার ইত্যাদি কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। সম্প্রতি এক্সকাভেটর দিয়ে বিলের পাড়ের টিলা কেটে বিলের দুই একরের বেশি জমি ভরাট করে দখলে নেওয়া হয়েছে। আর গত ২০ থেকে ২১ বছরে প্রভাবশালীরা অন্তত ১০০ একর বিল ভরাট করে দখলে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয় লোকজন। বিলের চারদিকে সরকারি ১৫ থেকে ২০ ফুট চওড়া রাস্তা ছিল। সেই রাস্তাও কেটে বিল ভরাট করেছে দখলকারীরা। উপজেলা মৎস্য অফিস ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের রাঙামাটিয়া, পাহাড় অনন্তপুর, হাতিলেইট, বাওলাবাজার ও আনুহাদিÑ এই পাঁচটি গ্রামের মাঝখানে বড়বিলা বিলের অবস্থান। এর আয়তন শুকনো মৌসুমে ৩৬৮ একর, আর বর্ষা মৌসুমে হয় প্রায় ১০০০ একর। এর মধ্যে বিলে প্রায় ৩৬১ একর সরকারি খাসজমি রয়েছে।
প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অনেক ফ্যাক্টরের জন্যই জলাভূমির উদ্ভিদ ও প্রাণী বহুমুখী সংকটে। গবেষণা নির্দেশ করে এদেশে চারভাগের এক ভাগ প্রজাতি আজ ধ্বংসের মুখে। দখল, বাণিজ্যিক চাষ, অযাচিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, কীটনাশক দ্বারা মাত্রাতিরিক্ত দূষণ, আক্রমণকারী প্রজাতির আধিক্য, বাধাগ্রস্ত ফ্লো রিজিম এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বড় বড় বিল ও জলাভূমির মাছ ও উদ্ভিদের গুণাগুণ বা অবস্থা মোটেই সন্তোষজনক নয়। এই অবস্থায় জলাভূমি সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। সরকার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য আইন ও বিধি যেমন, বাংলাদেশ বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি অ্যাক্ট ২০১৭, প্রোটেক্টেড এরিয়া ম্যানেজমেন্ট রুলস ২০১৭, ইকোলোজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া ম্যানেজমেন্ট রুলস ২০১৬, ফিস অ্যাক্ট ১৯৫০ (সংশোধিত ২০১৪) এবং ওয়ার্ল্ড (প্রিসারভেশন এবং সিকিউরিটি) অ্যাক্ট ২০১২ প্রণয়ন করেছে। তবে এসবের ‘সঠিক’ বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে অনেক অভিযোগ আছে। জলাভূমির উন্নয়নে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং জলমহালের লিজিং সিস্টেম ঢেলে সাজানো অত্যাবশ্যক। মোটকথা হচ্ছে, বিভিন্ন স্তরে (স্থানীয় হতে জাতীয়) ‘জলাভূমির শাসন’ শক্তিশালীকরণ ব্যতীত জলাভূমির সঠিক সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।
অহিদুর রহমান
পরিবেশকর্মী