× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মিথ্যা মামলা

আইনের শাসন নিশ্চিতেই সমাধান

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:১৩ পিএম

আইনের শাসন নিশ্চিতেই সমাধান

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে পরিকল্পিতভাবে হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশে এই ধরনের প্র্যাকটিস বহুদিনের। এসব প্রবণতা কেবল বিরোধী রাজনীতিকে কোণঠাসা করছে না সমাজজুড়ে সৃষ্টি করছে গভীর আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। এমনও দেখা গেছে, অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠতা না থাকা সত্ত্বেও রাজধানীসহ সারা দেশে প্রচুর হয়রানিমূলক মামলা হচ্ছে। মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এসব মামলা করা হয়। মামলাগুলোর মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, দুর্বল করা। এসব মামলার তালিকায় নারীঘটিত মিথ্যা মামলাও বেড়েছে। ফলে আদালতপাড়ায় বিচারপ্রার্থীরা বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হচ্ছেন। 

হয়রানিমূলক মামলাগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো এসব মামলার লক্ষ্য ন্যায়বিচার নয়, বরং ভয় দেখানো এবং হয়রানি-হেনস্তা করা। রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী কিংবা ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবন ও কাজকে অচল করে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন থানায় একাধিক মামলা, কখনও পুরনো বা অজ্ঞাত ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়ার নজিরও দেখা যাচ্ছে। ফলে আদালতে হাজিরা, জামিন, আইনজীবীর খরচ সব মিলিয়ে ব্যক্তি ও পরিবার চরম মানসিক ও আর্থিক চাপে পড়ে।

৩১ জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘মিথ্যা মামলার লাগাম টানা যাচ্ছে না’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে কয়েকটি ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, তদন্তের সময় মামলার বাদী ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করতে পারেননি। অনেক মামলার ক্ষেত্রে ঘটনার সঙ্গে বিবাদীর ন্যূনতম সম্পৃক্ততাও নেই। উল্লেখ্য, ব্যক্তিগত স্বার্থে এ ধরনের মামলা করা হয়ে থাকে বলে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এসব বিষয়ে প্রজ্ঞাপন দেওয়া হলেও পরিস্থিতি খুব একটা উন্নত হয়নি।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, শেখ হাসিনার শাসনামলের ১৫ বছরে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮২৫টির বেশি মামলা হয়। যার বড় অংশই মিথ্যা ও হয়রানিমূলক। খোদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে ৫০০ মামলা দেওয়া হয়। এসব মামলা বিশ্লেষণ করে সত্যতা ও ন্যূনতম সম্পৃক্ততা মেলেনি। পুলিশের দেওয়া তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে দেশব্যাপী ১৫ হাজারের কিছু বেশি নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় চার হাজার মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ তদন্তে ঘটনার কোনো প্রমাণ পায়নি বলে মামলা বিচার পর্যন্ত গড়ায়নি। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আশা করা হয়েছিল বিচার বিভাগ তার স্বাধীনসত্তা খুঁজে পাবে। সাধারণ মানুষ আর হয়রানিমূলক মামলার শিকার হবেন না। কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা।

সিনিয়র আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেছেন, ‘এ ধরনের হয়রানিমূলক মামলা বহুদিন ধরে হয়ে আসছে। আমরা আশা করেছিলাম ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর এসব থেকে আমরা মুক্ত হব। কিন্তু গত ১৭ মাসে শত শত নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে। যাদের আশি শতাংশ মামলা এফআইআরে নাম দেওয়া ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এটা প্রত্যাশিত নয়।’ সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, ‘হয়রানিমূলক মামলার বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন এবং আইনি প্রশাসনকে সক্রিয় করতে হবে, দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’ দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন সংগঠন ও আইন সংশ্লিষ্টরা নানা সময়ে এসব মামলার বিষয়ে প্রতিবাদ করেও হয়রানিমূলক মামলার লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।

বাস্তবে এই ধরনের মামলায় রাজনীতিতে তৈরি হয় ভয়ের পরিবেশ। মাঠে-ময়দানে সক্রিয় থাকার বদলে বিরোধী নেতাকর্মীরা আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যেতে বাধ্য হন। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, মতবিনিময় বা আন্দোলনের অধিকার কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর। হয়রানিমূলক মামলার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলোÑ এতে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা হারায়। সাধারণ মানুষ যখন দেখে আইন প্রয়োগ হচ্ছে অন্যায়ভাবে, তখন তারা ন্যায়বিচারের প্রতি আশা হারায়। তখন আর ‘আইন’ সুরক্ষার প্রতীক থাকে না, হয়ে ওঠে এক আতঙ্কের নাম।

আমরা বিশ্বাস করি, ভিন্নমতকে দমন নয়, সহনশীলতার মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। আর গণতন্ত্রের শক্তি ভয় দেখিয়ে নয়, বিশ্বাস থেকে তৈরি হয়। আমরা যদি হয়রানিমূলক মামলা ও আতঙ্কের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকার আইনের শাসন ও রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে না পারি, তা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের গণতন্ত্র, ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো দেশ।

আমরা মনে করি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন কিংবা ভিন্নমত স্তব্ধ করতে হয়রানিমূলক মামলার অপব্যবহার বন্ধ হওয়া উচিত। এই ক্ষেত্রে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মামলা দায়েরের আগে প্রাথমিক তদন্ত বাধ্যতামূলক করা এবং দুর্বল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ গ্রহণ না করার বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। এই ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। আদালতকে দ্রুত শুনানির মাধ্যমে হয়রানিমূলক মামলা চিহ্নিত করে তা খারিজ করার নজির বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন জরুরি।

আমরা মনে করি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ ছাড়া এই সংস্কার সম্ভব নয়। আইনকে দলীয় হাতিয়ার বানালে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম আচরণবিধি ও সহনশীলতার চর্চা গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে শক্ত ভূমিকা রাখতে হবে। হয়রানিমূলক মামলার তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান, জনসমক্ষে আলোচনা ও ধারাবাহিক চাপÑ এই অপপ্রবণতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। আইনের শাসন নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এই আতঙ্কের অবসান ঘটবেÑ এটাই বাস্তব সত্য।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা