শিক্ষকতা
ড. মাহরুফ চৌধুরী
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৫৪ এএম
শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে একজন শিক্ষকের ন্যূনতম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। প্রথমটি হলো শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা (সেইফ গার্ডিং), দ্বিতীয়টি হলো শিক্ষার্থীর মানসিক ও সামাজিক কল্যাণে সজাগ ও সহানুভূতিশীল থেকে তাকে সাহায্য করা (পাস্টোরাল কেয়ার) এবং তৃতীয়টি হলো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত চাহিদা ও সম্ভাবনার প্রতি সংবেদনশীল থেকে শেখার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা (টিচিং)। এই দায়িত্বগুলো কোনো যান্ত্রিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মতালিকার অংশ নয়; বরং তারা একটি অন্তর্গত নৈতিক বন্ধনে আবদ্ধ, যার প্রথম দুটির অনুপস্থিতি শেষেরটির কার্যকারিতা ও বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই তিনটি দায়িত্ব একত্রে সামগ্রিক শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার ভিত্তি স্থাপন করে। শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা কেবল শারীরিক সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি তার মানসিক নিরাপত্তা, পরিচয়ের স্বীকৃতি ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানকেও নিশ্চিত করাকে বোঝায়। যেখানেই এই নিরাপত্তা ব্যাহত হয়, সেখানেই শেখার পরিবেশে বিষ ছড়িয়ে পড়ে। আবার শিক্ষার্থীর সামাজিক-আবেগিক কল্যাণের প্রতি শিক্ষক যদি নিস্পৃহ থাকেন, কিংবা তার মধ্যে সহানুভূতির অভাব দেখা দেয়, তবে শিক্ষাদান নিছক তথ্য পরিবেশনের একপেশে প্রয়াসে পরিণত হয়, যার মধ্যে জীবন গঠনের আকাঙ্ক্ষা ও অনুপ্রেরণা অনুপস্থিত থাকে।
প্রখ্যাত
ব্রাজিলিয়ান শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘নিপীড়িতের শিক্ষা’ (প্যাডাগোজি
অব দ্য অপ্রেসড)-এ বলেছিলেন, ‘পরিচয়ের অনুভূতি ছাড়া, মুক্তির জন্য প্রকৃত সংগ্রাম
হতে পারে না’। একজন শিক্ষকের যদি শিক্ষার্থীর অস্তিত্ব, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা
না থাকে, তবে তার শিক্ষা চর্চা শুধুই প্রভুত্বমূলক হয়ে ওঠে, মুক্তি বা স্বাধীনতার নয়।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, শিক্ষকের নৈতিক অবস্থান তার মানবিক প্রতিশ্রুতি দ্বারা নির্ধারিত
হয়। তিনি কেবল পাঠদান করেন না, বরং একেকজন শিক্ষার্থীর জীবনে নীরব অভিভাবকের মতো উপস্থিত
থাকেন, বিশেষ করে একজন আশ্রয়দাতা, পথপ্রদর্শক ও সহযাত্রী হিসেবে। তাই, শিক্ষকতার এই
তিনটি মৌলিক দায়িত্বের যেকোনো একটি অবহেলার অর্থ শিক্ষক হিসেবে শুধু পেশাগত ব্যর্থতা
নয়, বরং নৈতিক বৈকল্যও বটে। যেখানে নৈতিক দায়বদ্ধতা অনুপস্থিত, সেখানে শিক্ষা নয়, বরং
ক্ষমতার অনুশীলনই মুখ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষকতার প্রকৃত মূল্যবোধ তাই নির্ধারিত হয় এই প্রশ্নে
যে, আমি আমার ছাত্রের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য কতটা দায় অনুভব করি?
শিক্ষকের
দায়িত্ব কখনোই কেবল শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা শ্রেণিকক্ষের চার
দেয়ালের বাইরে বিস্তৃত এক মানবিক জগতেও তার দায়িত্বের পরিধি প্রসারিত হয়। পাঠদান শিক্ষকতার
একটি মৌলিক উপাদান হলেও, তা কেবল বাহ্যিক কাঠামোর দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড। অন্তরের পরিসরে,
একজন শিক্ষক হয়ে ওঠেন এক ‘নিরাপদ মানুষ’ ও ‘আশ্রয়স্থল’ যার উপস্থিতিতে একজন শিক্ষার্থী
নিজের অস্তিত্ব, কৌতূহল, ভুল এবং স্বপ্ন নিয়ে নির্ভয়ে আশ্রয় নিতে পারে। এই বিশ্বাস
ও নির্ভরতার জগতেই গড়ে ওঠে এক সুস্থ শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, যার ভিত্তি শুধুই একতরফা
জ্ঞানের স্থানান্তর নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, সহানুভূতি ও মানবিক সংযোগ। যখন শিক্ষার্থী
তার শিক্ষকের মধ্যে কেবল একজন ‘জ্ঞানদাতা’ নয়, বরং একজন শ্রোতা, একজন সহানুভূতিশীল
অভিভাবক, এবং একজন আত্মার দার্শনিক বন্ধুকে আবিষ্কার করে, তখন তার মধ্যে শেখার ইচ্ছা
প্রকৃত অর্থেই জাগ্রত হয়। আত্মবিশ্বাসের যে আলো তার মধ্যে তখন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তা
শুধু পরীক্ষার ফলাফলে নয়, বরং তার আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ ও সামাজিক বোধে প্রতিফলিত হয়।
সে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে ধ্যানে, জ্ঞানে ও মননে এমন এক নাগরিক হিসেবে, যে শুধু নিজের
জন্যই নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের দিকেও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এই প্রসঙ্গে আলবার্ট
আইনস্টাইনের অভিমত বিশেষভাবে স্মরণীয়। তার মতে, সৃজনশীল প্রকাশ এবং জ্ঞানের মধ্যে আনন্দ
জাগ্রত করা শিক্ষকের সর্বোচ্চ শিল্প। একজন প্রকৃত শিক্ষক সেই শিল্পী, যিনি কেবল শিক্ষার্থীর
মস্তিষ্ক নয়, তার হৃদয় ও কল্পনাশক্তিকেও জাগিয়ে তোলেন।
তবে
এই মূল্যবান কথাগুলো এখন আর কেবল পাঠ্যসূচির অন্তর্গত নীতিনির্দেশ বা শিক্ষকতা-সংক্রান্ত
তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার সময় নয়। এগুলো অনুসরণ করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা
করা আজ এক কঠোর বাস্তবতা, সময়ের জোরালো দাবি। কারণ আজ যখন আমরা দেখি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,
যা একসময় শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল, তা নানা কারণে নিরাপত্তাহীনতার
ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। যখন কিছু কিছু ঘটনায় শিক্ষকদের নীরবতা, নির্লিপ্ততা বা ক্ষেত্রবিশেষে
প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে, তখন কেবল কণ্ঠে শিক্ষার মূল্যবোধ
জপে যাওয়ায় আর কোনো মুক্তি নেই। প্রয়োজন নতুন করে দায়বদ্ধতার পুনর্মূল্যায়ন, নৈতিক
অবস্থানের সাহসী পুনর্নির্মাণ।
আপনি
যদি শিক্ষক হন, কিংবা নিজেকে শিক্ষক ভাবেন, তাহলে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন : আপনি কি সত্যিই
আপনার পেশাগত জীবনে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ও অতীতের ঘটনাগুলোর দিকে চোখ ফিরিয়ে তাকিয়ে
দেখার চেষ্টা করেছেন? ভেবেছেন কি, যে সকল ঘটনা-পরম্পরায় শিক্ষার্থীরা আহত, অবমানিত
বা নিপীড়নের শিকার হয়েছে, সেই ঘটনাগুলোর নেপথ্যে আপনি কোথায় ছিলেন? আপনি কি একজন প্রত্যক্ষদর্শী
ছিলেন, না নিছক একজন দূরদর্শী পর্যবেক্ষক, যিনি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কেবল মাথা নেড়ে
ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী হয়ে থেকেছেন? আপনি কি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যারা অন্যায়ের
প্রতিবাদ করেছিল, নাকি নিজের অবস্থান ‘নিরপেক্ষতা’ বলে আড়াল করে নিয়েছিলেন সুবিধাজনক
এক নির্লিপ্ততার মধ্যে? যদি এমন কোনো মুহূর্তে আপনি এমন এক জায়গায় ছিলেন, যেখানে অন্যায়ের
ছায়া দীর্ঘ হয়েছিল, যেখানে কণ্ঠরোধের আতঙ্ক ভর করেছিল, অথচ আপনি চুপ থেকেছেন তাহলে
আপনাকে শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করার আগে, নিজের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়তে হবে। কারণ শিক্ষকতা
শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়, এটি একটি নৈতিক অবস্থান, এক ধরনের মূল্যবোধ-ভিত্তিক নাগরিক
দায়িত্ব।
একজন
শিক্ষক কেবল তথ্যের বাহক নন; তিনি হলেন বিবেকের দীপশিখা। সেই আলো নিভে গেলে সমাজ অন্ধকারে
ডুবে যায় আর সেই দায় কার, তা নির্ধারণের জন্য খুব বেশি দূরে তাকাতে হয় না। তাকাতে হয়
কেবল আয়নায়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষকতা নিছক একটি পেশা নয়; এটি একটি আদর্শিক
অবস্থান, এক গভীর মানবিক অঙ্গীকার। এটি এমন কোনো পেশাগত পথ নয়, যেখানে কেবল নির্দিষ্ট
সময়ের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে দায়িত্ব শেষ হয়। বরং এটি এমন এক অভিযাত্রা,
যেখানে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের মনের দরজায় কড়া নাড়ে, তাকে জাগিয়ে তোলে এবং একটি
ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের বীজ বপন করে। শিক্ষকতা মানে শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়; এর
অর্থ জীবন সম্পর্কে পড়ানো তথা আত্মমর্যাদা, সংবেদনশীলতা ও বিবেকের পাঠ শেখানো। এখানে
প্রতিটি পাঠের অন্তরালে থাকে মানবিকতা, প্রতিটি উত্তরে অন্তর্নিহিত থাকে প্রশ্ন করার
সাহস, আর প্রতিটি সংলাপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের ন্যায়পরায়ণ নাগরিক গড়ার প্রেরণা।
যে শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের কেবল পরীক্ষায় পাস করাতে চান, তিনি শিক্ষকতার বাইরের খোলসটাকে
ছুঁয়ে যান মাত্র। কিন্তু যিনি তাদের মনে প্রশ্ন জাগাতে চান, তাদের হৃদয়ে প্রতিবাদের
আগুন জ্বালাতে চান, তাদের আত্মায় মানবিকতার বীজ রোপণ করতে চান তিনিই তো প্রকৃত শিক্ষক।
শিক্ষকতার
এই পেশাগত শিক্ষা-দর্শনের রূপকাররা ইতিহাসে অগণিত। সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার কবিতায় বলেছিলেন,
‘শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষা নয়, শিক্ষা মানে যুদ্ধ’। এ যুদ্ধ অজ্ঞতার বিরুদ্ধে, নিপীড়নের
বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। একজন শিক্ষক তার শ্রেণিকক্ষকে একটি মুক্ত আলোচনার মঞ্চে
পরিণত করেন, যেখানে ছাত্র শুধু শুনতে, বলতে, পড়তে ও লিখতে শেখে না, সঙ্গে সঙ্গে ভাবতে
শেখে; শুধু বোঝে না, প্রশ্ন তোলে; শুধু অনুসরণ করে না, নিজ উদ্যোগে পথ খুঁজে নেয়। এইভাবে
শিক্ষকতা হয়ে ওঠে এক মহৎ প্রতিশ্রুতি, যা শুধু বিদ্যাদানের নয়, বরং ন্যায় ও মানবিকতার
পক্ষে দাঁড়াবার প্রতিশ্রুতি।
একজন
প্রকৃত শিক্ষক তার উপস্থিতিকে শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল পাঠদানের মাধ্যম নয়, বরং একটি
আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তোলেন। এই আশ্রয় নিছক শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ
নয়। এটি এক ধরনের মানসিক, মানবিক ও নৈতিক নিরাপত্তাবোধ, যা শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস,
আত্মমর্যাদা এবং স্বপ্নের ভিত্তি নির্মাণ করে। শিক্ষার্থীরা যখন তার চোখের দিকে তাকায়,
তখন তারা খুঁজে পায় এক ধরনের নিশ্চিন্ত ভরসা; তার কণ্ঠে শুনতে পায় ন্যায়বোধের এক স্থির,
অবিচল উচ্চারণ; আর তার অবস্থানে তারা দেখতে পায় এক দৃঢ় নৈতিক অবস্থান, যা কোনো চাপে,
কোনো সুবিধার মোহে বিচলিত হয় না।
শিক্ষক
যদি ভালোবাসা দেন, যেটা নির্বাচনহীন, নিঃস্বার্থ ও আত্মিক ভালোবাসা, তাহলে শিক্ষার্থীর
মধ্যে গড়ে ওঠে এক প্রকার বিশ্বাস, যা তাকে মানুষ হতে শেখায়। সেই ভালোবাসা থেকে জন্ম
নেয় সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব, পরোপকার এবং দায়িত্ববোধ। যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শিক্ষা
সেই, যা মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, মানুষ করে’। এই ‘মানুষ করে তোলা’র পেছনে সবচেয়ে
বড় হাত একজন শিক্ষকেরই যিনি নিজে মানুষ হয়ে ওঠেন এবং তার ছাত্রদের মানুষ করে তোলেন।
আর যখন একজন শিক্ষক ন্যায়বোধ শেখান তা শুধু কথায় নয়, তার নিজের অবস্থানে, ব্যবহারে
এবং নীরব প্রতিরোধে। তখন শিক্ষার্থীরা অনুধাবন করে সমাজ কেবল নিয়ম বা আইন দিয়ে চলে
না; এর প্রাণশক্তি আসে ন্যায়, বিবেক ও সহানুভূতির মতো নৈতিক গুণাবলি থেকে। তখন শিক্ষার্থীরা
বড় হয়ে শুধু পেশাজীবী নয়, ন্যায়নিষ্ঠ নাগরিক হয়ে ওঠে, যারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের
ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভাবে।
বর্তমান
সময় আমাদের শিক্ষকতাকে কেবল পেশাগত দক্ষতা দিয়ে বিচার করতে দিচ্ছে না। এখন প্রয়োজন
প্রতিটি শিক্ষকের নিজের ভূমিকা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার। তার অবস্থান, নীরবতা কিংবা
অবস্থানহীনতাকে নৈতিক আত্মসমালোচনার চোখে নতুন করে দেখা। আত্মসমালোচনা ও আত্মপর্যালোচনার
এই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই, কারণ শিক্ষার্থীরা আর শুধু পাঠ শিখতে চায় না। তারা শিক্ষককে
দেখে, বুঝতে চায় তার অবস্থান, অনুধাবন করতে চায় তিনি সত্যের পক্ষে আছেন কি না। শিক্ষকতার
মূল হৃদয়ে রয়েছে এক ধরনের নৈতিক সাহস, যা প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের চাপকে অগ্রাহ্য করে,
সামাজিক প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়ায় এবং প্রতিটি অসহায় শিক্ষার্থীর কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে।
এই সাহসই শিক্ষককে শিক্ষক করে তোলে, নাহলে তিনি হয়ে ওঠেন কেবল একজন পাঠদাতা, যিনি পঠিত
পাঠদানের বাইরে শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ হয়ে উঠতে পারেন না।
শিক্ষকতা
কখনোই কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালনের আরামদায়ক ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়া নয়; এটি একটি সচেতন
নৈতিক অবস্থান, একটি জীবন্ত মানবিক প্রতিশ্রুতি, যা প্রতিনিয়ত আত্মসমালোচনার আয়নায়
নিজেকে যাচাই করে। শিক্ষক কেবল সেই মানুষটি নন, যিনি শ্রেণিকক্ষে পাঠ দেন; তিনি সেই
মানুষ, যার উপস্থিতি একজন শিক্ষার্থীর জীবনবোধ, ন্যায়ের অনুভব এবং মানবিক আত্মসচেতনতার
ভিত গড়ে তোলে। আজকের বাস্তবতায়, যখন সমাজ জর্জরিত বৈষম্য, সহিংসতা ও মানবিক বিচ্যুতিতে,
তখন একজন শিক্ষকই পারেন সেই আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে, যিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পেশার জন্য
নয়, জীবনের জন্য প্রস্তুত করেন।
তাই বর্তমান সময়ের একজন শিক্ষককে নতুন করে ভাবতে হবে নিজেকে নিয়ে; নিজের নীরবতা, নিজের অবস্থান এবং নিজের সাহসিকতা নিয়ে। কারণ একমাত্র তিনিই পারেন সেই অদৃশ্য কারিগরের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়ে সমাজের ভিত্তি নতুন করে নির্মাণ করতে। তাই শিক্ষক হিসেবে আপনার কাছে প্রশ্ন রইল, আপনি কি সত্যিই শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করছেন? যদি না করে থাকেন, আপনি কি এখন নিজেকে তৈরি করতে ইচ্ছুক? তাহলে আজই আপনার নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতির অঙ্গীকার বাস্তবায়নে যাত্রা শুরু করুন।
ড. মাহরুফ চৌধুরী
ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য