ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০২ এএম
জাতীয় সংসদ ভবন। ছবি: বাসস
বাংলাদেশে ‘নির্বাচন’ শব্দটি কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি এক মহোৎসব, যেখানে চা-দোকানের আড্ডা থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুমের গম্ভীর আলোচনাÑ সবকিছুই আবর্তিত হয় ব্যালট আর প্রতীকের চারপাশ ঘিরে।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, সেকালের নির্বাচন ছিল এক আবেগীয় বিপ্লব, যেখানে সাদা-কালো পোস্টার আর মাইকের উচ্চকিত আওয়াজে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতো। সেই সেকেলে নির্বাচনী ব্যবস্থায় কাগজের ব্যালট পেপার ছিল জনগণের ভাগ্যবিধাতা, আর বাঁশের তৈরি শক্ত ব্যালট বাক্সগুলো সাক্ষী হয়ে থাকত লাখ লাখ মানুষের আশা-আকাক্ষার। গ্রামবাংলার মেঠোপথে তখন সাইকেলের প্যাডেলে ভর করে চলত প্রচার, আর রঙিন স্লোগানে মুখরিত হতো হাট-বাজার; যেখানে পকেটে টাকা না থাকলেও প্রার্থীর জন্য মিছিলে গলা ফাটাতে কোনো কার্পণ্য ছিল না মানুষের। সেই ‘সেকাল’ আজ আধুনিকতার পরশে বদলে গিয়ে ‘একালে’ রূপ নিয়েছে, যেখানে ডিজিটাল ব্যানার আর সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম নির্ধারণ করে দেয় জনমতের গতিপথ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সব সময়ই একটি উৎসবের নাম। সেকালে নির্বাচন মানেই ছিল পাড়া-মহল্লায় এক অভূতপূর্ব চাঞ্চল্য। সাধারণ মানুষের মাঝে আবেগীয় মিছিল ও মিটিং ছিল নির্বাচনের প্রাণভোমরা। দলবেঁধে স্লোগান দিয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে প্রার্থীর আগমনী বার্তা প্রচার করা হতো। সেই সময়কার নির্বাচনী প্রচার ছিল মূলত জনসংযোগ নির্ভর। প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের দোয়া নিতেন, আর সমর্থকরা নির্বাচনী সংগীত গেয়ে গ্রাম-গঞ্জে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিতেন। তখন নির্বাচনী ইশতেহার ছিল স্রেফ কিছু আশার বাণী, যা ছাপানো হতো সাধারণ কাগজে। মানুষ সেই ইশতেহার পড়ে স্বপ্নের জাল বুনত। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখনকার নির্বাচনে সেই আবেগ অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। মিটিং-মিছিল এখন আর শুধু পায়ে হাঁটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ডিজিটাল প্রচারণার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানের তরুণ ও জেনজি প্রজন্ম এখন আর সশরীরে মিছিলে যাওয়ার চেয়ে ফেসবুক বা টিকটকের মতো প্লাটফর্মে রিলস বানিয়ে প্রার্থীর পক্ষে জনমত গড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
সেকালের নির্বাচনী প্রচার ছিল মূলত মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি সংযোগের এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে প্রার্থীর গুণগানের চেয়েও বড় ছিল দলের প্রতি অবিচল আনুগত্য। পাড়ায় পাড়ায় তখন নির্বাচনী সংগীতের আসর বসত, ঢোল-তবলা আর হারমোনিয়ামের সুরে প্রার্থীর প্রতীককে মহিমান্বিত করা হতো। কিন্তু একালের নির্বাচনে সেই সুরের জায়গা দখল করেছে ডিজিটালি কম্পোজ করা ডিজে গান, যা ট্রাকের ওপর বিশাল সাউন্ড সিস্টেমে বেজে তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। বর্তমানের নির্বাচনী ইশতেহার এখন আর কেবল কাগজের ভাঁজে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি কিউআর কোড স্ক্যান করলেই স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে। তবে আধুনিকতার এই চাকচিক্যের আড়ালে প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচারের ধরনও বদলেছে; সেকালে যা ছিল মুখরোচক গুজব, একালের প্রযুক্তির যুগে তা রূপ নিয়েছে সুসংগঠিত ‘ফেসবুক ট্রলিং’ আর ‘ডিপ ফেক’ ভিডিওতে, যা সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে এক মুহূর্ত সময় নেয় না।
প্রথাগত নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় প্রপাগান্ডা বা অপপ্রচারের ধরন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তখন মূলত মুখে মুখে বা হাতে লেখা লিফলেটের মাধ্যমে বিপক্ষ প্রার্থীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হতো। কিন্তু একালের নির্বাচনে প্রপাগান্ডা হয়ে উঠেছে অত্যন্ত সুসংগঠিত ও প্রযুক্তিগত। সোশ্যাল মিডিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। সেকালে প্রার্থীর খরচ ছিল মূলত চা-নাস্তা আর পোস্টার ছাপানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমানে নির্বাচনী খরচ আকাশচুম্বী। বড় বড় জনসভা, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন এবং বিশাল কর্মীবাহিনীর পেছনে প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন, যা অনেক সময় নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করে ফেলে। আচরণবিধির লঙ্ঘন সেকালেও ছিল, তবে তা ছিল মূলত পেশিশক্তির প্রদর্শনী। একালে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ধরন বদলেছে; এখন অনলাইন বুলিং বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মারপ্যাঁচ ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে দমনের চেষ্টা দেখা যায়।
ভোট গণনা কেন্দ্র এবং ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়াতেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সেকালে ভোট গণনা করা হতো ভোটকেন্দ্রেই মোমবাতির আলোয় বা হারিকেন জ্বালিয়ে। প্রিসাইডিং অফিসারের ওপর স্থানীয় প্রভাব ছিল প্রবল, যা অনেক সময় স্বচ্ছতার অভাব তৈরি করত। ফলাফল ঘোষণায় দীর্ঘ বিলম্ব হতো এবং মানুষ রেডিওর সামনে বসে উৎকণ্ঠায় সময় কাটাত। পরাজিত প্রার্থীর প্রতিক্রিয়া ছিল মূলত কারচুপির অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা, আর বিজয়ী প্রার্থীর উচ্ছ্বাস গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত। একালে দ্রুত ফল পাওয়ার জন্য অনলাইন পোর্টাল ও কেন্দ্রীয় সার্ভার ব্যবহার করা হয়। তবে আধুনিক ব্যবস্থাতেও স্বচ্ছতার অভাব এবং কারচুপির অভিযোগ পিছু ছাড়েনি।
অতীতের নির্বাচনে অনুপস্থিত ভোটার বা জাল ভোটের সমস্যা ছিল এক সাধারণ বাস্তবতা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা অনেক সময় মৃত ব্যক্তি বা প্রবাসীদের ভোট দিয়ে দেওয়ার সুযোগ নিতেন। ভোটের দিন সহিংসতা ছিল নির্বাচনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে বুথ দখল বা মারামারির ঘটনা নিয়মিত সংবাদপত্রে ঠাঁই পেত। কিন্তু একালের ভোটাররা অনেক বেশি সচেতন। বিশেষ করে, জেনজি ভোটাররা কোনো ধরনের ভয়ভীতির কাছে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। তারা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় এবং যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্লাটফর্মে সোচ্চার হয়। ডাকযোগে ভোট বা পোস্টাল ভোটের বিধান আগে থেকেই থাকলেও তার ব্যবহার ছিল নগণ্য।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই দীর্ঘ পথচলায় প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও মানসিকতার পরিবর্তন খুব একটা ঘটেনি। সেকালের সেই আবেগমাখা নির্বাচন আর একালের প্রযুক্তি-নির্ভর নির্বাচনের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। একালের জেনজি ভোটাররা এমন এক নির্বাচনী ব্যবস্থা চায় যেখানে কারচুপি বা ভয়ভীতির কোনো স্থান থাকবে না। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্বাচন ব্যবস্থা যতই আধুনিক হোক না কেন, জনগণের প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটানোই হলো সফল নির্বাচনের মূল চাবিকাঠি।
বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের সেকাল ছিল আবেগের আর একাল হলো কৌশলের; তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা সেই একইÑ একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং উৎসবমুখর পরিবেশ, যেখানে তাদের একটি ভোট সত্যই দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে। ইতিহাসের এই আবর্তন কেবল ব্যবস্থার বিবর্তন নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় চরিত্রের এক আয়না, যেখানে দেখা যায় আমরা কতটা এগিয়েছি আর কতটা সেই পুরনো বৃত্তেই আটকে আছি।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
খিলপাড়া, চাটখিল, নোয়াখালী