ইমেইল থেকে
হুমায়ুন আহমেদ নাইম
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১১ এএম
আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৪ এএম
পুঁজিবাদ নিজেকে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবেই সব সময় উপস্থাপন করে। বলা হয়ে থাকে এই ব্যবস্থায় উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, বাজার প্রসারিত হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। কিন্তু পুঁজিবাদের অসম প্রতিযোগিতার ফলে সামগ্রিক জনজীবন হুমকির মুখে। সামান্যতম মৌলিক চাহিদাগুলোও তারা মেটাতে পারছে না। মূলত শ্রমিকের ঘাম ঝরানো প্ররিশ্রমে যে নগরী গড়ে ওঠে, বুর্জোয়ারা সেই নগরকে শোষণ করে নিজেদের আধিপত্য বাড়ায়, নিজেদের রাজত্ব বাড়ায়।
পুঁজির মালিক ও পুঁজির শ্রমিক এ দুয়ের দ্বন্দ্ব চিরকালের এবং সকল প্রকার রাজনীতি ও শ্রেণিসংগ্রাম মূলত এ দুই শ্রেণিকে কেন্দ্র করেই। ‘থিওরি অব সারপ্লাস ভ্যালু’-তে কার্ল মার্ক্স ব্যাখ্যা করেন, একজন উদ্যোক্তা একটা এন্টারপ্রাইজ দাঁড় করানোর পর সেখান থেকে যে আয় হয়, এর সিংহভাগই উদ্যোক্তা তথা মালিক নিয়ে নেয়। আর শ্রমিক পায় যৎসামান্যই।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিককে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য প্রদান করে না। ফলে এই ব্যবস্থাকে বুর্জোয়া ব্যবস্থা বললেও ভুল হবে না। শ্রমিকের সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং নিজেদের সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, যা সমাজের একটা বড় অংশের কোনো কাজেই আসে না। অথচ বছর শেষে দেখা যায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২৮২০ মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের চেয়ে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৮২ ডলার। গত অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২৭৩৮ ডলার। অথচ দেশে দারিদ্র্যের হার গত তিন বছরে ক্রমাগত বেড়েই চলছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
মাথাপিছু আয় বাড়ছে, একই সঙ্গে দারিদ্র্যের হারও বাড়ছে। এতেই খুব সহজেই অনুমান করা যায়, সম্পদের পরিমাণ, উৎপাদন বাড়লেও তার সুষ্ঠু বণ্টনের অভাবে একশ্রেণির হাতেই সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়ে যাচ্ছে, অন্যশ্রেণি অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেখা যায়, একজন চা-শ্রমিক দিন ২৩ কেজি গ্রিন টি পাতা সংগ্রহ করলে ১৭৮ টাকা মজুরি পান। আবার যদি ২৩ কেজি থেকে কম হয়, তাহলে কেজি প্রতি ৭ টাকা করে কমতে থাকে। এই বৈষম্য শুধু চা-শ্রমিকদের নয়, বরং পুরো শ্রমিক শ্রেণির বৈষম্যের একটা প্রকাশ। প্রতিটা সেক্টরেই মালিকশ্রেণি শ্রমিকশ্রেণিকে অর্থনৈতিকভাবে নিষ্পেষিত করে আসছে প্রতিনিয়ত সিস্টেমের দোহাই দিয়ে।
দেশের আইন, প্রশাসন সবই মালিকশ্রেণির পক্ষে। ন্যায়-অন্যায়ও নির্ধারণ হয় তাদের ক্ষমতায়। তাদেরকে আর কে-বা অপরাধী করতে পারে? এই যে মানুষটা সারাদিন কাজ করে প্রায় ২০,০০০ টাকার চা-পাতা সংগ্রহ করে বেতন পান ১৭৮ টাকা, তার হাহাকার কে শুনবে?
ছোটবেলা থেকেই পড়ে আসছি, বাংলাদেশে মিশ্র অর্থব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে পুঁজিপতিদের লাগামহীন কর্মকাণ্ডে সরকার হস্তক্ষেপ করে একটা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় নিয়ে আসবে। কিন্তু সরকার এখানে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে। দুই দিন পর পর বিশেষত ঈদ মৌসুমগুলোতে প্রায়শই গার্মেন্টস শ্রমিকরা বেতনের দাবিতে আন্দোলনে নামে। কিন্তু সরকারও পুঁজিবাদের লেবাস ধরে শ্রমিকদেরকেই সরিয়ে দেয়। অথচ গার্মেন্টস মালিকদের প্রেসার ক্রিয়েট করে শ্রমিকদের বেতন আদায় করাই মিশ্র ব্যবস্থার অন্যতম শর্ত হতে পারত।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে বস্তির সৃষ্টি করছে এবং অবাঞ্ছিত জীবন যাপন করতে শ্রমিকদের বাধ্য করছে। কিন্তু সরকারি হস্তক্ষেপই ন্যায্যতা ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। ফিরিয়ে দিতে পারে অসহায় ও মেহনতি মানুষগুলোর মৌলিক অধিকার। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রই বাংলাদেশের জনমানুষের প্রত্যাশা।
হুমায়ুন
আহমেদ নাইম
সমাজবিজ্ঞান
বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা