যৌন হয়রানি আইন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০৩ এএম
আমাদের রাষ্ট্রে, সমাজে,কর্মক্ষেত্রে, এমনকি পারিবারিক পরিবেশে কোথাও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। সবখানে নানাভাবে নারীর দিকে বিস্তৃত হয় নানান রকম থাবা। তারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় যৌন হয়রানি ও যৌন নিপীড়নের। যৌন হয়রানি সমাজের গভীরে প্রোথিত লিঙ্গবৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়াবহ রূপ, যা কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাঙ্গনে নারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে দুর্বল আইন, সামাজিক নীরবতা এবং বিচারহীনতার কারণে এ প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। কেবল ধর্ষণই নয়, আপত্তিকর ইঙ্গিত বা স্পর্শও যৌন নির্যাতন, যা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও ব্যাপক সচেতনতা জরুরি। এমন এক বাস্তবতায়, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ (আইন)-২০২৬-এর প্রস্তাবিত আইনের অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে শারীরিক, মৌখিক, ইঙ্গিতপূর্ণ ও
ডিজিটালজগতে করা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণকে যৌন হয়রানি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে কর্মক্ষেত্র
ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ অপরাধের
শাস্তি হিসেবে তিরস্কার থেকে শুরু করে পদাবনতি, চাকরিচ্যুতি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে
বহিষ্কারের বিধান রাখা হয়েছে। ২৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার
কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অধ্যাদেশের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। আমরা
মনে করি, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে এটি ইতিবাচক অগ্রযাত্রা। নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও
মানবাধিকারের পক্ষে একটি স্পষ্ট বার্তা।
অবশেষে দীর্ঘদিনের সামাজিক নীরবতা, ভুক্তভোগীদের চাপা
কান্না আর বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
নিঃসন্দেহে এটি সময়োপযোগী, প্রয়োজনীয় এবং সাহসী একটি সিদ্ধান্ত। উল্লেখ্য, অধ্যাদেশের
খসড়ায় যৌন হয়রানির বিস্তৃত সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছেÑ যেখানে শারীরিক, মৌখিক, অ-মৌখিক (ইঙ্গিতপূর্ণ),
ডিজিটাল ও অনলাইনে করা আচরণসহ জেন্ডারভিত্তিক সব অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপমানজনক কার্যকলাপ
যৌন হয়রানি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম, ই-মেইল, মেসেজিং প্লাটফর্ম
ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত হয়রানিকেও এর আওতায় আনা হয়েছে।
খসড়ায় অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটি
অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত; তদন্তকালে সুরক্ষা নিশ্চিত ও উপযুক্ত শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে।
অভিযোগ গঠনের ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। তবে এই অধ্যাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ
দিক হলো যৌন হয়রানির সংজ্ঞাকে স্পষ্ট ও বিস্তৃত করা। ফলে ‘এটা তো তেমন কিছু না’ এই
পুরনো অজুহাত আর চলবে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির প্রাতিষ্ঠানিক
কাঠামো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক অভিযোগ কমিটি গঠন, নির্দিষ্ট
সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা, ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষাÑ এসব বিধান বাস্তবায়িত হলে ভুক্তভোগীরা
অন্তত অভিযোগ জানানোর সাহস পাবেন।
এ কথা সত্য যে, সমাজের সকল স্তরে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টিকে
আজও নিশ্চিত করা যায়নি। নারীদের একটা বড় অংশ পোশাক শিল্পকারখানায় কাজ করে। অভিযোগ রয়েছে,
বেশিরভাগ কারখানায় অসংখ্য নারী কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ
মহিলা পরিষদের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যানের খুব একটা হেরফের দেখা যায় না। উদ্বেগজনক
সত্য হলো, অনেক সময় ভালো আইনও প্রয়োগে গাফিলতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও নানা জটিলতায় নিষ্ক্রিয়
হয়ে পড়ে। এই আইন যেন সেই পরিণতি না বরণ করে সেদিকে সরকারকে কঠোর নজর রাখতে বলব।
ভুলে গেলে চলবে না, সারা বিশ্বে যখন নারীর
ক্ষমতায়নের পরিসর বৃদ্ধি পাচ্ছে, লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণের মতো বিষয়গুলোকে অত্যন্ত
গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে তখন আমাদের দেশে নারীদের সার্বিক চিত্র খুব
একটা আশাব্যঞ্জক বলা যাবে না। এজন্য আমাদের সমাজে বিদ্যমান যে পুরুষতান্ত্রিক
ধ্যানধারণার আধিপত্য আছে, তা অনেকাংশেই দায়ী। আমরা মনে করি, এই দৃষ্টিভঙ্গি
পাল্টানোর জন্য যেমন শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি প্রয়োজন ন্যায়বিচারের
নিশ্চয়তা তৈরি করা। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক মানোন্নয়নও জরুরি।
আমরা আরও মনে করি, নারীদের জন্য এই আইন
অত্যন্ত জরুরি ছিল। সবকিছু ঠিক থাকলে, এটি দেশের ইতিহাসে যৌন হয়রানির যথাযথ আন্তর্জাতিক
সংজ্ঞাসংবলিত আইন হতে চলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত কারও কোনো চাপের কাছে নতি
স্বীকার না করে আইনের মূল চেতনাকে সমুন্নত রাখা। নতুবা অতীতের মতো এই আইন শুধু
কাগজে-কলমেই শক্তিশালী থাকবে, বাস্তবে নিপীড়নের শিকার ভুক্তভোগী নারীরা বিচার
পাবেন না এবং যে লক্ষ্যে বা উদ্দেশ্যে সরকার আইনটির অনুমোদন দিয়েছে তা ব্যাহত হবে।
আমরা বিশ্বাস করি, আইনটি যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর
পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নারীরা সমাজে
সংখ্যাশক্তিতে পুরুষকে ছাড়িয়ে গেলেও পুরুষতান্ত্রিকতা নারীকে দুর্বল ও অবলা করে রেখেছে।
এই মনস্তত্বও পাল্টানো এখন সময়ের দাবি।