ইমেইল থেকে
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩০ এএম
আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫২ এএম
প্লাস্টিকজাত খাবারের পাত্র থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক খাবারের মধ্যে মিশে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। একসময় প্লাস্টিককে আধুনিক জীবনের আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হলেও আজ তা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকিতে পরিণত হয়েছে। সহজলভ্যতা, স্বল্পমূল্য ও দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে প্লাস্টিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই দীর্ঘস্থায়িত্বই এখন পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ।
প্লাস্টিক এমন এক পদার্থ, যা প্রাকৃতিকভাবে সহজে পচে বা মিশে যায় না। একটি প্লাস্টিক ব্যাগ মাটিতে পচতে কয়েকশ বছর সময় লাগে। ফলে মাটি, পানি ও বাতাসÑ সবখানেই প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পরিবেশবিদদের মতে, প্লাস্টিক দূষণ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের পরই বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় পরিবেশগত সংকট।
প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। বাজারের পলিথিন ব্যাগ, বোতলজাত পানি, খাবারের প্যাকেট, ডিসপোজেবল কাপ- প্লেট, স্ট্র, কসমেটিক সামগ্রী সবকিছুতেই প্লাস্টিকের আধিপত্য। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে প্লাস্টিক ব্যবহার যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। গ্রামাঞ্চলেও এখন প্লাস্টিকের বিকল্প খুব কমই দেখা যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে কয়েক লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার বড় একটি অংশ যথাযথভাবে পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তি করা হয় না। ফলে এসব বর্জ্য ড্রেন, খাল, নদী ও খোলা জায়গায় জমে থেকে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে।
মাটিতে প্লাস্টিক জমে থাকার ফলে মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হচ্ছে। প্লাস্টিক মাটির ভেতরে পানি ও বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, ফলে জমির উর্বরতা কমে যায়। কৃষিজমিতে প্লাস্টিক বর্জ্য মিশে গেলে ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণা বা ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’-এ পরিণত হয়, যা মাটির সঙ্গে মিশে উদ্ভিদের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে। এর ফলে মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা এখনও পুরোপুরি গবেষণার আওতায় আসেনি।
প্লাস্টিক দূষণের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে নদী, খাল ও সমুদ্রে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় এ সমস্যার ভয়াবহতা আরও বেশি। প্লাস্টিক বর্জ্য নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে, যার ফলে শহরে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। সমুদ্রে জমা হওয়া প্লাস্টিক মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি। অনেক সময় মাছ প্লাস্টিক কণা খাবার ভেবে গিলে ফেলে, যা তাদের মৃত্যুর কারণ হয়। এসব মাছ পরবর্তীতে মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।
পরিবেশবিদরা বলছেন, প্লাস্টিক শুধু পরিবেশ নয়, সরাসরি মানবস্বাস্থ্যের জন্যও ভয়ংকর। প্লাস্টিক পোড়ানোর সময় যে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়, তা শ্বাসযন্ত্রের রোগ, ক্যানসার ও হরমোনজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া প্লাস্টিকজাত খাবারের পাত্র থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক খাবারের মধ্যে মিশে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন।
২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হলেও বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায় না। বাজারে এখনও অবাধে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার হচ্ছে। আইনের দুর্বল প্রয়োগ, জনসচেতনতার অভাব এবং বিকল্প ব্যবস্থার সংকট এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরিবেশবিদরা মনে করেন, শুধু আইন করলেই হবে না, এর সঠিক প্রয়োগ ও নিয়মিত নজরদারি জরুরি। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিকল্প সহজলভ্য করতে হবে।
প্লাস্টিক দূষণ রোধে প্রথম ও প্রধান প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি। মানুষকে বুঝতে হবে, প্লাস্টিকের ক্ষতি শুধু পরিবেশের নয়, নিজের ভবিষ্যতেরও ক্ষতি। পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ, কাগজ ও কাপড়ের ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করা, গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার এবং স্থানীয় পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি।
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়