‘ভেনি, ভিডি, ভিচি’
আজাদ-আল-আমিন
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৪ এএম
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: বাসস
ইতিহাসের ধুলোবালি ঝেড়ে কিছু শব্দ মাঝেমধ্যে বর্তমানের আয়নায় এসে দাঁড়ায়। লাতিন শব্দবন্ধ ‘ভেনি, ভিডি, ভিচি’ বা ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’Ñ তেমনই এক কালজয়ী অভিব্যক্তি। ৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জিলার (বর্তমান তুরস্কের জিলে) যুদ্ধে পন্টাসের রাজা ফারনাসেসকে পরাজিত করে রোমান সেনাপতি জুলিয়াস সিজার যখন রোমান সিনেটকে এই তিনটি শব্দ লিখে পাঠিয়েছিলেন, তখন সেটি ছিল সামরিক দম্ভ ও দ্রুত বিজয়ের প্রতীক।
আজ দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় পর, ২০২৬ সালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির নেতাকর্মীরা তাদের নেতা তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে এই উক্তিটির পুনর্জন্ম দিচ্ছেন। এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং একটি দলের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, আবেগ ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াইয়ের প্রতিফলন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি ছিল ক্ষমতার বাইরে। বিশেষ করে, দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবন এবং দেশে তার অনুপস্থিতি নিয়ে বিরোধী পক্ষ নানা বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। কিন্তু চব্বিশের জুলাই-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের শহর থেকে গ্রাম, মেঠোপথ থেকে রাজপথÑ সবখানেই এক নতুন উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে।
তারেক রহমানকে নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উন্মাদনা, তাকে ‘ভেনি’ বা ‘আগমনের’ বারতা হিসেবে দেখছেন সমর্থকরা। শারীরিক উপস্থিতির চেয়েও তার ডিজিটাল প্লাটফর্মের ভাষণ এবং সাংগঠনিক নির্দেশাবলি যেভাবে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছেছে, তা এক অভাবনীয় ‘জনস্ফুলিঙ্গ’ তৈরি করেছে। তরুণ সমাজ, যারা গত এক দশকে নতুন ভোটার হয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশ এবং প্রবীণদের অভিজ্ঞতার মিশেলে যে মনঃসংযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সিজারের ‘ভিডি’ ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের জন্য ‘ভিডি’ বা ‘দেখা’ বিষয়টি হলো দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে পারা। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার যে ঝুঁকি থাকে, বিএনপি তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে বলে তাদের সাম্প্রতিক সমাবেশগুলো সাক্ষ্য দেয়।
রাস্তার ধারের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, করপোরেট জগৎ কিংবা সুশীল সমাজÑ সর্বত্রই একটি পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। সাধারণ মানুষ যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ভোটাধিকার হরণ বা প্রশাসনিক জটিলতায় ক্লান্ত, তখন বিকল্প নেতৃত্বের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ে। এই যে মানুষের চোখের ভাষা পড়া এবং সেই অনুযায়ী রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করাÑ এটাই হলো আধুনিক রাজনীতির ‘ভিডি’। তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েও যেভাবে দলের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনদাবিকে ধারণ করছেন, তা সমর্থকদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছে যে, তিনি পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
ইতিহাসের পাতায় সিজারের বিজয় ছিল তলোয়ারের ডগায়। কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ‘ভিচি’ বা বিজয়ের পথটি মসৃণ নয়; এটি নির্ধারিত হয় ব্যালট পেপারে। বিএনপির নেতাকর্মীরা আজ যে আত্মবিশ্বাসে ‘ভেনি, ভিডি, ভিচি’ বলছেন, তার চূড়ান্ত সার্থকতা নির্ভর করছে দুই সপ্তাহ পর যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তার ওপর।
একটি রাজনৈতিক দলের জন্য জনসভা বা মিছিলে লোক সমাগম করা যতটা সহজ, সেই জনস্রোতকে সুসংগঠিত করে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া এবং বিজয় ছিনিয়ে আনা ততটাই চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে, দীর্ঘ সময় পর একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি যখন তুঙ্গে, তখন মানুষের এই ‘মনঃসংযোগ’ কতটা ভোটে রূপান্তরিত হবে, সেটিই দেখার বিষয়। সিজারের বিজয় ছিল তাৎক্ষণিক, কিন্তু তারেক রহমানের বিজয় নির্ভর করছে একটি দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর।
বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই জনস্ফূর্তিকে ধরে রাখা। রাজনীতিতে আবেগের জোয়ার যেমন দ্রুত আসে, তেমনি সঠিক কৌশলের অভাবে তা স্তিমিতও হতে পারে। তারেক রহমানকে নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তাকে একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখায় বাঁধতে হবে। সাধারণ মানুষ কেবল একটি মুখের পরিবর্তন চায় না, তারা ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়।
তবে এটি সত্য যে, দেশের তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে, তা বিএনপির জন্য এক বড় সম্পদ। এই তরুণরাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত তারেক রহমানের ‘সৈনিক’ হিসেবে কাজ করছে। তাদের চোখে তারেক রহমান কেবল একজন নেতা নন, বরং এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পরিবর্তনের কান্ডারি।
জুলিয়াস সিজার যখন ‘ভেনি, ভিডি, ভিচি’ বলেছিলেন, তখন তিনি জানতেন তার পেছনে আছে অপরাজেয় রোমান বাহিনী। আজ তারেক রহমানের শক্তি হলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন। ইতিহাস আর বর্তমানের এই মেলবন্ধন তখনই সার্থক হবে, যখন ভোটের ফলাফলে এই দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যদি জনমানুষের এই আকাঙ্ক্ষা সঠিক পথে পরিচালিত হয় এবং একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে তার প্রতিফলন ঘটে, তবে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তারেক রহমানের এই অধ্যায়টি ‘ভেনি, ভিডি, ভিচি’ হিসেবেই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত, এই উক্তিটি সমর্থকদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়েই থাকবে।
আজাদ-আল-আমিন
সাংবাদিক