× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আদানি চুক্তি

অর্থনীতির রক্তক্ষরণ বন্ধ করুন

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০২ এএম

অর্থনীতির রক্তক্ষরণ বন্ধ করুন

দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিদ্যুৎ খাত নিয়ে ‘স্বনির্ভরতা’র গল্প শোনানো হলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। এর ভেতরে ঘটছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণের ফাঁদ। দৃশ্যত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বেড়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে লোকসান ও ভর্তুকি, যা সাধারণ মানুষের জন্য কার্যত বোঝা। এই বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা একগুচ্ছ বিতর্কিত বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, যা সম্পাদিত হয়েছিল ওই সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০-এর ছত্রছায়ায়। এসব চুক্তি ও প্রকল্পের বেশিরভাগ ছিল সফলতার সম্ভাবনাহীন এবং বাস্তব-উপযোগিতা শূন্য। অর্থনৈতিক বাস্তবতা বা উপযোগিতা বিবেচনা না করে এগুলো করা হয়েছিল রাজনৈতিক স্বার্থে ও দুর্নীতির অভিপ্রায়ে। এই গুচ্ছ থেকে সবচেয়ে ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তিটি। যে চুক্তিকে একসময় ‘কৌশলগত সহযোগিতা’ বলা হয়েছিল এখন তা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে।

উল্লেখ্য, চুক্তিটি শুধু বর্তমান সরকার নয়, আগামী কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্র ও জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে এক বিশাল দায়, যার মূল্য দিতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকেই।

সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা জাতীয় কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। কমিটি বলছে, এই চুক্তি শুধু আর্থিকভাবে ক্ষতিকর নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করার বদলে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর লাভ নিশ্চিত করার কাঠামোগত উদাহরণ। কমিটির ভাষায়, এটি এমন একটি চুক্তি যেখানে ‘লাভ ব্যক্তিমালিকানার, আর ঝুঁকি পুরো সমাজের’। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আদানির সঙ্গে যখন বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয়, তখন বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ৪ দশমিক ৪৬ সেন্ট। অথচ চুক্তি হয় প্রতি ইউনিট ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে, যা প্রায় দ্বিগুণ বেশি। কেবল তাই নয়, চুক্তিতে এমন একটি সূচক যুক্ত করা হয়েছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদানি গ্রুপের আয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে আদানিকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি মূল্য বাংলাদেশের পরিশোধ করতে হচ্ছে। তথ্য বলছে, প্রতিবছর এই অতিরিক্ত মূল্য বাবদ বাংলাদেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশের বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে নজিরবিহীন। কমিটির অন্যতম সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন মনে করেন, বিদ্যমান তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদানির চুক্তি বাতিল করা এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি সুযোগ রয়েছে। তবে এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ ও কাঠামোর কারণে এই সিদ্ধান্ত কিছুটা জটিল। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নির্বাচনের আগেই এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করা জরুরি।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সুপারিশে এবং শেখ হাসিনার প্রবল আগ্রহে ২০১৭ সালে ঝাড়খণ্ডের গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য আদানির সঙ্গে চুক্তি হয় বাংলাদেশের। শুরু থেকেই চুক্তিটির শর্ত ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিতে হবেÑ এমন শর্তে করা চুক্তি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে কার্যত জিম্মি করেছে। নেই বিদ্যুৎ দর নির্ধারণে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের সুযোগ দেওয়া হয়নি, এমনকি চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোও দীর্ঘদিন গোপন রাখা হয়েছে। এই চুক্তির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলোÑ প্রয়োজন না থাকলেও বাংলাদেশ নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য। ফলে দেশের নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকছে, অথচ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আমদানি করা বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের এই দায় শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর।

আমরা মনে করি, আদানি চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতিগত ব্যর্থতার প্রতীক। যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস অনুসন্ধান ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার বিকল্প ছিল, তখন একক একটি কোম্পানির সঙ্গে এমন দীর্ঘমেয়াদি ও একতরফা চুক্তি কেন করা হলোÑ এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মতো কেউ এখন আর দায়িত্বশীল নেই। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, চুক্তি পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে নানা জটিলতাগুলোও।

আমরা আরও মনে করি, এই চুক্তি কেবল বর্তমানের ক্ষতি নয়Ñ এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঘাড়েও ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার ইনস্ট্রুমেন্ট। রাষ্ট্র যদি জনস্বার্থে নেওয়া সিদ্ধান্তে দায়বদ্ধ হয়, তবে এই চুক্তির ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা জরুরি। রাষ্ট্রের বিদ্যুৎ খাত কোনো করপোরেট স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্র হওয়া উচিত নয়। এই চুক্তি থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতেও এমন ধরনের চুক্তির দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপতেই থাকবে। সময় এসেছে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ারÑ না হলে বিদ্যুৎ খাতের এই রক্তক্ষরণ থামবে না, বরং ক্রমশ রাষ্ট্রকে নিঃস্ব করতেই থাকবে।

বিদ্যুৎ খাত জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। তাই আদানি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ অডিট, নীতি নির্ধারণ পর্যায়ে পর্যালোচনা এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনে কূটনৈতিক ও আইনি পথে শর্ত পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে এই চুক্তি আগামী প্রজন্মের জন্য স্থায়ী বোঝা হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি আরও দুর্বল হবেÑ আর তার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। তাই অবিলম্বে বিদ্যুৎ খাতের এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করুন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা