প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৯ এএম
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। তাই নির্বাচনের জন্য একটি শঙ্কামুক্ত ও উৎসবমুখর ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে সশস্ত্র বাহিনী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী অতীতে পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করলেও ফ্যাসিবাদী আমলে তার ব্যত্যয় ঘটে। এতে বাহিনীর সুনাম ও ঐতিহ্য কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে অনেকটাই ফিরে এসেছে। আর তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনী তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালনের ব্যাপারে আশাবাদী এবং তিনি ২৬ জানুয়ারি, সোমবার সেনা সদরের অডিটোরিয়ামে সশস্ত্র বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি সেই আশার কথাই তুলে ধরেন।
সভায় প্রধান উপদেষ্টা সশস্ত্র বাহিনীর
শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেন, মাঠপর্যায়ে সকল সিদ্ধান্ত হতে হবে আইনসম্মত,
সংযত ও দায়িত্বশীল। সামান্য বিচ্যুতিও যেন জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন না করেÑ সে বিষয়ে
সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস মনে করেন একটি অবাধ, সুষ্ঠু,
নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা
অগ্রগণ্য। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট
সামরিক কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
এ
কথা সত্য, জাতীয় নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ও সংবেদনশীল অধ্যায়। এই সময় রাষ্ট্রের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত দায়িত্বশীল,
সংযত ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হয়। সশস্ত্র বাহিনী তার ব্যতিক্রম নয়। বরং ইতিহাস,
শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার কারণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা নির্বাচনকালীন পরিবেশে
জন-আস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কারণ নির্বাচনী মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আচরণ,
ভাষা, উপস্থিতি এবং সিদ্ধান্ত—
সবকিছুই জনমনে বার্তা দেয়। কোনো ভোটকেন্দ্রে অপ্রয়োজনীয় শক্তি প্রদর্শন, তল্লাশির নামে
হয়রানি কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি নমনীয়তা জন-আস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। আবার
দায়িত্ব এড়িয়ে চলা বা নিষ্ক্রিয়তাও সহিংসতা ও অনিয়মকে উৎসাহিত করতে পারে। সুতরাং ভারসাম্যপূর্ণ,
আইনসম্মত ও মানবিক আচরণই হওয়া উচিত প্রধান নীতি।
উল্লেখ করা প্রয়োজন,
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার রক্ষক।
নির্বাচনকালে তাদের মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছেÑ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল
রাখা, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করা। কিন্তু এই
দায়িত্ব পালনের সময় যদি সামান্যও পক্ষপাতিত্বের ধারণা সৃষ্টি হয়, তবে তা শুধু নির্বাচনী
প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে নাÑ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থাকেও
দুর্বল করে। অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষা দেয়, নির্বাচনকালীন সময়ে অতিসক্রিয়তা কিংবা
নীরব পক্ষপাত— দুটোই সমানভাবে ক্ষতিকর। সশস্ত্র
বাহিনীকে মনে রাখতে হবে, তারা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের নয়; তারা জনগণের এবং সংবিধানের
আলোকে কর্তব্য পালনে বাধ্য। আমরা মনে করি, ব্যালটের নিরাপত্তা মানে কেবল ব্যালট বাক্স
পাহারা দেওয়া নয়Ñ ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর অংশ।
প্রধান উপদেষ্টার
এই নির্দেশনা খুবই অপরিহার্য। এখন নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে যৌথভাবে সশস্ত্র বাহিনীর
জন্য এমন নির্দেশ বার্তা তৈরি করতে হবে, যেখানে ক্ষমতার সীমা, করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো
পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কমান্ডারদের দায়িত্ব হবে অধীনস্থ সদস্যদের
আচরণ তদারক করা এবং কোনো অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নেওয়া। জনসাধারণকেও মনে
রাখতে হবে— সশস্ত্র বাহিনী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী
শক্তি নয়, বরং গণতন্ত্র রক্ষার অংশীদার। সশস্ত্র বাহিনীকেও মনে রাখতে বলব— জনগণের আস্থা তাদের সবচেয়ে
বড় শক্তি। এই আস্থা একবার ক্ষুণ্ন হলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন।
জাতীয় নির্বাচন
যেন বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ হয়— এটাই সবার প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পূরণে সশস্ত্র বাহিনীকে
তার পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সর্বোচ্চ প্রমাণ দিতে হবে। আমরা
মনে করি, গণতন্ত্রের এই পরীক্ষায় বিজয়ী হতে শতভাগ আন্তরিকতাই প্রধান শর্ত। আমরা চাই,
সশস্ত্র বাহিনী তার দায়িত্বশীলতার সর্বোচ্চ প্রমাণ দিক, গণতন্ত্রের প্রাথমিক সোপান
যে নির্বাচন, সেই নির্বাচন তারা নির্বিঘ্ন ও অর্থবহ করে দেশে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার
প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করুক। এই দায়িত্ব পালনে সশস্ত্র বাহিনীকে সফল হতেই হবে এরং এর কোনো
বিকল্প নেই।