বিশ্লেষণ
ড. আলা উদ্দিন
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৬ এএম
গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত থাকে জনগণের ম্যান্ডেটে কিন্তু সেই শক্তি টেকসই হয় কেবল দায়বদ্ধতার ভেতর দিয়ে। নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা যায় কিন্তু জনগণের আস্থা ধরে রাখা যায় দায়িত্বশীল আচরণ এবং প্রতিশ্রুতি পালনের মাধ্যমে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্ষমতায় আসার পর অনেক সরকারই জনগণের কাছে জবাবদিহিতা এড়িয়ে যায়, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা কমে যায় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে কেন্দ্রীভূত ও অপ্রকাশ্য। এমন পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র কাগজে-কলমে শক্তিশালী মনে হলেও বাস্তবে তা পরিণত হয় আশা আর আশঙ্কার মিশ্রণে, যেখানে মানুষ জানে না কোন দিকে যাচ্ছে রাষ্ট্র।
রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা মানে শুধু আইন মানা নয়,
জনগণের প্রতি সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। যে সরকার নির্বাচিত হয়ে
আসে, তার প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে থাকে জনগণের প্রত্যাশা এবং আস্থা। কিন্তু
ক্ষমতায় গেলে অনেক সময় দেখা যায় প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়া হয়, নীতি হয় দলীয়
স্বার্থের অধীন, আর সমালোচনা হয় রাষ্ট্রদ্রোহিতার সমান। সরকার যখন মনে করে তাদের
আর কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না, তখন শুরু হয় ক্ষমতার অপব্যবহার। দুর্নীতি
স্বাভাবিক হয়ে যায়, প্রশাসন হয়ে ওঠে পক্ষপাতদুষ্ট, আর বিচারব্যবস্থাও প্রভাবিত
হয় রাজনৈতিক চাপে। দায়বদ্ধতা না থাকলে গণতন্ত্র শুধু নামেই থাকে, কার্যত চলে এক
ধরনের নরম স্বৈরতন্ত্র।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়,
ক্ষমতার পালাবদল হলেও দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। সরকার পরিবর্তন হয় কিন্তু
রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন প্রায় একই রকম থেকে যায়। বিরোধী দলে থাকাকালীন যে দাবি
তোলা হয়, ক্ষমতায় গিয়ে সেসব ভুলে যাওয়া হয়। মন্ত্রী বা নেতাদের কাছ থেকে
সাংবাদিক বা জনগণ প্রশ্ন করলে তা সহ্য করা হয় না, বরং প্রশ্নকারীকে শত্রু ভাবা
হয়। সংসদে আলোচনা হয় না, বরং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় দলীয় বৈঠকে। স্থানীয় সরকার
প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাহীন রাখা হয়, যাতে জনগণ সরাসরি সেবা না পায় এবং কেন্দ্রীয়
নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। এভাবে গণতন্ত্রের কাঠামো থাকলেও তার আত্মা দুর্বল হয়ে
পড়ে।
দায়বদ্ধতাহীনতার একটি বড় প্রকাশ হলো
দুর্নীতি। সরকারি প্রকল্প, টেন্ডার, নিয়োগ, সেবা প্রদান, সবখানেই দুর্নীতির
অভিযোগ শোনা যায়। অথচ দুর্নীতি দমন কমিশন থাকলেও তার কার্যকারিতা সীমিত, কারণ
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। বড়
দুর্নীতির মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, ছোট দুর্নীতি হয়ে যায় নিত্যদিনের ঘটনা।
মানুষ যখন দেখে যে দুর্নীতি করেও কেউ শাস্তি পায় না, তখন নৈতিকতা হারিয়ে যায়।
দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না, সামাজিক আস্থাও ভেঙে দেয়। মানুষ মনে করে
সবাই দুর্নীতি করে, তাই নিজেও করা যায়। এভাবে সমাজে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়, যা
ভাঙা অত্যন্ত কঠিন।
আইনের শাসনের দুর্বলতাও দায়বদ্ধতার অভাবের
ফল। আইন সবার জন্য সমান হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ক্ষমতাবান ব্যক্তি
বা দলের সদস্যরা আইনের ঊর্ধ্বে চলে যায়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও তা এগোয় না,
আবার বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে মামলা হয় দ্রুত এবং কঠোর। বিচারব্যবস্থাও চাপে পড়ে,
কারণ বিচারকরা জানেন রাজনৈতিক সংবেদনশীল মামলায় সিদ্ধান্ত নিলে পরিণতি হতে পারে।
পুলিশ ও প্রশাসন যখন নিরপেক্ষভাবে কাজ না করে দলীয় নির্দেশ মানে, তখন সাধারণ
মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। আইনের শাসন না থাকলে গণতন্ত্র হয় ফাঁপা, কারণ
গণতন্ত্রের মূলভিত্তিই হলো আইনের সামনে সবার সমান অধিকার।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও দায়বদ্ধতার সঙ্গে
জড়িত। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম সরকারের কাজের সমালোচনা করে, তথ্য প্রকাশ করে, জনমত
তৈরি করে। কিন্তু যখন সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করা হয়, সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়,
অনলাইনে কণ্ঠরোধ করা হয়, তখন জনগণ জানতে পারে না সত্য ঘটনা। তথ্য গোপন করা হলে বা
বিকৃত করা হলে মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। গণতন্ত্রে তথ্যের অধিকার মৌলিক,
কারণ তথ্য ছাড়া জনগণ অন্ধ হয়ে যায়। যে সরকার সমালোচনা সহ্য করে না, তথ্য
লুকায়, মিথ্যা প্রচার করে, সে সরকার দায়বদ্ধ নয়। আর দায়বদ্ধ নয় বলেই তারা মিডিয়া
নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, যাতে তাদের ভুল ও অন্যায় জনগণের কাছে না পৌঁছে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও দায়বদ্ধতার ঘাটতি
প্রকট। দল চালানো হয় পরিবার বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক, নেতা নির্বাচন হয় না
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। দলের ভেতরেই যদি গণতন্ত্র না থাকে, তবে রাষ্ট্রে কীভাবে
থাকবে। নেতাদের প্রশ্ন করা যায় না, সমালোচনা করলে দল থেকে বহিষ্কার হতে হয়। ফলে
দলের ভেতরে চাটুকার ও তোষামোদকারীরা উঠে আসে, আর সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা পিছিয়ে
পড়ে। এই অগণতান্ত্রিক দলগুলো যখন রাষ্ট্র চালায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রও
হয়ে ওঠে কেন্দ্রীভূত ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দায়বদ্ধতা তৈরি করতে হলে আগে দলের ভেতরে
গণতন্ত্র চর্চা শুরু করতে হবে, যেখানে নেতা জবাবদিহি করবেন কর্মীদের কাছে, আর
কর্মীরা পাবেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।
নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় সরকারের দুর্বলতাও
দায়বদ্ধতা কমায়। স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি থাকলেও তাদের ক্ষমতা সীমিত,
বাজেট নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্র। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো যখন সরকারি চাপে বা
অর্থায়নের অভাবে দুর্বল থাকে, তখন তারা সমাজের কণ্ঠস্বর হতে পারে না। জনগণের
সংগঠিত হওয়ার অধিকার থাকলেও বাস্তবে প্রতিবাদ দমন করা হয়, জনসমাবেশে বাধা দেওয়া
হয়। ফলে সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং
নাগরিক সমাজকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া দায়বদ্ধ গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। কারণ
এসব প্রতিষ্ঠান সরকারকে নজরদারিতে রাখে এবং জনগণের চাহিদা তুলে ধরে।
দায়বদ্ধতা না থাকলে গণতন্ত্র হয় আশা আর
আশঙ্কার মিশ্রণ। আশা থাকে কারণ মানুষ ভাবে পরবর্তী নির্বাচনে হয়তো পরিবর্তন আসবে।
আশঙ্কা থাকে কারণ অভিজ্ঞতা বলে পরিবর্তন হলেও একই চক্র আবার শুরু হয়। এই
দোদুল্যমানতা মানুষকে হতাশ করে, রাজনীতিতে আগ্রহ কমায়, নির্বাচনে অংশগ্রহণ কমায়।
তরুণরা মনে করে রাজনীতি মানেই দুর্নীতি আর ক্ষমতার খেলা, তাই তারা দূরে থাকে।
এভাবে যোগ্য ও সৎ মানুষেরা রাজনীতি থেকে সরে যায়, আর রাজনীতি হয়ে যায় একটি
বিশেষ শ্রেণির একচেটিয়া। এই চক্র ভাঙতে না পারলে গণতন্ত্র টিকবে না, রাষ্ট্রও
দুর্বল হবে।
দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনতে প্রথমেই দরকার
সংস্কার। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশনÑ এসব প্রতিষ্ঠানকে
সত্যিকারের স্বাধীন করতে হবে। তথ্য অধিকার আইন কার্যকর করতে হবে, যাতে নাগরিকরা
জানতে পারে সরকার কী করছে। সংসদকে সক্রিয় করতে হবে, যেখানে বিরোধী দল এবং সরকারি দল
উভয়েই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং নীতি নিয়ে আলোচনা হবে। বিচার বিভাগকে
সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখতে হবে, প্রশাসনকে করতে হবে নিরপেক্ষ। স্থানীয় সরকারকে
ক্ষমতা ও বাজেট দিতে হবে, যাতে জনগণ স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্তে যুক্ত হতে পারে।
এসব সংস্কার ছাড়া শুধু নির্বাচন করে গণতন্ত্র টেকসই করা যাবে না।
রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের সংস্কার করতে
হবে। দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে, নেতা নির্বাচন করতে হবে সদস্যদের ভোটে।
দলীয় নীতি ঠিক করতে হবে আলোচনার মাধ্যমে, একজনের সিদ্ধান্তে নয়। দুর্নীতিবাজ ও
অপরাধীদের দল থেকে বের করে দিতে হবে, তরুণ ও নারীদের নেতৃত্বে সুযোগ দিতে হবে।
দলগুলো যখন নিজেরা দায়বদ্ধ হবে, তখনই সমাজে দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি তৈরি হবে।
একইভাবে জনগণকেও সচেতন হতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, ভোট দিতে হবে বুঝেশুনে, আর দাবি
তুলতে হবে নিজেদের অধিকার নিয়ে।
গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়, গণতন্ত্র মানে দায়বদ্ধ শাসন। শক্তিশালী গণতন্ত্র তখনই হয় যখন ক্ষমতাসীনরা জানে তাদের প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতেই হবে। নইলে নির্বাচন হবে, সরকার আসবে, কিন্তু মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসবে না। আশা থাকবে, কিন্তু আশঙ্কাও থেকে যাবে। যদি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরি করতে হয়, তবে দায়বদ্ধতাকে প্রাধান্য দিতেই হবে। ক্ষমতা নয়, দায়িত্ববোধই হোক রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি।
অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়