কৃষক কার্ড
মো. জাহিদ হোসেন
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:২৬ এএম
প্রাচীনকাল থেকেই দেশের কৃষি খাত টিকিয়ে রেখেছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা। সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট পরিবার রয়েছে ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৫২ হাজার ২৯৬টি। এর মধ্যে কৃষক পরিবার রয়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৭০ হাজার ৫৩৯টি। অন্যদিকে, দেশে কৃষিজমির পরিমাণ প্রতিনিয়তই কমছে, প্রায় ৫৬ শতাংশ কৃষিজমি উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার হচ্ছে না, ৪০ শতাংশ কৃষক পরিবার ভূমিহীন বর্গাচাষি, যথাযথ মজুরি পান না দেশের অর্ধেক কৃষক। একদিকে বাড়ছে কৃষি উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে ফসলের উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন না কৃষক। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যান্ত্রিকীকরণে এখনও অনেক পিছিয়ে কৃষক। অর্থনৈতিক সংস্কারবিষয়ক টাস্কফোর্স অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করে কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধির হার কমছে। বিপরীতে বাড়ছে খাদ্যশস্য আমদানি।
কৃষি খাতের অগ্রগতির জন্য ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)
ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে কৃষি খাতের পর্যালোচনা (রিভিউ) হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯০
সালেও একটি অর্থনীতি রিভিউ করা হয়। এ দুটি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে সে সময়ের বিবেচনায়
কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ফসল বৈচিত্র্যকরণের সুপারিশ করা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার এসব সুপারিশসহ
কৃষিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেয়। সেচ সম্প্রসারণ, উন্নত বীজ ও
সার ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করে কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর
করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিএনপির এ মেয়াদে কৃষিতে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা ছিল বড় একটি
রূপান্তর। সেচব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার পাশাপাশি সারের আমদানি ও বিতরণে
বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়। এতে সার সংকট ও এ নিয়ে অনিয়ম অনেকটা নিয়ন্ত্রণে
আসে।
এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি তারেক রহমানের প্রস্তাবনা ‘কৃষক
কার্ড’। বলা হয়েছে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুই ফসল উৎপাদনকারী
কৃষকের জন্য বিশেষ সুবিধা: যেসব কৃষক বছরে দুটি ফসল (যেমন : রবি ও খরিফ) উৎপাদন করেন,
তাদের একটি ফসলের জন্য পূর্ণাঙ্গ সহায়তা (যেমন : সম্পূর্ণ সার ও বীজ) দেওয়া হতে পারে,
যা তাদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং আয় বাড়াতে সাহায্য করবে। অর্থাৎ কমপক্ষে একটি ফসল উৎপাদন
খরচ রাষ্ট্রীয়ভাবে দেওয়া হবে। ফলে কৃষক কার্ড যদি কৃষককে আর্থিক সুবিধা দেয় তাহলে এর
যথাযথ ব্যবহারে কৃষকরাই সঠিকভাবে উপকৃত হবেন।
আরও আগ বাড়িয়ে হয়তো এটাও বলা যায়, এই কার্ড একজন কৃষকের সমস্ত তথ্য
অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে কৃষক কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর আশ্রয় না নিয়েই
কৃষিঋণসহ অন্যান্য সুবিধা স্বচ্ছভাবে উপভোগ করতে পারবেন। ফলে কৃষকদের আর্থিক সক্ষমতা
বৃদ্ধি করবে, কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং কৃষি খাতকে আধুনিক ও টেকসই করতে সহায়তা করবে।
পরের প্রশ্ন হলো, বেনিফিসিয়ারি তথা ফলভোগীদের নির্বাচন কীভাবে করা
হবে? তারেক রহমানের পরিকল্পনা বলছে, যিনি নিয়মিত কৃষিকাজ করেন (কৃষক), যার নিজস্ব বা
পত্তনি (ইজারা) সূত্রে কৃষিজমি আছে, যার নামে কৃষিজমির রেকর্ড (যেমন-খতিয়ান/পর্চা)
আছে এবং যিনি কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক) কিনতে চান। শুধুমাত্র তারাই আবেদন করতে
যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
অনলাইন পোর্টাল/অ্যাপ অথবা কৃষি বিভাগের পোর্টালে গিয়ে নিবন্ধন করা
যাবে। নির্দিষ্ট নম্বরে এসএমএস পাঠিয়েও নিবন্ধন করা সম্ভব। এ ছাড়া নিকটস্থ কৃষি কর্মকর্তার
সহায়তায় নিবন্ধন করা যাবে।
কৃষক কার্ডের সম্ভাব্য সুবিধাগুলো বিভিন্ন কৃষিপণ্যে কৃষকরা মধ্যস্বত্বভোগী
ছাড়াই সরাসরি ভর্তুকি প্রদান, সহজ শর্তে কৃষিঋণ সুবিধা, ফসলের বীমা তথা প্রাকৃতিক দুর্যোগে
ফসলের ক্ষতিপূরণ ও সরকারি ক্রয় সুবিধা পাবেন। বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সার (কৃষকদের
চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ), উন্নত মানের বীজ সরবরাহ, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারে
সহায়তা, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ
ও বিক্রির সহায়তা। এতে শোষণের অবসান ঘটবে এবং কৃষক জাতীয় অর্থনীতির সমান অংশীদার হবেন।
বিশ্বায়নের এ যুগে আমরা অন্যান্য দেশের সঙ্গে সংযুক্ত এবং তাদের সঙ্গে
আমাদের কৃষির তুলনা করা স্বাভাবিক। বিশ্বজুড়ে কৃষক কার্ডের প্রচলন মূলত ডিজিটাল প্রযুক্তি
ব্যবহার করে কৃষকের তথ্য নির্ভুলভাবে প্রদান করে এবং সরকারি সহায়তা সরাসরি কৃষকের কাছে
পৌঁছে দিতে একটি কার্যকর ব্যবস্থা।
ভারতের ‘ফার্মার আইডি কার্ড’ (কৃষক পরিচিতি পত্র) হলো ভারত সরকারের
কৃষি-স্ট্যাক উদ্যোগের অধীনে কৃষকদের জন্য তৈরি একটি ডিজিটাল পরিচয়, যা তাদের আধার
কার্ডের মতো কাজ করে, যেখানে কৃষকের সমস্ত তথ্য, জমির রেকর্ড এবং সরকারি প্রকল্পের
সুবিধা একটি একক ডিজিটাল সিস্টেমে লিঙ্ক করা থাকে। এটি একটি ডিজিটালপত্র, যা রাজ্য
সরকারগুলো দ্বারা তৈরি ও পরিচালিত হয় এবং এর মাধ্যমে কৃষকরা বিভিন্ন ডিজিটাল পরিষেবা,
যেমন- স্কলারশিপ, বীমা, ঋণ এবং কৃষি সম্পর্কিত তথ্য সহজে পেতে পারেন। এভাবে ডিজিটাল
কৃষক পরিচয়পত্র চালুর মাধ্যমে ভারত এক নতুন কৃষি বিপ্লবের পথে হাঁটছে। ভারত সরকারের
লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যেই দেশের ১১ কোটি কৃষককে এই ডিজিটাল আইডির আওতায় আনা এবং আধুনিক
কৃষিব্যবস্থার সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।
এ ছাড়া পাকিস্তানে, বিশেষ করে পাঞ্জাব প্রদেশে, ‘কিষান কার্ড’ নামে
একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র চালু আছে, যা কৃষকদের বিভিন্ন সরকারি সহায়তা যেমনÑ ভর্তুকি,
ঋণ (সুদমুক্ত ঋণসহ) এবং অন্যান্য পরিষেবা সহজে পেতে সাহায্য করে; এটি পাঞ্জাব ইনফরমেশন
টেকনোলজি বোর্ড (পিআইটিবি) এবং অন্যান্য সংস্থার সহায়তা তৈরি একটি ডেটাবেস ব্যবহার
করে কৃষকের তথ্য যাচাই করে এবং মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি সুবিধা পৌঁছে দেয়।
অনুরূপভাবে, নেপালে ‘কিষান আইডি’ বা কৃষক আইডি কার্ড হলো একটি ডিজিটাল
পরিচয়পত্র ও আর্থিক পরিষেবা, যা মূলত ছোট কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, সরকারি
ও বেসরকারি আর্থিক পরিষেবা (যেমন- বীজ, সার, কৃষি সরঞ্জাম কেনা), ডিজিটাল লেনদেন এবং
আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি সাধনের জন্য চালু করা হয়েছে; এটি নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংক
(এনআরবি) এবং কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক লিমিটেড (এডিবিএল)সহ বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থার সহযোগিতায়
পরিচালিত হয়, যা কৃষকদের ঋণ ও আর্থিক সহায়তা পেতে সাহায্য করে।
একইভাবে, ইন্দোনেশিয়ার ফার্মার্স কার্ড (কার্তু টানি) হলো কৃষকদের
জন্য সরকারি ভর্তুকিযুক্ত সার এবং অন্যান্য কৃষি সহায়তা বিতরণের একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা,
যা সার বিতরণকে লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ করে তোলে এবং কৃষকদের ডেটাবেস তৈরি করে, যা
তাদের জন্য কৃষিঋণ ও শিক্ষামূলক সেবা পেতেও সহায়ক।
বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারেক রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামো
মেরামতের উদ্দেশ্যে ৩১ দফা ঘোষণায় তার উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষক ও কৃষিকে বিশেষ গুরুত্ব
দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তিনি অনুধাবন করেছেন, কৃষক ও কৃষিকে অবহেলা করে বাংলাদেশকে
উন্নত করা সম্ভব নয়। তাই কৃষি খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তিনি ‘কৃষক কার্ড’ চালুর কথা
বলেছেন।
এটা নিছক নির্বাচনী চমক হলে এর ভালোমন্দ আর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এত বিস্তারিত বলার প্রয়োজন তার হতো না। আমরাও অপেক্ষায় রইলাম দেশের প্রান্তিক কৃষকগণের কল্যাণে কৃষক কার্ডের মতো একটা যুগান্তকারী প্রকল্প যেন সফল হয়, এর সুবিধা যেন সেই সুবিধাবঞ্চিত কৃষকদের কাছে পৌঁছে। তারেক রহমান আপনার সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, এটা প্রমাণ করা যে কৃষক কার্ড যেন নিছক কথার কথা না হয়। আমরাও আপনার মতো আশাবাদী হতে চাই। দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
মো. জাহিদ হোসেন
কলাম লেখক ও ব্যাংকার