পর্যবেক্ষণ
শেলী সেনগুপ্তা
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০১ এএম
নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অপরিহার্য এবং এই স্বাবলম্বিতা যে ক্রমাগত বাড়ছে এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উপযুক্ত শিক্ষা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা দ্বারা আজ নারীরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এভাবে এগিয়ে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার কারণে নারীর ক্ষমতায়নও হয়েছে।
আজকাল নারীরা
আর কেউ আর ঘরে বসে থাকতে চায় না, নিজের প্রচেষ্টা দ্বারা
স্বাবলম্বী হতে চায়। এখন নারীরা চেষ্টা
করছে নিজের পায়ে দাঁড়াতে এবং পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করতে। একই সঙ্গে বলতে পারি,
দিনে দিনে অর্থনীতিতে নারীর অবদান বৃদ্ধি
পাচ্ছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও বেড়েছে নারীর স্বাধীনতা। নিজের জীবনের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ
সিদ্ধান্তই এখন তিনি নিজে নিচ্ছে না নিতে পারছে।
তাছাড়া নারীরা
পারিবারিক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা রাখছে। এটা সত্য যে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বিতা অর্জনের ফলেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে
নারীর স্বাধীনতা এসেছে। একদিন যে মেয়েটি ছিল বাবা-মার বোঝা, অনেক
ক্ষেত্রে সেই মেয়েই আজ পরিবারের আয়ের উৎস।
আমরা জানি
পৃথিবীতে প্রথম কৃষিকাজ শুরু করেছিলো নারী। একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে যখন
পোশাকশিল্প গড়ে উঠলো তখন নারীই সাহসিকতার সঙ্গে কাজে যোগ দিয়েছিলো এবং আমাদের
দেশকে বিশ্বের দরবারে উপস্থিত করেছিলো। এই উপস্থিতি ছিলো সাবলীল ও গৌরবোজ্জ্বল।
এই সব
বস্ত্রবালিকা বহির্বিশ্বে যখন দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে তেমনি নিজেদের পরিবারকে
এগিয়ে নিয়ে গেছে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথে। কারণ হলো বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে
নারীরাই প্রধান চালিকা শক্তি। তবে একথাও ঠিক যে যারা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক
ক্ষমতায়ন ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করছে তারা নিজেরাই কাজ করছে কম মজুরিতে। অথচ
কর্মস্থলে তাদের কর্মঘন্টা অনেক বেশি। আমাদের দেশে প্রায় ৮০ শতাংশ নারী পোশাক শিল্পে
নিয়োজিত।
পোশাক শিল্পে
নারীর অবদান অসীম। কারণ নারীর মধ্যে আছে দ্রুত শেখার ক্ষমতা, আছে সুক্ষ্ম কাজে
মনোযোগ ও ধৈর্য্যশীলতা। এই তিনটি কারণে নারী পোশাক শিল্পকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে
গেছে। আমরা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করার সাহস ও উপযুক্ততা
অর্জন করেছি এই সব সাহসী নারী শ্রমিকদের জন্য।
আমাদের দেশে
শতকরা ৮০ ভাগ নারী পারিবারিক সচ্ছলতা নিয়ে আসার জন্য পোশাক শিল্পে যোগদান করে।
কিন্তু এই সব নারী শ্রমিকের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হয় না। আমাদের দেশে এমনিতেই পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিকের
মজুরি কম, এটি পোশাক শিল্পেও বিরাজ করছে। অথচ নিজ নিজ কাজে পুরুষের চেয়ে নারীরাই
বেশি মনোযোগী।
আমাদের দেশে
নারীদের পোশাক শিল্পে যোগদান পরিবারের অর্থনৈতিক মুক্তি নিয়ে আসে, একই সঙ্গে যুক্ত
হয় সুদুর প্রসারী সামাজিক প্রভাব। নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা শহর অঞ্চল কিংবা
গ্রামাঞ্চল থেকে এসে কাজে যোগ দেয়। তাদের অর্জিত অর্থে পরিবারের সদস্যদের খাদ্য,
শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ নির্বাহ করা হয়। কখনো কখনো একটি পরিবার সম্পূর্ণরুপে
নির্ভরশীল হয়ে ওঠে এই নারী শ্রমিকটির উপার্জনের পর। এর ফলে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ
সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ভূমিকা থাকে।
এই সব নারী
শ্রমিক বাইরের জগতে চলাচলের ফলে ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে, মতামত দিতে
পারে এমন কি সিদ্ধান্তও গ্রহণ করতে পারে। সিদ্ধান্ত নিতে পারে বাল্যবিয়ে
প্রতিরোধে। শিক্ষার আলো ছড়াতে পারে, পারে পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের জন্য আধুনিক চিকিৎসার দ্বারস্থ
হতে। নিজস্ব উপার্জনের কারণে আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি থাকে যা সমাজে তার অবস্থানকে
অনেক দৃঢ় করে তোলে।
এতো কিছুর
পরও বলতে পারি, নারী শ্রমিকদের পথ চলা খুব একটা মসৃণ নয়। পোশাক শ্রমিকদের
প্রতিনিয়ত নানা ধরণের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চলতে হয়। এই সব নারী শ্রমিকদের মজুরি খুবই কম, থাকে অতিরিক্ত
কাজের চাপ এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশ। এতো
কিছুর পর যুক্ত হয় মাতৃত্বকালীন ছুটি না
পাওয়ার কষ্ট। যা মেনে নেয়া সত্যি খুব কঠিন।
বস্ত্রবালিকারা
পরিবারের বাইরে এসে দীর্ঘসময় নিজের শ্রম দেয়, তারপরও তারা কর্মস্থলে চরম
দুর্ব্যবহারের শিকার হয়। তাদের অবদানের অবমূল্যায়ন করা হয় বিভিন্নভাবে। কখনো কখনো
যৌন হয়রানির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটে থাকে। তাছাড়া এই শিল্পকে কেন্দ্র করে কোনো সামাজিক বা
রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় এই নারী শ্রমিক। একই ভাবে
ক্ষতিগ্রস্থ হয় অনিরাপদ ভবন ধসে পড়া কিংবা অগ্নিকান্ডের কারণেও।
অধিকাংশ নারী
শ্রমিক বসবাস করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, পায় না সঠিক স্বাস্থ্যসেবা। সন্তান বাসায়
রেখে কাজে যাওয়ার সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় পোশাক শিল্পীদের। ফলে কাজে মনোনিবেশ করা
কঠিন হয়।
পোশাক শিল্পে
নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের অবদানকে গুরুত্ব দেয়ার সময় অনেক আগেই হয়েছিলো, দেয়া হয় নি।
তবে এটাও বলা যায় সময় এখনো শেষ হয় নি। যে কোনো ভালো কাজ চাইলেই শুরু করা যায়। নারী
শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন সময়ে প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। অন্তঃস্বত্তা শ্রমিককে
কর্মচ্যুত না করে সহজ কাজে নিয়োজিত করা উচিত। মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করার দাবি
অনেকদিন থেকে, তা বাস্তবায়িত করা উচিত।
সন্তান
প্রসবের পর সন্তানের জন্য ডে কেয়ার ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে
নিশ্চিত করতে হবে নারী শ্রমিকের সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ।
কখনো কখনো
নির্বিচারে অভার টাইম করানো হয়। বিষয়টি নিয়ে সচেতন হতে হবে। নারী শ্রমিকের জন্য
ওভার টাইম হবে শ্রম আইন অনুযায়ী। ওভার টাইম মজুরি নিয়ম সিদ্ধভাবে পরিশোধ করতে হবে।
জীবনের সকল
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যারা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে তাদের মজুরির
বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের ব্যপারেও। এই সব
নারীদের শ্রম ও অধিকারকে সম্মান জানিয়ে যথাযথ সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। তাহলে আমাদের
দেশ বিশ্বের দরবারে আরো উচ্চাসনে আসীন হতে পারবে।
আমাদের
বস্ত্রবালিকারা অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও সামাজিক মর্যাদা পেয়ে নিজের কথা বলতে ও
সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। তারপরও এই সব বস্ত্রবালিকাদে ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যে থাকে।
এটা হয় বাসস্থান থেকে কর্মস্থলে আসা এবং যাওয়া সময় নিরাপত্তার অভাব। কখনো কখনো কর্মস্থলেও নিরাপত্তার হতে পারে। এ বিষয়ে সবাইকে
সচেতন হতে হবে। সকল দিক খেয়াল রেখে নিরাপত্তা দিতে হবে এই সব বস্ত্রবালিকাদের। দূর
করতে হবে নারী ও পুরুষের মজুরি বৈষম্য। পোশাক শিল্পে গৌরবের সঙ্গে নিজের জায়গা করে
নিয়েছে, এখন আমাদের সচেষ্ট হতে হবে সে জায়গাটা সুরক্ষিত করার।
নারীরা এখন দলবেঁধে রাস্তায় হেঁটে কর্মস্থলে যায়। নিঃসন্দেহে এটা নারী সমাজের জন্য একটি বিশাল অর্জন। এটিই সকল পোশাক শিল্পীদের সমাজে অবস্থানের ইতিবাচক দিক। এই বিষয়টা মনে রাখতে। আমরা জানি পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকরা কেবল পোশাক প্রস্তুত করে না, তারা নিয়ে এসেছে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, সামাজিক মর্যাদা এবং পারিবারিক সচ্ছলতা। বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে নীরব বিপ্লব, যার মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে আলোকিত স্থান করে নিয়েছে আমাদের দেশ। তাই আমরা বলতে পারি যাদের মাধ্যমে এই দেশটি টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে, তাদের প্রতিও তেমন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে হবে।
শেলী সেনগুপ্তা
কলাম লেখক