নির্বাচনী সহিংসতা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫২ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। গণমাধ্যমের পরিসংখ্যান বলছে, গণতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভোটকেন্দ্রিক উৎসবের বদলে দেশের অন্তত ২৪টি জেলায় খুনোখুনি ও সহিংসতার শঙ্কা গভীর হচ্ছে, যা রাষ্ট্র, সমাজ ও গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। তার মানে নির্বাচন মানেই যেন রক্তপাত, প্রাণহানি ও আতঙ্ক এই ভয়াবহ বাস্তবতা থেকে এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি বাংলাদেশ।
উল্লেখ্য, ২২ জানুয়ারি প্রচার-প্রচারণা শুরু হওয়ার পর
থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও সংঘর্ষের খবর আসছে গণমাধ্যমে। এরই মধ্যে
কেরানীগঞ্জে এক বিএনপি নেতা খুন হয়েছেন। মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ
ও সংখ্যালঘুদের ভোট। প্রধান প্রধান দলগুলো এই ভোট পেতে মরিয়া। এ কারণে স্থানীয়
পর্যায়ে ওই দলগুলোর বিরোধ এখন চরমে। এ ছাড়াও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে
জামিনে মুক্ত জঙ্গি-সন্ত্রাসীরাও এখন নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
২৬ জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘খুনোখুনির শঙ্কা : নির্বাচন ঘিরে
২৪ জেলায় অস্ত্রের ঝনঝনানি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও
সম্প্রতি কিছু ঘটনা নতুন করে দেশকে অস্থিরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয় সামনে
এনে বিদেশি দূতাবাস ও তাদের শিক্ষার্থীসহ নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার তৎপরতাও
দেখা গেছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে দেশে কঠোর নিরাপত্তা
সাজানোর বিষয়টি কাগজে-কলমে দেখা গেলেও বাস্তবে এর গরমিল দেখছেন তারা। যদিও
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত। অপরাধ
বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা
বাহিনীর ওপর আক্রমণের ঘটনাগুলো পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। একটি দেশে যখন
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরে আক্রমণ হয়, এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে যখন সময় লেগে যায় তখন
বিষয়টি সবাইকে ভীত করে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত নির্বাচন
অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ করতে সেনাবাহিনীসহ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য,
ড্রোন, ডগ স্কোয়াড, বডি ক্যামেরা ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির নজিরবিহীন
নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। এর মধ্যে পুলিশের প্রায় দেড় লাখ সদস্য
এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯৫৮ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এ
ছাড়া বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় এক লাখ, র্যাবের প্রায় ৮
হাজার, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫০০ এবং ফায়ার সার্ভিসের ১৩
হাজার সদস্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। এতসব আয়োজনের প্রস্তুতি থাকার পরও
শঙ্কা কমছে না, বরং বাড়ছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেছেন, মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ
বাড়ানোর ব্যাপারে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। সামনে নজরদারি ও প্রশাসনের কার্যক্রম আরও
বেশি দৃশ্যমান হবে।
সরকারের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা যাই হোক, বাস্তবতা হচ্ছেÑ রাজনৈতিক
মাঠ উত্তপ্ত। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রতিপক্ষ দমন, আধিপত্য বিস্তার এবং প্রভাব বিস্তারের
প্রতিযোগিতা নির্বাচনের সময় সহিংসতাকে উস্কে দিচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ভোটের আগে
ও পরে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিহিংসামূলক হামলা, দলীয় সংঘর্ষ, প্রার্থী ও সমর্থকদের ওপর
হামলা এবং সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা বারবার ঘটেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার
কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, বেশ কয়েকটি জেলায় রাজনৈতিক উত্তেজনা
চরমে। কোথাও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দলীয় কোন্দল, কোথাও বিরোধী মত দমনে সহিংস
প্রস্তুতি, আবার কোথাও স্থানীয় অপরাধী চক্র রাজনীতির ছত্রছায়ায় সক্রিয়। এসব পরিস্থিতি
মিলিয়ে খুনোখুনির আশঙ্কা আর গুজব নয়, বাস্তবই।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সহিংসতার শিকার হয় সাধারণ মানুষ। ভোট দিতে
গিয়ে প্রাণ হারানো, নির্বাচনী মিছিলে পড়ে নিহত হওয়া কিংবা রাতের অন্ধকারে প্রতিহিংসার
বলি হওয়াÑ এসব দৃশ্য আমাদের অচেনা নয়। তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, নির্বাচন যদি মানুষের
জীবনের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেই নির্বাচন কতটা অর্থবহ?
আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বই এখানে মুখ্য। শুধু তফসিল
ঘোষণা ও ভোটগ্রহণ নয়Ñ নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
এই মুহূর্তে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত এলাকাগুলোয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আগাম নজরদারি
ও কঠোর নির্দেশনা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে বলব। ক্ষমতার লড়াইয়ে
‘রক্ত’ ঝরুক তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সহিংসতা দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া বা টিকে থাকার
মানসিকতা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের লাগাম
টানতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
আমরা বিশ্বাস করি, নির্বাচন মানে প্রতিযোগিতা, কিন্তু তা হতে হবে
শান্তিপূর্ণ। খুনোখুনির আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। নইলে
আরেকটি নির্বাচন ইতিহাসে যুক্ত হবে রক্তাক্ত অধ্যায় হিসেবে, যার দায় এড়াতে পারবে না
কেউই। যে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ৫ আগস্টের সংগ্রাম-আত্মত্যাগ তা যেন কোনোভাবেই
পথচ্যুত না হয়। আমরা চাই নিঃশঙ্ক, নিরাপদ পরিবেশ।