অর্থ পাচার
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৫ এএম
অর্থ পাচারের ঘটনা নতুন নয়। অতীতে পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস ও অফশোর লিকসসহ বিভিন্ন নথিতে বহু বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের তথ্য এসেছে। সেসব নথিতে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত দেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সরকারি কর্মকর্তার নামও প্রকাশ পায়Ñ যাদের অনেকেরই সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, কানাডা, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, দুবাই এবং আয়ারল্যান্ডে। কিন্তু অভিযোগ ওঠা পর্যন্তই। এর শেষ দেখা হয়নি। বিদেশে অর্থ পাচারের দায়ে যারা অভিযুক্ত হয়েছেন, অথবা যাদের নাম এসেছে তাদের কারও বিরুদ্ধেই দৃষ্টান্তযোগ্য শাস্তি তো দূরের কথা, কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই গ্রহণ করার নজির নেই। ফলে অর্থ পাচারের অভিযোগ কমেনি। বরং নতুন নতুন পন্থায় দেশ থেকে পাচার হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
এবারে ২২ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে জেন ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস নেটওয়ার্ক বিকাশের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক হুন্ডি ও অর্থ পাচারের একটি সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে ওঠার প্রমাণ পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জেন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের একটি ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন সংঘটিত হয়েছেÑ যার বড় অংশ রাতের নির্দিষ্ট সময়ে অস্বাভাবিক গতিতে সম্পন্ন হয়েছে। এই যে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে গেল, এর দায় কোনো পক্ষেরই এড়ানোর সুযোগ নেই।
বিএফআইইউ বলছে, বিকাশের মতো বৃহৎ মোবাইল আর্থিক সেবা নেটওয়ার্কে এ ধরনের ডিস্ট্রিবিউটর ও এজেন্ট পর্যায়ের লেনদেন শুধু অর্থ পাচারের ঝুঁকিই নয়, বরং সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের হুমকি তৈরি করে। আমরাও মনে করি পুরো বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত অবিলম্বে এদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া। এ ধরনের অবৈধ লেনদেন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যারা এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যব্স্থা নেওয়া।
দেশ থেকে নানাভাবে অর্থ পাচার হয়। বর্তমানে অর্থ পাচারে বড় ভূমিকা রাখছে মোবাইল ব্যাংকিং। বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে এই চ্যানেলে। ফলে ডলার সংকট তীব্র হয়েছে এবং কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। আমরা জানি, দেশে থাকা অর্থ নানা কর্মকাণ্ডকে গতি দেয়। কিন্তু সেটি যদি সরিয়ে ফেলা হয় তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা তৈরি হয়। অর্থের সঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেরও যোগ রয়েছে। বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থের পরিমাণ বাড়লে সামাজিক অস্থিরতার পাশাপাশি দেশ অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এর নিয়ন্ত্রণ। অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরির আশঙ্কা যেমন রয়ে যাবে তেমনি মূল্যস্ফীতি এড়ানোও কঠিন হয়ে উঠবে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যই অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। সেই সঙ্গে অর্থ পাচার রোধে আমরা মোবাইল ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেও বলি। এ ধরনের অপকর্ম ঠেকাতে অপরাধ ও অপরাধীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই ভবিষ্যতে অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনা যেতে পারে।
বিগত সময়ে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন অর্থ পাচার ও ঋণ জালিয়াতির ঘটনা কারও অজানা নয়। স্বাভাবিকভাবেই এসব ঘটনা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। তাই এ ধরনের অপকর্মের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা এখন জরুরি।