× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আমদানি শুল্ক

মোবাইল ভোক্তার স্বস্তি নাকি দেশীয় শিল্পের পরীক্ষা

সাইফুল ইসলাম শান্ত

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৩০ এএম

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৯ পিএম

মোবাইল ভোক্তার স্বস্তি নাকি দেশীয় শিল্পের পরীক্ষা

মোবাইল ফোন এখন শুধু বিলাসপণ্য নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। শিক্ষা, ব্যবসা, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল সেবার প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে এই ছোট যন্ত্রটি। এমন বাস্তবতায় সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মোবাইল ফোনের আমদানি শুল্ক ব্যাপকভাবে কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমদানি শুল্ক কমালে কি ভোক্তারা স্বস্তি পাবে, নাকি তা দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে? 

সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত মোবাইল ফোনের ওপর আগে কাস্টমস ডিউটি ছিল ২৫ শতাংশ এবং মোট শুল্ক ও ট্যাক্স মিলিয়ে প্রায় ৬১.৮০ শতাংশ। সম্প্রতি আমদানিকৃত মোবাইল ফোনে কাস্টমস ডিউটি কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে এবং সমস্ত ট্যাক্স ও শুল্ক মিলিয়ে মোট ৪৩.৪৩ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে দেশীয় সংযোজন কারখানায় প্রয়োজনীয় উপকরণের শুল্কও ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের মূল উদ্দেশ্যÑ মোবাইল ফোনকে সাধারণ মানুষের জন্য আরও সাশ্রয়ী করা এবং দেশীয় সংযোজন শিল্পকে সফল ও অবৈধ আমদানি থেকে সুরক্ষিত রাখা। 

এ অবস্থায় প্রশ্ন আসে এমন বড় ধরনের শুল্ক ছাড় কি সত্যিই দেশে ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলকে শক্তিশালী করবে, নাকি এটি স্থানীয় উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পের জন্য বিরূপ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করবে? প্রথমত, বর্তমান শুল্ক কাঠামো কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ভোক্তাপর্যায়ে মূল্য কমাতে সহায়ক হবে। যখন মোবাইল আমদানি ও সংযোজনের ওপর আর অতিরিক্ত করের বোঝা থাকবে না তখন দামের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। বিশেষত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের জন্য এটি সহায়ক হবে। ফলে অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স, ডিজিটাল শিক্ষা ও সরকারের ডিজিটাল সেবায় অংশগ্রহণ আরও বাড়বে। দ্বিতীয়ত দেশীয় সংযুক্তি খাত কি এতটা প্রস্তুত, যাতে এই বড় ধরনের শুল্ক হ্রাসের পরও তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে? বাংলাদেশে বর্তমান ১৪-১৫টি মোবাইল সংযোজনকারী কারখানা রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ডিভাইস অ্যাসেম্বল করা হয়। এ ছাড়া দেশের মোবাইল সংযোগ শিল্প গত কয়েক বছরে অনেক এগিয়েছে। স্মার্টফোন সংযোজনের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে উৎপাদন প্রায় ২.৮৩ মিলিয়ন ইউনিট পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা স্থানীয় শিল্পের গতি ও সক্ষমতা সম্পর্কে ভালো ইঙ্গিত দেয়।

তবে এখানে উল্লেখযোগ্য বাস্তবতা হলো বহুল ব্যবহৃত স্মার্টফোন বাজারে এখনও অবৈধ (গ্রে মার্কেট) ডিভাইসগুলো প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে, যা দেশের সরকারি রাজস্ব ও বৈধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানÑ দুইয়েরই ক্ষতি করছে। সম্প্রতি এনবিআর ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালু করে এই ধরনের অবৈধ ফোন শনাক্তকরণ ও নিষিদ্ধ করার জন্য। ২০১৭ সালে প্রথম দেশীয় মোবাইল সংযোজন উৎপাদন শুরু করে আজ ১৪-১৫টি ফ্যাক্টরি দেশে কাজ করছে এবং তারা বিল্ড টু অর্ডার ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ডিভাইস অ্যাসেম্বল করছে। এ অবস্থায় শুল্ক হ্রাস স্থানীয় সংযুক্তি শিল্পে কি ধাক্কা দিয়েছে? প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করেন, সঠিক সুবিধা ও সমন্বয় ছাড়া একটি বড় মাত্রায় শুল্ক হ্রাস স্থানীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতায় দুর্বল করে দিতে পারেÑ বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো তাদের উৎপাদিত ডিভাইস আমদানি করে কম দামে বাজারে বিক্রি করতে শুরু করবে। ফলে দেশে উৎপাদিত ডিভাইসগুলোর বাজার হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। তবে সরকারের যুক্তি হলোÑ শুল্ক কমানোর পাশাপাশি সংযুক্তির জন্য উপকরণ আমদানিতেও শুল্ক কমানো হয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে দেবে। এই পরিবর্তনের অর্থ শুধু দাম কমানো নয়, এটি একটি বাজারগত পুনঃসংগঠনের সুযোগ হিসেবেও দেখা উচিতÑ যেখানে সরকার ডিজিটাল সেবার প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় প্রযুক্তি শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির জন্য সময় দিচ্ছে।

এখন প্রশ্ন আসে এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগের অবস্থা কী হবে? একদিকে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আকর্ষণের পয়েন্ট হতে পারে। কারণ এটি দেখায় যে বাংলাদেশ ডিজিটাল বাজারে উচ্চ প্রবেশযোগ্যতা ও ক্রমাগত পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। মোবাইল ব্যবহারের বিস্তার, ইন্টারনেট সেবার বৃদ্ধি, ডিজিটাল পেমেন্টের জনপ্রিয়তা সবকিছুই বিদেশি কোম্পানির জন্য বিস্তৃত বাজার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। 

অন্যদিকে স্থানীয় সংযোজন শিল্পও যদি শক্তিশালী নীতিগত সাপোর্ট ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তবে এই খাতেও বিনিয়োগ আরও বাড়বে। তবে উদ্ভাবনী শিল্প নীতি না থাকলে, বিদেশি ব্রান্ডগুলো আমদানি করা ডিভাইস বাজারে ঢুকিয়ে স্থানীয় উৎপাদনকে পিছিয়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রে শুল্ক নীতি হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়ন ও দক্ষ শ্রমবাজার গড়ে তোলা সরকারের প্রণোদনা প্রোগ্রামের অংশ হওয়া জরুরি। এ ছাড়া দেশকে সাইবার নিরাপত্তা, ইন্টারনেট অব দ্য থিংস, ফিনটেক কাঠামো ও ডেটা প্রাইভেসিসহ অনেক ক্ষেত্রেই প্রস্তুত করতে হবে। 

শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো অবৈধ কিংবা রিফার্বিশড ফোনের প্রবেশ রোধ করা। এই ধরনের ডিভাইসগুলোর দাম কম হয় কিন্তু বৈধ ব্যবসা, গ্রাহক সেবা, পরে বিক্রয় বা ওয়ারেন্টি সুবিধা এসব ক্ষেত্রে খারাপ প্রভাব পড়ে। এনইআইআরের মাধ্যমে এই জালিয়াতি ও অবৈধ প্রবাহ কমানো হচ্ছে। একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি যেখানে একটি ভুল নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে শুল্ক হ্রাস এবং আমদানি উৎসাহিত করার ফলে দেশীয় মালিকানাধীন শিল্প দুর্বল হয়ে পড়েছেÑ সেটি ইতিহাসে অনেকবার প্রমাণিত। তাই এখন ধাপে-ধাপে, পরিকল্পিতভাবে বাজার ও শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী শুল্ক নীতি সমন্বয় করা জরুরি।

মোবাইল আমদানি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত একদিকে ভোক্তাদের জন্য স্মার্টফোনকে আরও সাশ্রয়ী করতে পারে, ডিজিটাল সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে গতি আনতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত যদি অপরিকল্পিত হয় তাহলে দেশে গড়ে ওঠা মোবাইল সংযোজন শিল্প, হাজারো কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নীতিনির্ধারকদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলোÑ ভোক্তা স্বার্থ ও শিল্প সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। ধাপে ধাপে শুল্ক সংস্কার, দেশীয় সংযোজনকারীদের জন্য প্রযুক্তি আপগ্রেডে সহায়তা, স্থানীয় ভ্যালু অ্যাডিশন বাড়ানোর স্পষ্ট রোডম্যাপ এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হতে পারে বাস্তবসম্মত পথ। মোবাইল খাত শুধু রাজস্ব বা দামের বিষয়বস্তু না এটি ভবিষ্যৎ স্মার্ট অর্থনীতির ভিত্তি। এই ভিত্তিকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করাই নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, যাতে দেশের প্রযুক্তি খাত বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় অগ্রগামী ভূমিকা রাখে।


সাইফুল ইসলাম শান্ত

কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা