যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ত্যাগ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৩ এএম
আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৫ এএম
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এর সিদ্ধান্ত
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বড় দাতা দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সরে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহযোগিতার ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই বিদায় কেবল একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক গভীর অশনিসংকেত। এতে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও বড় ধাক্কা এ সিদ্ধান্ত। আমরা মনে করি, এমন সিদ্ধান্ত মানবজাতির সম্মিলিত নিরাপত্তাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল।
সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত এক নির্বাহী আদেশে এক বছর
আগে শুরু হওয়া প্রত্যাহার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের
স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ (এইচএইচএস) এবং পররাষ্ট্র দপ্তর। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে,
ডব্লিউএইচও তাদের মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা
নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে, কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় সংস্থাটির ভূমিকা
নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে। অভিযোগ করা হয়েছে, ডব্লিউএইচও
কোভিড-১৯-কে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা দিতে বিলম্ব করেছে এবং বিভিন্ন
ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশকে ডব্লিউএইচও
ছাড়তে হলে অন্তত এক বছর আগে সংস্থাটিকে জানাতে হয়। সে অনুযায়ী গত বছর নির্বাহী আদেশে
স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের নোটিস দিয়েছিল।
আমরা মনে করি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সর্বাধিক দাতা যুক্তরাষ্ট্রের
সরে যাওয়ায় অর্থায়নে বড় সংকট দেখা দেবে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গরিব দেশগুলো। এতে
যে কোনো মহামারি মোকাবিলায় সমস্যা হবে। শুধু তাই নয়, এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদেরও সংক্রামক
রোগের ঝুঁকি বাড়বে। কারণ, জীবাণু কোনও সীমান্ত মানে না। এতে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য
গবেষণা ও তথ্য বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়তে পারে। বাড়তে পারে চীনের প্রভাব। আঘাত
আসতে পারে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায়ও।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, ডব্লিউএইচও দীর্ঘদিন ধরে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ,
টিকাদান কর্মসূচি, জনস্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন এবং জরুরি স্বাস্থ্য সংকটে সমন্বয়কারী শক্তি
হিসেবে কাজ করে আসছে। আফ্রিকার ইবোলা সংকট থেকে শুরু করে কোভিড-১৯ পর্যন্ত প্রতিটি
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ে এই সংস্থার নেতৃত্ব ছিল অনস্বীকার্য। যুক্তরাষ্ট্র ছিল
এই কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান অর্থদাতা ও নীতিনির্ধারণে প্রভাবশালী অংশীদার। ফলে তাদের
বিদায়ে ডব্লিউএইচওর অর্থায়ন, গবেষণা ও জরুরি ভূমিকার সক্ষমতায় বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা
তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত
স্থাপন করতে পারে। অন্য উন্নত দেশগুলোও যদি জাতীয় স্বার্থের অজুহাতে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান
থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া
কিংবা মহামারি কোনো দেশের সীমানা মানে না। একটি দেশের দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বের
জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। সে ক্ষেত্রে একক রাষ্ট্রকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যনীতি কখনোই কার্যকর
হতে পারে না। বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা দ্বন্দ্বের শিকার হতে পারে। এটা ট্রাম্প
প্রশাসনের বিশ্বমানবতা-বিরোধী সংকীর্ণ, স্বার্থপর ও ক্ষতিকারক সিদ্ধান্ত বৈকি।
এটা মানতে হবে, এই সিদ্ধান্তে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উন্নয়নশীল
ও দরিদ্র দেশগুলো। টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশু পুষ্টি, ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মা প্রতিরোধে
ডব্লিউএইচওর ওপর এসব দেশের নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত
সহায়তা কমে গেলে এই দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চাপ বাড়বে, মৃত্যুহার বাড়ার ঝুঁকি
তৈরি হবে। এর পরোক্ষ প্রভাব শেষ পর্যন্ত উন্নত দেশগুলোকেও ভোগ করতে হবে, কারণ রোগের
বিস্তার থেমে থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি যাই হোক না কেন, বৈশ্বিক বাস্তবতা ভিন্ন কথা
বলে। বিশ্বের দেশগুলো আজ পারস্পরিক নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল
রেজিস্ট্যান্সÑ এসব সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব ছাড়া বিকল্প নেই। আমরা
জানি, ডব্লিউএইচও নিখুঁত নয়। সংস্থাটির সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছেÑ এ কথা যেমন সত্য,
তেমনি সংস্কারের পথ ছেড়ে বিদায়ের সিদ্ধান্ত সমস্যার সমাধান নয়, বরং সংকটকে আরও গভীর
করে।
আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে প্রয়োজন দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ও সংলাপ। যুক্তরাষ্ট্রসহ
সব প্রভাবশালী প্রতিটি দেশকে বুঝতে হবেÑ বিশ্বস্বাস্থ্য নিরাপত্তা কোনো দাতব্য বিষয়
নয়, এটি প্রত্যেক দেশের নিজস্ব নিরাপত্তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। তাই ডব্লিউএইচওকে
শক্তিশালী করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করাই
হতে পারে মানবজাতিকে রক্ষার একমাত্র পথ। যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় সেই পথে বড় বাধা হয়ে
দাঁড়ালÑ বাস্তবতা। আমাদের প্রত্যাশা, এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব জনস্বাস্থ্য রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র
তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে এবং সংশ্লিষ্ট উন্নত দেশগুলো তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা
অব্যাহত রাখবে।