ইমেইল থেকে
আবু বকর
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩১ পিএম
একটি রাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান হলো জনগণ। রাষ্ট্রের অগ্ৰগতি ও অবনতি উভয়ই নির্ভর করে তাদের কার্যক্ষমতার ওপর। একটি গাড়ি যেমন চাকা ছাড়া এর কার্যকারিতা থাকে না, তেমনি জনগণের সঠিক পরিচর্যা ছাড়া রাষ্ট্রের অগ্ৰগতি সম্ভব নয়। আমাদের দেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। তবে বিপুল এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১২ লাখ শিশু বাংলাদেশে শিশুশ্রমে যুক্ত হচ্ছে। প্রায় প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৪ জনের রক্তে উদ্বেগজনক মাত্রায় সিসা পাওয়া গেছে– বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের সবশেষ জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)
প্রতিবেদন বলছে, সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে দেশের বিপুল পরিমাণ
জনসংখ্যার একটি অংশ এখনও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। আর তারা হলো– পথশিশু। দেশের
আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। আর সকল নাগরিকের
মৌলিক চাহিদা নিশ্চিতে সরকার আইনত বাধ্য। তবে কি এসবের কোনো সুবিধা পাচ্ছে
পথশিশুরা? প্রতিটি শিশু একটি সম্ভাবনাময় ফুল, যা নিজের রূপ দিয়ে গাছের সৌন্দর্য
বৃদ্ধির পাশাপাশি চারপাশে ঘ্রাণ ছড়িয়ে থাকে। ঠিক তাদের মধ্যেও কোনো একটি
সম্ভাবনাময় প্রতিভা সুপ্তাবস্থায় থাকে, যা পরিচর্যার মাধ্যমে নিজে সমৃদ্ধ হয়ে
দেশসেবায় নিযুক্ত হবে।
এমনকি তাদের কোনো জন্মনিবন্ধন পর্যন্তও
নেই। ফলে তাদের সরকারিসহ নানা সেবা গ্ৰহণেও তৈরি হয়েছে বাধা। মূলত তাদের কেউ পিতা-মাতাহীন,
কারও থাকলেও যত্নের অভাব রয়েছে। তাই পরিচয়হীন এই বৃহৎ গোষ্ঠীর যত্ন রাষ্ট্রকেই
নিতে হবে। যদিও উন্নয়নশীল এই দেশে সরকারের পক্ষে তা অনেক চ্যালেঞ্জিং। তবুও
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রয়োজনে প্রতি অর্থবছরে বাজেটের একটি অংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় থেকে তাদের
উন্নয়নে সুষম বণ্টন করতে হবে।
আর পথশিশুরা সাধারণত কোনো সুস্থ পরিবেশে
বসবাস করে না। রেলস্টেশন, ফুটপাত, ব্রিজ ও রাস্তায় তারা বেড়ে ওঠে। প্রতিনিয়তই
তারা সঙ্গদোষে বিপদের মুখোমুখি হচ্ছে। তারা মাদক সেবন, চুরি-ছিনতাই, দলবদ্ধ গ্যাং
সংস্কৃতি চর্চা ইত্যাদি গর্হিত কাজ করে থাকে। এ ছাড়াও অর্থের অভাবে অস্বাস্থ্যকর
ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়াও তাদের শিক্ষা না থাকা, খাদ্যের
অভাবে পুষ্টিহীনতা, চিকিৎসার অভাবে নানা জটিল অসুস্থতা, পোশাক ও বাসস্থানের অভাব
তো রয়েছেই। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্ৰহণ করতে হবে। নিচে ৫টি
প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো।
এক. যেসব শিশুর মা-বাবার খোঁজ পাওয়া
যায়, তাদের দায়িত্বভার শর্তে পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া। এখানে ভাবনার বিষয় হলো
সেসব বাবা-মা অর্থের অভাবে থাকায় সন্তানের প্রতি দায়িত্বহীন হয়ে পড়ে। তাদের
কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া। তবে যেসব শিশুর পরিবারের খোঁজ পাওয়া যায় না
অথবা পেলেও তাদের ভরণপোষণে অনীহা থাকে, তাদের ক্ষেত্রে স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা
গড়ে তোলা। দুই. শিশুদের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিতে সরকারের পদক্ষেপ জরুরি।
এখানে নির্মিত আবাসন ব্যবস্থায় প্রয়োজনে যেসব শিশুর মা-বাবা কর্মহীন, তাদের
সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে থাকা
আবাসন প্রকল্পে ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প এলাকা গড়ে তোলা। কর্মক্ষম সদস্যদের
হাতেখড়ি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের কাজে নিযুক্ত করা। এতে কর্মসংস্থানের
পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও গতিশীল হবে। তিন. আর শিশুদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ
রাখা। কারণ, যারা ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত, তারা যাতে সেবন থেকে বিরত থাকে। আর শিশুদের
প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এ ছাড়াও তাদের
মনমানসিকতা বিকাশে সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা। চার. এ ক্ষেত্রে একসঙ্গে সকলকে
পর্যবেক্ষণে রাখা প্রায় অসম্ভব। তাই, প্রতি জেলায় পৃথকভাবে এসব আবাসন প্রকল্প
গড়ে তোলা, যাতে সুষ্ঠুভাবে তাদের পরিচর্যা করা যায়। এ ছাড়াও সরকারি পরিষেবা
গ্ৰহণ ও নিবন্ধিত নাগরিক পরিচয়ের ব্যবস্থা করা। পাঁচ. মানুষের মধ্যে
সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারিভাবে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের মাঝে সচেতনতা
বৃদ্ধি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলাদা কমিশন গঠন করা। আর সচেতনতার জন্য প্রচারণা
চালানো। বিশেষ করে, যারা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে, তারাও
যাতে এ সচেতনতা ক্যাম্পেইন থেকে বঞ্চিত না হয়।
অবশ্যই পথশিশুদের ওপর জিরো টলারেন্স
জারি করতে হবে। তা না হলেÑ সরকারের ওপর এই বোঝা বাড়বে। উন্নত দেশগুলো আজকের মতো
এই উন্নত ব্যবস্থায় পৌঁছায়নি; বরং সুপরিকল্পনা, নীতিমালা প্রণয়ন, সাংস্কৃতিক
মূল্যবোধের ফলে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। আর তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছিল
সর্বদলীয় সরকারের পূর্ণ সমর্থন। ফলে তাদের সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন হলেও জাতীয়
স্বার্থে নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধু সচ্ছল পরিবারই নয়; বরং সকল শ্রেণির
মানুষের জন্য শিক্ষাসহ মৌলিক চাহিদা নিশ্চিতের মাধ্যমে কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ার পথ
তৈরি হবে।
আবু বকর
শিক্ষার্থী, কমিউনিকেশন অ্যান্ড
মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম, ইসলামী
বিশ্ববিদ্যালয়