ইমেইল থেকে
হাবীব ইমন
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৪ এএম
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সব বেসরকারি টেক্সটাইল মিল বন্ধ রাখার যে ঘোষণা দিয়েছে এ শুধু একটি শিল্প খাতের সাময়িক সংকট বা মালিকপক্ষের হঠাৎ আবেগী সিদ্ধান্ত নয়, বরং এই ঘোষণা দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় অবহেলা, নীতিগত ব্যর্থতা এবং বাজার-বাস্তবতার সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাতের জমাট ফল। এই ঘোষণার ভেতরেই লুকিয়ে আছে সরকারের দায়, শ্রমিকশ্রেণির গভীর অনিশ্চয়তা এবং দেশের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির জন্য এক ভয়ংকর অশনিসংকেত।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে শ্রমিকশ্রেণি, অথচ দায় এড়াতে চাইছে
রাষ্ট্র। কার্ল মার্কস বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন ‘পুঁজি যেখানে সংকটে পড়ে, সেখানে তার
প্রথম আঘাতটি এসে পড়ে শ্রমের ওপর।’ বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পে আজ সেই ঐতিহাসিক সত্যই
নির্মমভাবে সত্য হয়ে উঠছে।
টেক্সটাইল শিল্প বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মূল ভিত্তি। অথচ বিদ্যুৎ,
গ্যাস ও জ্বালানির দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হলেও এই খাতের জন্য কোনো কার্যকর সুরক্ষা
নীতি গড়ে ওঠেনি। সরকার একদিকে রপ্তানিমুখী শিল্পের সাফল্যের গল্প শোনাচ্ছে, অন্যদিকে
স্থানীয় সুতা ও কাপড় উৎপাদকদের এমন ব্যয় চাপে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা করা
প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ভারত, চীন কিংবা ভিয়েতনামের দিকে তাকালেই বোঝা যায়Ñ এই দেশগুলো টেক্সটাইল
শিল্পকে কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করে। সেখানে জ্বালানি ও কাঁচামালের ওপর রাষ্ট্রীয়
ভর্তুকি রয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে উল্টো চিত্র। গ্যাস সংকট,
অনিয়মিত সরবরাহ, লোডশেডিং, উচ্চ মূল্যহারÑ সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে,
যেখানে দেশীয় মিলগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শর্ত
মেনে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু উৎপাদনশীল শিল্পকে রক্ষার কোনো রাষ্ট্রীয়
দায় সরকার নেয়নি।
টেক্সটাইল মিল বন্ধ মানে শুধু চিমনি নিভে যাওয়া নয়। এর মানে হাজার
হাজার শ্রমিকের জীবনে হঠাৎ অন্ধকার নেমে আসা। প্রত্যক্ষভাবে টেক্সটাইল খাতে নিয়োজিত
শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক লাখ, আর পরোক্ষভাবে এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা
আরও বহুগুণ বেশি। বাংলাদেশে শ্রমিকদের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।
মিল বন্ধ হলে শ্রমিকরা কোথায় যাবেÑ সে প্রশ্নের কোনো উত্তর সরকারের কাছ থেকে এখনও শোনা
যায়নি। এর ফল হিসেবে বাড়বে বেকারত্ব, বাড়বে গ্রামীণ দারিদ্র্য, বাড়বে শহরমুখী চাপ এবং
সামাজিক অস্থিরতা।
টেক্সটাইল মিল বন্ধ মানে তৈরি পোশাক শিল্প আরও বেশি আমদানিনির্ভর
হয়ে পড়া। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের
দরকষাকষির ক্ষমতা কমে যাবে। বিটিএমএ’র ঘোষণাকে অনেকেই সরাসরি মালিক বনাম শ্রমিক দ্বন্দ্ব
হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন। তবে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পে এই দ্বন্দ্বটি নিছক অর্থনৈতিক
হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফল। রাষ্ট্র যদি শিল্পকে সুরক্ষিত
রাখার জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়ন করত, যদি জ্বালানি, সুতা ও কাঁচামালের ওপর ভর্তুকি
বা সহায়তা দিত, তাহলে মালিকের মুনাফা এবং শ্রমিকের জীবন উভয়ই স্থিতিশীল থাকতে পারত।
কিন্তু বর্তমান নীতিতে দেখা যাচ্ছেÑ মালিকরা বড়লোকের মতো ক্ষতির মোকাবিলা করতে পারছে,
আর শ্রমিকরা জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা হারাচ্ছে।
এ ছাড়া, রাষ্ট্রীয় নীতিতে স্বচ্ছতা ও পরিকল্পনার অভাবও বিশাল ক্ষতির
কারণ। কারখানা বন্ধের প্রক্রিয়া বা মেরামত, ঋণ ও লিকুইডিটি সমস্যা সমাধানে কোনো দীর্ঘমেয়াদি
পরিকল্পনা নেই। ফলে মালিকরা নিজস্ব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, আর শ্রমিকরা
নীরব শিকার হয়ে পড়ছে। এই ব্যর্থতা রাষ্ট্রের নীতিগত পক্ষপাত এবং বাজারকেন্দ্রিক ধারণার
সরাসরি ফল।
প্রশ্ন তাই বিটিএমএ কী বলছেÑ তা নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কী করছে
এবং কাদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে। রাষ্ট্র যদি শ্রমিক ও শিল্প উভয়ের স্বার্থে নীতি প্রণয়ন
করত, তাহলে এই সংকট এড়িয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকার কেবল বাজারের
‘স্বাভাবিক নিয়ম’ অনুসরণ করার কথা বলছে, অথচ শ্রমিকের জীবন এবং শিল্পের স্থায়িত্বের
দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে।
তাই টেক্সটাইল মিল বন্ধের ঘোষণা কেবল একটি শিল্প খাতের সংকেত নয়; এটি দেশের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বড় সতর্কবার্তা। যদি এখনই জ্বালানিনীতি পুনর্বিবেচনা না করা হয়, দেশীয় শিল্প সুরক্ষা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং শ্রমিকদের জন্য বাস্তব সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা না হয়, তাহলে এই সংকট শুধু টেক্সটাইলেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাÑ এটি পুরো শিল্প-অর্থনীতিকে গ্রাস করবে, কর্মসংস্থান হ্রাস করবে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াবে এবং সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেবে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং শিল্পের টিকে থাকা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক এবং নৈতিক দায়িত্ব।
হাবীব ইমন
প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন