ভোটের প্রচার শুরু
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৫ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশে প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ শেষ হয়েছে। শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচারাভিযান। আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ ও পথসভা শুরু করেছেন প্রার্থীরা। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোও নেমে পড়েছে ময়দানে। সিলেটে হযরত শাহজালালের (র.) মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেছেন দলের চেয়ারম্যান। ঢাকা থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রচার শুরু করেন দলটির আমির। তিন নেতার মাজার ও শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোরও একই ধাঁচের কর্মসূচি রয়েছে।
নির্বাচন যে জমে উঠছে তার আলামতও প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রচারের মাঝেই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষের কথা গণমাধ্যমে আসছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ভোটের মাঠে থাকা বিদ্রোহী প্রার্থীরাও পরিবেশ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আমরা মনে করি, নির্বাচনে এই ধরনের পরিস্থিতি দলগুলোর জন্য স্বাভাবিক উত্তেজনা। তা প্রচার এবং গণসংযোগকে চাঙ্গা রাখার উপকরণ। তবে তা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়Ñ প্রশাসনকে তা নিশ্চিত করতে বলব। আমরা আরও মনে করি, ভোটের প্রচার কেবল পোস্টার, ব্যানার বা মাইকের শব্দ নয়; এটি রাজনৈতিক দলগুলোর চিন্তা, কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। নির্বাচনী প্রচারের মধ্য দিয়েই ভোটাররা প্রার্থীদের যোগ্যতা, সততা ও অঙ্গীকার যাচাই করেন। তাই প্রচার পর্ব যত বেশি অবাধ ও বাধাহীন হবে, জনগণের সিদ্ধান্ত তত বেশি সচেতন ও গ্রহণযোগ্য হবে।
আসলে কোনো রাষ্ট্রে জনগণ যখন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে ভোট দিতে পারে, তখনই প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র কার্যকর হয়। ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। বিজয়ী দল সরকার গঠন করে। বিজিতেরা বসে বিরোধী আসনে। সবাই মিলে সংসদে গিয়ে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়। এ কথা সত্য, দীর্ঘদিন ধরে এদেশের মানুষ ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত। ফলে গণতন্ত্র ছিল অনুপস্থিত। অথচ ভোটই গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ। আসলে গণতন্ত্রের মূলভিত্তি হলো জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ। আর সেই অংশগ্রহণের সবচেয়ে কার্যকর ও সাংবিধানিক মাধ্যম হচ্ছে ভোট। আমরা বলতে চাই, ভোটাধিকার কেবল একটি কাগজে সিল দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়Ñ এটি নাগরিকের আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের অধিকার। গণতন্ত্র টেকসই করতে হলে সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে জনগণের ভোটাধিকার। নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য। কারণ জনগণের ভোটেই রাষ্ট্রের বৈধতা, সরকারের শক্তি এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। সত্যিকার অর্থে, ভোট ছাড়া গণতন্ত্র কেবল একটি অর্থহীন শব্দ। কারণ, কারচুপি ও প্রহসনের নির্বাচনে প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। জনগণের ভোটাধিকার হরণ হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা হারিয়ে যায়, শক্তিশালী হয় কর্তৃত্ববাদ। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তরুণ প্রজন্ম, যারা গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস হারাতে বসে।
নির্বাচন হওয়ার কথা জনগণের অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশের উৎসব হিসেবে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলোÑ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৫ বছরে ব্যাপক কারচুপি, দিনের ভোট রাতে এবং আমি-ডামি ভোটের মাধ্যমে সেই উৎসবকেই কলঙ্কিত করা হয়েছে। গণতন্ত্রকে উপহাসে পরিণত করেছে। এমনও দেখা গেছে, সরকার গঠনের জন্য দরকার ১৫০ আসন, সেখানে ভোটের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জনকে বিজয়ী করার মতো ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত রয়েছে। এসব অনিয়ম কেবল একটি নির্বাচনের ফলাফলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি; ধ্বংস করেছে দেশের সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশ। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ কমেছে, সৃষ্টি হয়েছে গভীর অনাস্থা।
অতীত এই অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয়Ñ স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। অতীতের রাতের ভোট বা আমি-ডামি নির্বাচন আর ফিরে আসতে দেওয়া যাবে না। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হলে নির্বাচনী পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের আশঙ্কায় রাখে। আগের কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে সহিংসতা, ভয়ভীতি, প্রশাসনিক পক্ষপাত ও বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা জরুরি।
তাই সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রচারে বাধা, মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার বা ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে কোনো পক্ষই আতঙ্কিত না হয়। নির্বাচন কমিশনকে দৃশ্যমানভাবে শক্ত ও স্বাধীন ভূমিকা রাখতে হবেÑ প্রচার থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব কম নয়। প্রচারে শালীন ভাষা, প্রতিপক্ষের প্রতি সহনশীলতা এবং সহিংসতা পরিহার করা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। জনগণ আজ আর উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান নয়, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও সৎ নেতৃত্ব দেখতে চায়। মনে রাখতে হবে, এই নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
এবার প্রতিনিধি নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে এ নির্বাচন আলাদা গুরুত্ব ও ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ও প্রত্যাশার আলোকে রচিত জাতীয় সনদের ওপর গণভোটে গণরায় নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে জরাজীর্ণ অতীত ঝেড়ে ফেলে সূচিত হবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নবযাত্রা। আমরা এই অভিযাত্রারও সাফল্য কামনা করি।