‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’
এম এ লতিফ ভুঁইয়া
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৮ এএম
এম এ লতিফ ভুঁইয়া
‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’Ñ এই বাক্যযুক্ত উক্তিটি জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির শীর্ষনেতা তারেক রহমানের কণ্ঠে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখার আভাস। এ কথা সত্য, রাজনীতিতে কিছু শব্দ থাকে, যা মুহূর্তেই জনমনে আলোড়ন তোলে। কিছু বক্তব্য থাকে, যা কেবল স্লোগান নয়Ñ বরং দিকনির্দেশনা। তারেক রহমানের উচ্চারিত ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ ঠিক তেমনই একটি বাক্য। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের বিখ্যাত ভাষণ ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’-এর প্রতিধ্বনি করে তিনি তার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। এটি নিছক ইংরেজি একটি লাইন নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ঘোষণা, একটি আত্মবিশ্বাসী বার্তা এবং একই সঙ্গে একটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখাও।
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে সংকট, অবিশ্বাস ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জর্জরিত। এই বাস্তবতায় যখন তারেক রহমানের মতো দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলেন, ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ তখন কেবল তার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং তা হয়ে ওঠে একটি প্রজন্মের প্রত্যাশার প্রতিধ্বনি।
আসলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতির অভাব নেই। নির্বাচনের আগে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজÑ এসব শব্দ বহুবার শোনা গেছে। কিন্তু পরিকল্পনার স্পষ্টতা বরাবরই হতাশাজনক। কিন্তু তারেক রহমানের বক্তব্যের মূল শক্তি এখানেইÑ তিনি ‘আমি করব’ বলেননি, তিনি বলেছেন, ‘আমার একটি পরিকল্পনা আছে’। অর্থাৎ রাজনীতি তার কাছে তাৎক্ষণিক ক্ষমতা দখলের কৌশল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তা।
তার এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়— রাষ্ট্র পরিচালনা হবে লক্ষ্যনির্ভর, নীতি নির্ধারণ হবে তথ্য ও বাস্তবতার আলোকে এবং সিদ্ধান্ত আসবে আলোচনার মধ্য দিয়ে। আমি মনে করি, ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ একটি বিকল্প রাষ্ট্রভাবনার ইশতেহার। বর্তমান ক্ষমতাকেন্দ্রিক, একদলীয় মানসিকতার বিপরীতে তারেক রহমান তুলে ধরছেন অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের ধারণা। এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে— মানুষ, ক্ষমতা নয় প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি নয় আইনের শাসন, নির্দেশের শাসন নয়। তিনি বারবার জোর দিয়েছেন, রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে আগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে।
তারেক রহমানের এই পরিকল্পনায় ‘অর্থনীতি’ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট— কেবল জিডিপির সংখ্যা দিয়ে উন্নয়ন মাপা যাবে না। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন সাধারণ মানুষ তা অনুভব করে। তিনি যে অর্থনৈতিক দর্শনের কথা বলেছেন, তার মূল দিকগুলো হলোÑ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সুরক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো, যা এই মুহূর্তে কার্যত জরুরি। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান ‘মেগা প্রকল্পকেন্দ্রিক’ উন্নয়ন মডেলের একটি বিকল্প ব্যবস্থাও।
আমি মনে করি, তরুণ-যুবাদের জন্য যেকোনো বাস্তবমুখী পরিকল্পনা সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পুঁজি। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। কিন্তু এই তরুণরাই সবচেয়ে বেশি বেকার, হতাশ ও নিশ্চয়তাহীন। তারেক রহমানের প্ল্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্ভবত এখানেই। তিনি তরুণদের দেখেন— কেবল ভোটার হিসেবে নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে। তাই দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, স্টার্টআপ সংস্কৃতি, উদ্যোক্তা সহায়তাÑ এসব বিষয় তার পরিকল্পনার কথায় ঘুরেফিরে আসে। এতে বোঝা যায়, তিনি তরুণদের ভবিষ্যৎকে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখছেন।
ভুলে গেলে চলবে না, গণতন্ত্রের সংকটই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট। ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী মতের নিরাপত্তাÑ সবই প্রশ্নের মুখে। তাই তো তারেক রহমানের পরিকল্পনায় নির্বাচন কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং গণতন্ত্রের প্রাণ। তিনি কথা বলেন— নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং ভোটারদের আস্থা পুনর্গঠনের। ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ মানে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার পথ নয়, বরং গণতন্ত্রে ফেরার রূপরেখা।
তারেক রহমানের বক্তব্যে একটি বিষয় বারবার উঠে আসে— দেশ আগে, দল পরে। এটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে, কিন্তু এর ভেতরে রয়েছে একটি বৃহত্তর বার্তা। তিনি বোঝাতে চান— বিভাজনের রাজনীতি, যা দেশকে দুর্বল করে। তিনি মনে করেন, ঐক্যই পারে সংকট কাটাতে। এই বার্তা এমন একসময়ে গুরুত্বপূর্ণ, যখন রাজনীতি চরমভাবে মেরুকৃত।
যেকোনো পরিকল্পনার মতোই তারেক রহমানের ‘প্ল্যান’-এর চ্যালেঞ্জ আছে। প্রশ্ন উঠবে— এটি কতটা বাস্তবসম্মত? ক্ষমতায় গেলে কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব? দলীয় রাজনীতির চাপ সামলানো যাবে কি? কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পরিকল্পনা না থাকলে লক্ষ্যে পৌঁছা যায় না। রাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো— পরিকল্পনাহীন ক্ষমতা।
পরিশেষে বলতে চাই, ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ এই বাক্যটি হয়তো ইতিহাসে লেখা থাকবে না, থাকবে না সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদে। কিন্তু এটি ইতোমধ্যেই রাজনীতির ভাষায় একটি নতুন সুর এনেছে। এটি আশ্বাস নয়, এটি আহ্বান— আলোচনার আহ্বান, বিকল্প ভাবনার আহ্বান এবং একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার আহ্বান।
বাংলাদেশ আজ দাঁড়িয়ে আছে এক সন্ধিক্ষণে। এই সন্ধিক্ষণে প্রয়োজন কেবল প্রতিবাদ নয়, প্রয়োজন সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। তারেক রহমান যখন বলেন, ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ তখন প্রশ্ন একটাইÑ তার পরিকল্পনা কী, আমরা কি সেই পরিকল্পনা শুনতে, বিচার করতে এবং অংশ নিতে প্রস্তুত? কারণ, গণতন্ত্রে ভবিষ্যৎ একক কারও নয়— তা গড়ে ওঠে পরিকল্পনা, অংশগ্রহণ ও জনসমর্থনের সম্মিলনে। তাই আমি বলতে চাই, ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’Ñ একটি উক্তিই নয়, এটি আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশ।
লেখক: রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক