স্বামী অবিচলানন্দ
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪২ এএম
দেবী সরস্বতী। ছবি: হিন্দুস্তান টাইমস
দেবীপূজা বহু প্রাচীন। প্রাগৈতিহাসিক যুগ হতে দেবীপূজা প্রচলিত। বৈদিক যুগেও দেবীপূজা প্রচলিত ছিল। সকল দেশেই নানা আকারে-প্রকারে দেবী মায়ের আরাধনা ছিলই। মহাভারতে দেবী-উপাসনার বিষয় উল্লেখ আছে। আর সরস্বতী কেবল হিন্দুধর্মের এক দেবীর নাম নয়; তিনি জ্ঞান, বিবেক ও সৃজনশীলতার প্রতীক। বিদ্যা, বুদ্ধি, বাক্শক্তি ও শিল্পকলার অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে স্বরস্বতী মানবসভ্যতার এক মৌলিক চেতনাকে ধারণ করেন। সমাজ যখন অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও বিকৃত তথ্যের চাপে বিপর্যস্ত, তখন সরস্বতীর দর্শন হয়ে ওঠে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। সরস্বতীর হাতে থাকা বীণা আমাদের শেখায়—জীবনে ছন্দ থাকা জরুরি। বই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব, আর শ্বেতবস্ত্র ইঙ্গিত করে পবিত্র চিন্তা ও স্বচ্ছ মননের প্রয়োজনীয়তা। এই প্রতীকগুলো আজকের প্রজন্মের জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে।
বাঙালির প্রতিটি গৃহ আজ নতুন সাজে সজ্জিত। বাঙালির প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন আজ উৎসবে মুখরিত। বিদ্যার্থীরা তাদের আরাধ্য দেবীকে বরণ করার জন্য কৌতূহলী। এই পূজা বাঙালির তথা বিদ্যার্থীদের জাতীয় উৎসবে পরিগণিত। আজ আমরা কি যেন এক বিশেষ আনন্দে আত্মহারা।
‘ব্রাহ্মমুহূর্তে, আবাহন সম্পন্ন হয় দেবীর, শঙ্খে শঙ্খে সমাদরে। সদ্য প্রস্ফুটিত পলাশ ও কুন্দফুল দিয়ে হবে তার পূজা। বিদ্যার দেবী সরস্বতী, তার বাহন হংসসহ সমভিব্যহারে দেবী আসছেন। আমরা রোমাঞ্চিত হৃদয়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পুষ্পাঞ্জলি লয়ে তার শ্রীচরণ দর্শনের প্রত্যাশায় অপেক্ষমাণ। তাকে কেন্দ্র করে আমাদের অন্তরে আজ অপরিমেয় আনন্দ-অনুভূতির উদ্ভাস। পলাশ, কুন্দ প্রভৃতি নানা ফুলের ঘ্রাণে ঘ্রাণে প্রকৃতি আজ নতুন নতুন সাজে সজ্জিত। তার সেই আগমনী বার্তা নিনাদিত হচ্ছে অনল অনিলে চির নভোনীলে।’
শাস্ত্রে রয়েছেÑ ‘সাধকানাং হিতার্থায় ব্রহ্মণো রূপকল্পনা’Ñ সাধকদের হিতের জন্য ব্রহ্মের নানাপ্রকার রূপ পরিকল্পিত হয়। ফলত রূপপরিকল্পনার তথা বাহ্যপূজার একটি দার্শনিক তত্ত্ব উপনিহিত রয়েছে। উক্ত তত্ত্বের মাধ্যমে আমরা বাহ্যপূজার প্রয়োজন, উপযোগিতা এবং ফল সম্বন্ধে সম্যক ধারণা লাভ করব। শাস্ত্রে আরও রয়েছেÑ ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’ যে দেবী সর্বপ্রাণীতে মাতৃরূপে অবস্থিতা তাকে নমস্কার। তবুও যে-যুগে আমরা বাস করছি দুর্ভাগ্যবশত তা স্বার্থপরতা, হিংসা, মিথ্যাচরণ ও সংঘর্ষে ক্রমাগত আন্দোলিত। সুস্থ চিন্তাশীল, হৃদয়বান মানুষ আজ সন্ত্রস্ত, সংক্ষুব্ধ। এমতাবস্থায় ঘন মেঘের আঁধার ভেদ করে শীতে-সূর্যের প্রকাশের মতোই আমাদের সংশয়দীর্ণ হৃদয়ে দিব্যোজ্জ্বল আত্মপ্রকাশ করছেন বিদ্যার দেবী সরস্বতী।
শক্তিই জগতের মূলাধার। শক্তিতে বিদ্যা-অবিদ্যা দুইই আছে। আমাদেরকে বিদ্যা শক্তির দ্বারা অবিদ্যা শক্তিকে পরাস্ত করতে হবে। তাই শক্তির পূজা পদ্ধতি। শক্তি বিশ্বজননীয়া দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতাÑ সকল ভূতের মা-রূপে তার অবস্থান।-‘মা-কি না? জগতের মা, যিনি জগৎ সৃষ্টি করেছেন, পালন করছেন, আবার তিনি তার সন্তানদের সর্বদা রক্ষা করছেন। আর ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষÑ যে যা চায়, তাই দেন। বিদ্যার দেবী জননী যেন আমাদের অজ্ঞান নাশ করে শুভপথে পরিচালিত করেন।
আমরা যদি বিদ্যার দেবীর আদর্শকে অর্থাৎ আমাদের ভিতরকার অজ্ঞাননাশকারিণী, জ্ঞানপ্রদায়িনী দেবীকে বুঝতে পারি, নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে পারি, তবেই হবে আমাদের সার্বিক কল্যাণ। সকলেই নিশ্চয় মায়ের জীবন আদর্শের মধ্যে শান্তির বার্তা খুঁজে পাবেন এবং নিজেদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন। মায়ের কাছে এ প্রার্থনা জানাবেন : ‘মা আমাদের মানুষ কর।’
আমরা বিদ্যার দেবীর শ্রীচরণে প্রার্থনা জানাচ্ছিÑ তিনি আমাদের অন্তরের ভিতরকার অজ্ঞান শক্তিকে বিনাশ করে শুভশক্তির উদ্বোধন করুন। আমরা যেন সাম্য, মৈত্রী, অহিংসা ও পরার্থপরতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তার সুসন্তানরূপে নিজেদের পরিচয় দিতে পারি। নিছক উৎসব-আড়ম্বরে মত্ত না হয়ে আমরা যেন আমাদের অন্তরে এই বিদ্যাশক্তির উদ্বোধনে নিয়ত ব্যাপৃত থাকতে পারি। সেই সঙ্গে মায়ের নিকট আকুল আর্তি, সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত মানুষেরা যেন পুনরায় সুস্থ, সুন্দর জীবনে ফিরে আসতে পারে, তাদের দুঃখে আমরাও যেন মর্মে মর্মে সমবেদনা অনুভব করি। শীতের এই পুণ্যলগ্নে সকল ভক্ত ও অনুরাগীদের এবং বিদ্যার্থীদের আমাদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।
আসলে সরস্বতী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি জ্ঞান ও নবচেতনার উৎসব। এই দিনে শিশুদের হাতেখড়ি আমাদের সংস্কৃতিতে শিক্ষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই চেতনাকে সারা বছর ধরে লালন করি? সরস্বতীর শিক্ষা আমাদের বলে— অজ্ঞতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র জ্ঞান। তাই ধর্মীয় আচার নয়, সরস্বতীর প্রকৃত আরাধনা হতে হবে যুক্তিবাদী, মানবিক ও আলোকিত সমাজ গড়ে তোলার মধ্য।
সরস্বতী দেবীর মানবীরূপ শ্রীমা সারদাদেবী বলেছেন : ‘নির্বাসনা প্রার্থনা করতে হয়। কেননা বাসনাই সকল দুঃখের মূল, বারবার জন্ম-মৃত্যুর কারণ, আর মুক্তিপথের অন্তরায়। তাই হে জীব শরণাগত হও, কেবল শরণাগত হও।’ তার কাছে আমাদের সকলের একান্ত প্রার্থনাÑ জীবনের প্রতিটি দিন ও মুহূর্ত আমরা যেন নিজ নিজ অন্তরে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য নিয়ে তার পূজায় নিরত থাকতে পারি।
আমাদের প্রার্থনাÑ বাংলার প্রতি গৃহে বিদ্যার দেবীর আরাধনা প্রবর্তিত হোকÑ এটাই আন্তরিক প্রার্থনা। ভক্তগণের চিত্তশুদ্ধি ও ভক্তিলাভ হোকÑ জগন্মাতার চরণে এইই ঐকান্তিক প্রার্থনা। হে অজ্ঞাননাশিনী, হে বিদ্যাদাত্রী দেবী তোমাকে প্রণাম করি।
ওঁ ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমোঃ।
বেদবেদান্ত বেদাঙ্গ বিদ্যাস্থানেভ্যঃ এব চঃ ॥
রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ঢাকা