যুক্তরাষ্ট্র–ইউরোপ দ্বন্দ্ব
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:২৪ এএম
ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত।
বিশ্ব-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক টানাপড়েন নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। বলা যায়, শুল্কনীতি, ভর্তুকি, শ্রমমান, জলবায়ু ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান সব মিলিয়ে এই দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল দ্বিপক্ষীয় নয় এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক বাণিজ্যেও। এই প্রভাবের ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ বৃহত্তর দুই অর্থনৈতিক জোটের মধ্যে যদি পাল্টাপাল্টি শুল্ক যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত উভয়পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা বাড়বে, বিনিয়োগের গতি কমে যাবে এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। আর এসবের প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে। ফলে বিভিন্ন দেশে চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ঘিরে অনিশ্চয়তার প্রভাব তারা ইতোমধ্যেই টের পাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপÑ দুই বাজারেই অর্ডার ও দামের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হয়েছে। ইউরোপের বাজারে পোশাকের গড় দাম কমে যাওয়াও সেই চাপেরই প্রতিফলন। এতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি সরাসরি চাপের মুখে পড়তে পারে।
এসব আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে ২১ জানুয়ারি, প্রতিদিনের বাংলাদেশ-
এ ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ দ্বন্দ্ব : বাংলাদেশের পোশাক খাত হুমকিতে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রপ্তানি আয়ের সাম্প্রতিক প্রবণতাও রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের মোট রপ্তানি টানা কয়েক মাস ধরে নিম্নমুখী।
একই সময়ে ইউরোপীয় বাজারে পোশাকের গড় দামও কিছুটা কমেছে, যা চাহিদা ও প্রতিযোগিতাÑ
দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের বিশ্লেষণে ইউরোস্ট্যাটের
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউরোপে বাংলাদেশি পোশাকের
গড় রপ্তানি মূল্য কমেছে ২ দশমিক ০৬ শতাংশ। একই সময়ে অন্যান্য প্রধান রপ্তানিকারক
দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।
বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ
আসে পোশাক খাত থেকে। এই খাতের প্রধান দুটি বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। অর্থাৎ
এই দুই শক্তির যেকোনো দ্বন্দ্ব বা নীতিগত সংঘাত সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঘাত
হানতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা,
কার্বন ট্যাক্স, শ্রম ও মানবাধিকার সংক্রান্ত শর্ত আরোপÑ সবকিছু মিলিয়ে পোশাক রপ্তানিকারকদের
সামনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট
মেকানিজম চালুর পথে হাঁটছে, যা পরিবেশবান্ধব উৎপাদন না হলে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ
তৈরি করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র শ্রম অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন ও মানবাধিকার ইস্যুতে
কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। এই দুই ভিন্ন মানদণ্ডের চাপে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোকে
একই সঙ্গে দুই রকম শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে, যা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সত্যিই
বড় চ্যালেঞ্জ।
আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো অর্ডার স্থানান্তর। যুক্তরাষ্ট্র–ইউরোপ
দ্বন্দ্বের সুযোগে কিছু বহুজাতিক ব্র্যান্ড তাদের সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন করছে। এতে বাংলাদেশ
থেকে অর্ডার কমে গিয়ে ভিয়েতনাম, ভারত বা ল্যাটিন আমেরিকার দিকে সরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইতোমধ্যে বৈশ্বিক মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পোশাকের অর্ডার কমেছে; তার ওপর ভূ-রাজনৈতিক
অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এমনিতেই ডলার সংকট, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি
ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে এই বৈশ্বিক চাপ যুক্ত হওয়ায় পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থানও
ঝুঁকিতে পড়ছে।
ভুলে গেলে চলবে না, লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকা এই খাতের
সঙ্গে যুক্ত। অর্ডার কমলে প্রথম আঘাত আসে শ্রমিকের ওপরÑ কখনও ছাঁটাই, কখনও মজুরি অনিশ্চয়তা,
আবার কখনও-বা কারখানা বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় সরকারের কূটনৈতিক
ও নীতিগত প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ উভয় পক্ষের সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ
সম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার
করে নতুন বাজার অনুসন্ধান, যেমনÑ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাÑ এসব অঞ্চলে রপ্তানি
বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা মনে করি, সরকার, মালিক ও শ্রমিক—
তিন পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।
সময়ের দাবি, পোশাক খাতকে টিকিয়ে রাখতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্র–ইউরোপের লড়াই আমাদের সৃষ্টি নয়, কিন্তু এর ক্ষতি যেন আমাদের বহন করতে না হয়Ñ সেজন্য এখনই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি, পোশাক খাত বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশের অর্থনীতি; আর এই খাত ঝুঁকিতে পড়লে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই এখন সময় সতর্ক হওয়ার, বিকল্প প্রস্তুতির এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখার।