× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

তত্ত্বীয় দৃষ্টিতে নির্বাচিত সরকারের চ্যালেঞ্জ

ড. মো. আইনুল ইসলাম

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১৭ এএম

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১৮ এএম

ড. মো. আইনুল ইসলাম

ড. মো. আইনুল ইসলাম

বাংলাদেশ ঐতিহাসিক এক সাধারণ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। যুগসন্ধিক্ষণের এই নির্বাচন এবং এর পরবর্তী এক বছরই হয়তো বাংলাদেশের আগামী ৫০ বছরের আর্থ-সামজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার ভ্যাগ্যলিপি এঁকে দেবে। এমন এক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে অর্থনীতি শাস্ত্র, সামাজিক বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রমাণিত তত্ত্বের আলোকে বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে নতুন সরকারের সামনে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্ট হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের শুরুতেই দেশ এক গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনাবিন্দুতে পৌঁছে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা, যা মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ থেকে ৮৫ শতাংশ দখল করে রেখেছে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে একটি ‘মনোকালচারাল’ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই নির্ভরশীলতাকে সমাজবিজ্ঞানী আন্দ্রে গুন্টার ফ্রাঙ্ক ও ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইনের ‘নির্ভরশীলতা তত্ত্বের’ আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো (পেরিফেরি) উন্নত দেশগুলোর (কোর) সঙ্গে এক অসম বাণিজ্যসম্পর্কে আবদ্ধ, যেখানে বাংলাদেশ মূলত সস্তা শ্রম এবং কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবে কর্মরত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে পোশাক রপ্তানি ২.৬৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৯.৩৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতা বা জ্বালানি সংকটের ফল নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাঠামোগত শোষণেরও বহিঃপ্রকাশ। ওয়ালারস্টাইনের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্র তার উৎপাদন ব্যবস্থাকে উচ্চ-মূল্যসংযোজনী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত করতে না পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ‘কোর’ দেশগুলোর বাজার চাহিদার ওপর নির্ভরশীল থেকে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সুতাকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে কৃত্রিম তন্তু বা এমএমএফ-ভিত্তিক আধুনিক উৎপাদনে রূপান্তরের ধীরগতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে, যেখানে প্রতিযোগী দেশ হিসেবে ভিয়েতনাম বা ভারত তাদের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়েছে। ফলে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৪.১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ক্রমাগত নিম্নমুখী হওয়া বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের প্রতিফলন দেখাচ্ছে।

রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান স্থবিরতাকে নোবেলজয়ী ডগলাস নর্থের ‘প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্ব’ এবং ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু ও জেমস রবিনসনের ‘এক্সট্র্যাকটিভ ইনস্টিটিউশন’ তত্ত্বের মাধ্যমে নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে এক চ্যালেঞ্জিং মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অ্যাসেমোগ্লুর মতে, যখন কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা অলিগার্কদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকে, তখন সেখানে উদ্ভাবন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের পূর্ববর্তী সরকারের সময় ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি এবং বড় বড় গ্রুপের অলিগার্কদের মাধ্যমে প্রায় ২০০ বিলিয়ন টাকা লুটপাটের ঘটনা এই ‘এক্সট্র্যাকটিভ’ বা শোষণমূলক চরিত্রের ক্ল্যাসিক ও চূড়ান্ত প্রমাণ। ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯৭ শতাংশে নেমে আসা মূলত এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারই ফল। যদিও ২০২৬ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধি ৩.৮ থেকে ৫.৫ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে, তবে ডগলাস নর্থের তত্ত্ব অনুযায়ী, শক্তিশালী এবং নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে না তুললে এই প্রবৃদ্ধি কোনোভাবেই টেকসই হবে না। কারণ বিনিয়োগকারীরা কেবল মুনাফা দেখে না, তারা সেই দেশের ‘রুল অব ল’ বা আইনের শাসন এবং নীতিগত স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেয়, যার অভাব বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির অনুপাতে হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ।

মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় জন মেইনার্ড কেইনসের ‘কেইনসীয় অর্থনীতি’ এক গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক প্রদান করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছানো, বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশে উঠে যাওয়া নির্দেশ করে যে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ এবং পণ্যের জোগানের মধ্যে এক চরম ভারসাম্যহীনতা বিরাজ করছে। কেইনসীয় তত্ত্ব অনুসারে, কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় যদি না সরবরাহ চেইনের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকট ও লোহিত সাগরের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আমদানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা উৎপাদন ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি বাড়লেও, মূলত আইনের প্রয়োগহীন বাজার কাঠামো মূল্যস্ফীতির জন্যে দায়ী। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং আয়বৈষম্য চরমে পৌঁছেছে। এই বৈষম্যকে পল রোমার ও রবার্ট লুকাসের ‘এন্ডোজেনাস গ্রোথ থিউরি’ দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানবপুঁজি এবং প্রযুক্তিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বৈশ্বিক মানদণ্ডে পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে, যুব বেকারত্ব ১৬.৮ শতাংশে পৌঁছানো এবং নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ কমে যাওয়া নির্দেশ করে যে, দেশের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থা বর্তমান বাজার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে কেবল সস্তা শ্রমের সুবিধা দিয়ে ২০২৬ সালের পরিবর্তিত বিশ্বে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান শোচনীয় অবস্থা হাইম্যান মিনস্কির ‘ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টেবিলিটি হাইপোথিসিস’-এর একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিনস্কির মতে, দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতা এবং শিথিল তদারকি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের দিকে ধাবিত করেছে, যা শেষপর্যন্ত বড় সংকটের সৃষ্টি করেছে। খেলাপি ঋণ (এনপিএল) প্রায় ৩৫ শতাংশে পৌঁছানো এবং মোট ঋণের ২৫ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত এই ঝুঁকির আওতায় থাকা আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতাকে স্পষ্ট করে। এই সংকটকে জোয়েল হেলম্যান ও ড্যানিয়েল কফম্যানের ‘স্টেট ক্যাপচার’ তত্ত্বের আলোকে দেখলে বোঝা যায় যে, কীভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আমলা ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকিং নীতিকে নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করে ব্যাংকগুলোকে আমানতকারীদের জন্য অনিরাপদ করে তুলেছে। এই ‘স্টেট ক্যাপচার’ বা রাষ্ট্র দখলের ফলে প্রকৃত উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না, যা উৎপাদন সক্ষমতাকে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে। টিমোথি বেসলির ‘ক্রেডিবিলিটি ট্র্যাপ’ বা বিশ্বাসযোগ্যতার ফাঁদ তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন সরকারের নীতি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়ে, তখন সুদের হার কমালেও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় না, মূল্যস্ফীতি-মুদ্রাস্ফীতিও কমে না। ২০২৬ সালের নতুন নির্বাচিত সরকারকে এই ফাঁদ থেকে বের হতে হলে কেবল তাত্ত্বিক সংস্কার নয়, বরং কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হবে, যা ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কখনোই স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে না।

তৈরি পোশাক খাতের বিবর্তন ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতাকে জন এলকিংটনের ‘ট্রিপল বটম লাইন’ তত্ত্বের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা আবশ্যক। বর্তমান বিশ্ববাজারে কেবল মুনাফা অর্জনই যথেষ্ট নয়, বরং মানুষ এবং পৃথিবী বা পরিবেশের সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের পোশাক খাতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বছরপ্রতি ১.৫ থেকে ২ মিটার নিচে নেমে যাওয়া এবং উৎপাদন খরচ ৫ থেকে ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া নির্দেশ করে যে, দেশ পরিবেশগতভাবে অস্থিতিশীল একটি মডেল অনুসরণ করছে। এই সংকটকে বের্তিল ওহলিন এবং এলি হেকশারের ‘হেকশার-ওহলিন মডেলের’ সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে কেবল শ্রমের প্রাচুর্যের ওপর ভিত্তি করে সাপেক্ষ সুবিধা (কমপ্যারাটিভ অ্যাডভান্টেজ) আর বজায় রাখা যাচ্ছে না। লোহিত সাগরের অস্থিরতার কারণে লিড টাইম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি ৪.৪১ শতাংশ হ্রাস পাওয়া প্রমাণ করে যে, বিশ্ববাজার এখন ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ থেকে ‘সাসটেইনেবল ফ্যাশন’ বা ‘স্লো ফ্যাশন’-এর দিকে ঝুঁকছে। কার্ল পোলানির ‘ডাবল মুভমেন্ট’ তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন বাজারব্যবস্থা সমাজ ও পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে তখন সমাজ পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। বাংলাদেশের শ্রমিক অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের গ্রিন প্রোডাকশনের দাবি মূলত পোলানির বর্ণিত সেই সামাজিক সুরক্ষারই একটি অংশ। ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের পর ১২-১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই তত্ত্বীয় রূপান্তর অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইনের ‘বিশ্বব্যবস্থা তত্ত্ব’ এবং রবার্ট মুন্ডেলের ‘ইম্পসিবল ট্রিনিটি’ তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা যায়। আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের বিপরীতে যে কঠোর মুদ্রানীতি এবং ভর্তুকি কমানোর শর্তারোপ করা হয়েছে, তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সার্বভৌম অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ওপর উন্নত দেশগুলোর একধরনের নব্য-ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। বিখ্যাত ক্রিটিকস আন্দ্রেস ড্রেহারের মতে, ‘আইএমএফ কন্ডিশনালিটি’ অনেক সময় ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ তৈরি করে এবং প্রকৃত উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। অন্যদিকে মুন্ডেলের ‘ইম্পসিবল ট্রিনিটি’ অনুযায়ী, বাংলাদেশ একই সঙ্গে স্থির বিনিময় হার, মুক্ত মূলধন প্রবাহ এবং স্বাধীন মুদ্রানীতি বজায় রাখতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ধরে রাখতে গিয়ে ডলার ক্রয় করছে (২০২৬ অর্থবছরে ৩.৮৩ বিলিয়ন ডলার), যা বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিচ্ছে। এটি ‘ডাচ ডিজিজ’ তত্ত্বের একটি ভিন্নরূপ হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট খাতের (পোশাক রপ্তানি বা রেমিট্যান্স) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অন্যান্য শিল্প খাতের বিকাশকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। নতুন নির্বাচিত সরকারকে এই জটিল সমীকরণে এমন এক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, যাতে করে আন্তর্জাতিক শর্ত পূরণ করেও দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণের পথটি কেবল পরিসংখ্যানগত নয়, বরং এটি একটি নৈতিক এবং কাঠামোগত প্রশ্ন। জন রাওলসের ‘ন্যায়বিচার তত্ত্ব’ অনুসারে, একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই সার্থক হয়, যখন তা সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে হলে কেবল অবকাঠামো নয়, বরং ‘এন্ডোজেনাস গ্রোথ’ অর্জনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। রাউল প্রেবিশ ও হ্যান্স সিঙ্গারের ‘স্ট্রাকচারালিস্ট থিউরি’ অনুযায়ী, বাংলাদেশকে আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে, যাতে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা থেকে দেশীয় অর্থনীতি সুরক্ষিত থাকে। ইয়োহান গালটুংয়ের ‘কাঠামোগত সন্ত্রাস’ তত্ত্বের নিরিখে বলা যায়, যদি অর্থনৈতিক নীতিগুলো কেবল উচ্চবিত্তের অনুকূলে থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।

অমর্ত্য সেনের ‘উন্নয়ন স্বাধীনতা’ তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধি কেবল জিডিপির সংখ্যায় নয়, বরং মানুষের কাজ করার এবং সিদ্ধান্ত-সৃজনশীলতা সক্ষমতার মধ্যে নিহিত। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ৫৪ বছর ধরে ব্যর্থ নীতিনির্ধারকদের পুরনো ধ্যানধারণা ও অকার্যকর তত্ত্বীয় জ্ঞান ছুড়ে ফেলে প্রমাণিত ও পরীক্ষিত তত্ত্বীয় দর্শনগুলোকে বাস্তবে রূপান্তর করা, যেখানে আইনের শাসন, দুর্নীতি দমন, ব্যাংকিং সংস্কার ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠবে।


ড. মো. আইনুল ইসলাম

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা