× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তারেক রহমান

প্রত্যাশা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র পুনর্গঠন

ইফতেখার আলভী নিলয়

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৭ এএম

দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনের পর ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।

দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনের পর ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল না এটি ছিল রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার জন্য এক ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পার হলেও সেই প্রত্যাশিত গণতন্ত্র আজও পূর্ণাঙ্গ ও সুসংহত রূপ পায়নি।

ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, সংবিধান সংশোধিত হয়েছে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের কাঠামো কখনোই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুদৃঢ় হয়নি। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতার অভাব, প্রশাসনের রাজনীতিকীকরণ, বিচারব্যবস্থার প্রশ্নবিদ্ধ নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচনব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাহীনতা বারবার গণতন্ত্রকে সংকটে ফেলেছে।

এই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই একটি প্রকৃত, সুসংহত গণতন্ত্র গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা এদেশের আপামর জনগণের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন হয়ে উঠেছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রশ্ন আজ আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষত, বর্তমান রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনের পর ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ব্যক্তিগত বা দলীয় ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মোড়। এই প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ কাঠামো, গণতান্ত্রিক ধারার পুনর্গঠন এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

তারেক রহমানের ফিরে আসাকে কেবল বিএনপির ভেতরে ‘ঐতিহাসিক’ বলা হলেও বাস্তবে এর তাৎপর্য অনেক গভীর, বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতির মাঠে কার্যত অনুপস্থিত থাকা এক প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক ভাষ্য ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতি-প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের শূন্যতা কিংবা একমুখী ক্ষমতার চর্চা নতুন নয়। অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই দেখছেন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবনের সূচনা হিসেবে। তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে জনমনে যে স্বস্তি ও আশাবাদ তৈরি হয়েছে, তা দৃশ্যমানভাবে প্রকাশ পেয়েছে ঢাকার রাজপথে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে তার দেশে ফেরা উপলক্ষে রাজধানীতে যে জনজোয়ার সৃষ্টি হয়, তা ছিল রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল এক দৃশ্য। দেশের প্রায় প্রতিটি ইউনিট থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা ঢাকায় জড়ো হন প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানাতে।

বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে তারেক রহমান খালি পায়ে শিশিরভেজা ঘাসে দাঁড়িয়ে ১৭ বছর পর দেশের মাটিতে প্রথম স্পর্শ নেন। পরে পূর্বাচলের জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ের সংবর্ধনা মঞ্চে উঠেও তিনি রাজকীয় চেয়ার পরিহার করে একটি সাধারণ চেয়ারে বসেন। এই সাদাসিধা আচরণকে অনেকেই দেখেছেন তার রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন হিসেবে। ক্ষমতার জাঁকজমক নয়, বরং সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকার যে আকাঙ্ক্ষা, তা তার আচরণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তিনি ১৭ মিনিটের সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। এই বক্তব্যে তিনি কেবল রাজনৈতিক আশ্বাস দেননি; বরং একটি দিশা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ভাষণে তিনি স্পষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠে এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে নারী-পুরুষ, শিশু এবং সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমানভাবে নিরাপদে বসবাস করতে পারবে। এই অঙ্গীকার কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার ইঙ্গিত বহন করে। রাষ্ট্রতত্ত্বের ভাষায়, একটি রাষ্ট্র তখনই ন্যায়ভিত্তিক হয়, যখন সেখানে নাগরিকের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। তার বক্তব্যে সেই মানবিক রাষ্ট্রের ধারণাই নতুন করে সামনে এসেছে।

এই বক্তব্য এমন একসময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশ দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনামল, জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং ধারাবাহিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে।

আজ বাংলাদেশের রাজনীতি একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণাকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে। তার বক্তব্যে গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করার যে প্রয়াস দেখা যায়, তা রাজনৈতিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে হলো রাষ্ট্র কি কেবল ক্ষমতার কাঠামো টিকিয়ে রাখার যন্ত্র হিসেবে থাকবে, নাকি নাগরিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি নৈতিক ব্যবস্থায় রূপ নেবে? একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও উঠে আসে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কি আগের মতোই সংঘাতমুখী থাকবে, নাকি গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার দিকে অগ্রসর হবে?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারণা কখনোই সম্পূর্ণ প্রশ্নহীন ছিল না। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গণতন্ত্র কি শুধু ভোটের দিনে সক্রিয় থাকবে, নাকি তা রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত। তবে তারেক রহমানের দৃঢ়তা ও সুস্পষ্ট বার্তার কারণে আগামীর রাজনীতি যে নতুন করে গতি পাবে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যদি তার ঘোষিত ‘পরিকল্পনা’ বাস্তব রূপ পায়, তাহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র হতে পারে আরও সুসংহত এবং রাষ্ট্র হতে পারে ন্যায়ভিত্তিক।

তবে এই লক্ষ্য অর্জন কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য, সহনশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার মানসিকতা। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা ও নৈতিকতার চর্চা নিশ্চিত করাই হবে সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সন্ধিক্ষণে নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, দেশ গণতন্ত্রের পথে এগোবে, নাকি আবারও অনিশ্চয়তার চক্রে ফিরে যাবে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন সেই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াকে নতুন করে সক্রিয় করেছে। এখন সময় ইতিহাসের এই মুহূর্তকে দায়িত্বশীলতা, প্রজ্ঞা ও ঐক্যের মাধ্যমে কাজে লাগানোর।


ইফতেখার আলভী নিলয়

নৌপ্রকৌশলী ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা