× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্লেষণ

প্রেসিডেন্ট জিয়ার রাজনীতি

আমিরুল ইসলাম কাগজী

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫০ এএম

 প্রেসিডেন্ট জিয়ার রাজনীতি

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্পর্কে সিএসপি অফিসার জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী স্মৃতিচারণ করতে পারেন কারণ দুজন দুপর্বে একসঙ্গে অনেকদিন কাজ করেছেন সেই সুবাদে। প্রথমদিকে কাজ করেছেন ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর পিএস থাকার সুবাদে এবং পরবর্তীতে প্রথমে নোয়াখালীর ডিসি এবং সর্বশেষ চট্টগ্রামের ডিসি হিসেবে কাজ করার কারণে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গ্রামের কৃষকদের খোঁজখবর নিতে বেশ কয়েকবার নোয়াখালী জেলা সফর করেন। সে সময় জেলা প্রশাসক হিসেবে এই জিয়াউদ্দিন চৌধুরী প্রেসিডেন্ট জিয়াকে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতেন। তখন জেলা এবং থানা শহরে রাজনৈতিক নেতাকর্মী বলতে আওয়ামী লীগের প্রাধান্যই ছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়া তাদের মধ্য থেকেই দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী নেতা খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। আবার বাম ঘরানা এবং সাবেক মুসলিম লীগ কিংবা ডানপন্থী নেতাকর্মী, যাদের সঙ্গে আলোচনা হতো তাদেরকেও তিনি একটি স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। ফলে কট্টর আওয়ামী লীগের বাইরে যারা ছিলেন তারা প্রায় সবাই প্রেসিডেন্ট জিয়ার কর্মকাণ্ড এবং বক্তৃতা-বিবৃতি শুনে নতুন দলের প্রতি আকৃষ্ট হতেন। এভাবেই হাঁটিহাঁটি পা পা করে প্রেসিডেন্ট জিয়া একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এটাই ছিল সাবেক সিএসপি অফিসার জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ।

যুক্তিতর্ক আর মেধার খেলায় মেজর জিয়া কতটা পারঙ্গম ছিলেন তার হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছিলেন ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিবাহিনীর (এফ এফ) পাশাপাশি বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) গঠন নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএজি ওসমানীর মধ্যে একটি তিক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যার ফলশ্রুতিতে সর্বাধিনায়কের পদ থেকে পদত্যাগ করেন কর্নেল ওসমানী। সে সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গঠিত ১১টি সেক্টরের অধীনে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ওই মুক্তিবাহিনীতে ছিল ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, আনসার এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যগণ, যারা নিয়মিত বাহিনী হিসেবে কাজ করছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হয় সদ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্র-যুবকদের দল, যাদের একত্রে বলা হয় ফ্রিডম ফাইটার (এফএফ)। এর পাশাপাশি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (র) বিশেষ উপসংস্থার প্রধান জেনারেল উবান সিং-এর তত্ত্বাবধানে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)। কর্নেল এমএজি ওসমানীকে না জানিয়ে এই বাহিনী গঠন করা হয়। এটা নিয়েই দ্বন্দ্বের জেরে ওসমানী সাহেব পদ ত্যাগ করেন।

পদত্যাগের আগেই কর্নেল ওসমানী ৮ জুলাই কলকাতায় সেক্টরস কমান্ডারদের একটা মিটিং ডেকেছিলেন, যা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ১১ এবং ১২ জুলাই। সেক্টর কমান্ডারগণ কলকাতায় পৌঁছলে কর্নেল ওসমানীর পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কথা বলেন ক্যাপ্টেন ডালিম ও ক্যাপ্টেন নুর।

১১ জুলাই সেক্টর কমান্ডার্স সম্মেলন উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বক্তব্য দিতে গিয়ে কর্নেল ওসমানীর পদত্যাগের বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন ‘সেক্টর কমান্ডারদের অনাস্থাবশত কর্নেল ওসমানী পদত্যাগ দাখিল করেছেন।’ তখন কমান্ডারদের মধ্য থেকে কয়েকজন দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কর্নেল ওসমানীর ওপর কমান্ডারদের আস্থা নেইÑ এ কথা প্রধানমন্ত্রী কি করে জানলেন?’ প্রধানমন্ত্রী এই প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে না পারায় বাগ্‌বিতণ্ডার সৃষ্টি হয় এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সভা শেষ করতে হয়। পরে মেজর জিয়াউর রহমান অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।

মেজর জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যকার কথোপকথন :

মেজর জিয়া : আপনি কোন যুক্তির ভিত্তিতে সকালে আপনার বক্তব্যে বললেন সেক্টর কমান্ডারদের অনাস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কর্নেল ওসমানী পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

তাজউদ্দীন (কিছুটা বিব্রত) : তার কাছে খবর রয়েছে যে বেশকিছু কমান্ডার জনাব ওসমানীর ওপর অনাস্থা পোষণ করেছেন।

মেজর জিয়া : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই, শুধুমাত্র কমান্ডারদের তরফ থেকেই নয়, সমগ্র মুক্তি ফৌজের তরফ থেকে আমাদের পূর্ণ আস্থাই যে রয়েছে কর্নেল ওসমানীর ওপর মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তা নয়Ñ তিনি আমাদের অতি শ্রদ্ধার পাত্রও বটে। তার পরিবর্তে অন্য কাউকে যদি কমান্ডার ইন চিফ বানাবার চিন্তা-ভাবনা করে থাকেন, তবে বলতে বাধ্য হচ্ছি আমাদের বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধার কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারেন। প্রবাসী সরকারের হয়তো-বা ক্ষমতা থাকতে পারে, সরকার ইচ্ছামতো একজন সর্বাধিনায়ক নিয়োগ দিতে পারে কিন্তু তার পরিণতি কি হবে সেটাও একটু ভেবে দেখবেন।’ (জনাব নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ দুজনই মেজর জিয়ার কথা শুনে ভীষণভাবে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন।কিছুক্ষণ ভেবে তাজউদ্দীন সাহেব কথা বললেন।

তাজউদ্দীন : ওসমানী সাহেব স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন। তিনি সেটা প্রত্যাহার করলে সরকার পুনঃনিয়োগ সম্পর্কে বিবেচনা করতে পারে।

মেজর জিয়া : তিনি স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিয়েছেন সেটা ঠিক। কিন্তু সম্মেলনে আপনি যে কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন সেটা সত্য নয়। কী কারণে তিনি পদত্যাগপত্র সরকারকে স্বেচ্ছায় দিয়েছেন সেটা আমরা অবশ্যই শুনব তার কাছ থেকেই। আমাদের অনুরোধ কাল সম্মেলনে আপনি বলবেন, আপনার কাছে যে খবর এসেছিল কিছু কমান্ডারের অনাস্থার ব্যাপারে সেটা তদন্তে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, আপনি আরও বলবেন উপস্থিত সব কমান্ডার এবং সমগ্র মুক্তি ফৌজের দাবি একমাত্র কর্নেল ওসমানী থাকবেন কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে। অন্য কেউ নয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে সবার তরফ থেকে আপনি স্বয়ং তাকে তার ইস্তফা প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাবেন এবং একমাত্র সেই ক্ষেত্রেই তিনি তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করবেন।

কথার ধরন দেখে বুদ্ধিমান তাজউদ্দীন আহমদ বুঝে নিলেন মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডাররা ইতোমধ্যে অনেক কিছুই জেনে গেছেন। পর্দার অন্তরালে পাশা খেলার চালগুলো সম্পর্কেও হয়তো-বা অনেকেই অবগত হয়ে পড়েছেন। তাই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে না পড়ার জন্য মেজর জিয়ার অনুরোধ মেনে নিতে রাজি হলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। পুরো মিটিংয়ে নীরব সাক্ষী হয়ে নিশ্চুপ বসেছিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

পরদিন কথামতো কাজ করলেন প্রধানমন্ত্রী। তার অনুরোধে কর্নেল ওসমানী তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে সম্মেলনের নেতৃত্ব দেওয়ার স্বীকৃতি জানালে করতালির মাধ্যমে উপস্থিত সবাই কর্নেল ওসমানীর সিদ্ধান্তকে আন্তরিক অভিনন্দন জানালেন। কর্নেল ওসমানীর নেতৃত্বে শুরু হলো সম্মেলন।

ওই সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ রব বাংলাদেশ মুক্তিফৌজের চিফ অব স্টাফ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার ডেপুটি চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন।’

মেজর জিয়ার উদ্যোগে প্রবাসী সরকারপ্রধান এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তিতে সেক্টর কমান্ডারগণ তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। মেজর জিয়া কেবল রণাঙ্গনের একজন দক্ষ সেনানায়ক নন, দেশ গঠনে রেখেছেন অনন্য সাধারণ ভূমিকা। তিনি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে জানতেন, স্বপ্ন দেখাতে পারতেন। তার কথায় কৃষক-শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীÑ সবাই দেশ গঠনে এগিয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াকে ভালোবেসেই মানুষ নতুন উদ্যমে দেশ গঠনের কাজে নিয়োজিত হয়েছে, যার কারণে তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব-দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। দেশের আপামর মানুষ তাকে কেমন ভালোবাসত তার নজির আমরা দেখেছি তার শেষ বিদায়ের দিনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর বিশাল জানাজায়।


আমিরুল ইসলাম কাগজী

সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা