× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উচ্চ মূল্যস্ফীতি

মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় অপরিহার্য

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৪ এএম

দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবার এ কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে উচ্চ সুদ হারের কারণে ব্যবসা ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তারা বেশি চাপে পড়েছেন। এতে দেশের অর্থনীতির ভিত কাঁপাচ্ছে, মানুষের নিদারুণ কষ্ট বাড়াচ্ছে এক অদ্ভুত সংকট।

সম্প্রতি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তথ্যে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে। গত দুই-তিন বছর ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এর ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। পক্ষান্তরে মজুরি না বাড়ায় অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। গ্রাম-শহর উভয় জায়গাতেই আয়বৈষম্য আরও চোখে পড়ার মতো। শহরে ভিক্ষুকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে, যা সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্বলতার ছবি। সাধারণ মানুষের আয়ের বৃদ্ধি এবং ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে যেহেতু সঠিক সামঞ্জস্য নেই, তাই মানুষকে প্রতিদিনের বাজার থেকেই বেঁচে থাকার সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে উঠছে। 

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বরে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮.৪৯ শতাংশ। এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশের দেশ ভারতে মূল্যস্ফীতির হার এখন দশমিক ২৫ শতাংশ। দেউলিয়া অর্থনীতি থেকে ফিরে আসা শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ১ শতাংশ। জেন-জির বিক্ষোভে নেপালে ওলি সরকারের পতন ঘটলে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেয় একটি অন্তর্বর্তী সরকার। এর প্রভাবও আছে মূল্যস্ফীতিতে। দেশটির অন্তর্বর্তী সরকারের সামগ্রিক প্রচেষ্টায় এই হার ১ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। মূল্যস্ফীতিতে পাকিস্তানই এখন বাংলাদেশের কাছাকাছি। দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এর বাইরে ভুটান ও মালদ্বীপের মূল্যস্ফীতির হার যথাক্রমে ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বলাবাহুল্য, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক দফা নীতি সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু তা কোনো সুফল বয়ে আনেনি। 

এমনকি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বেশকিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক-কর কমিয়ে বাজারের আমদানিপ্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করে। এতসব উদ্যোগের পরও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি মূল্যস্ফীতি। 

বলতে দ্বিধা নেই, মূল্যস্ফীতিÑ এই একটি শব্দ আজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে যেন নিত্যসঙ্গী এক আতঙ্কের নাম। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে বিছানায় যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে মানুষকে হিসাব কষে চলতে হচ্ছেÑ কোথায় খরচ কমানো যায়, কী বাদ দেওয়া যায়, কোন চাহিদাকে বিলাসিতা হিসেবে ত্যাগ করা যায়। অথচ কয়েক বছর আগেও যেগুলো ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয়, আজ সেগুলোই অনেক পরিবারের কাছে হয়ে উঠছে স্বপ্নের মতো দূরের। 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে ৯ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক সময় ১০ শতাংশেরও বেশি ছিল। উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি একটি উচ্চমাত্রার মূল্যস্ফীতি, যা সরাসরি দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে আঘাত করে। মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপটা পড়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর। এই শ্রেণির মানুষ সাধারণত কোনো সরকারি সহায়তার আওতায় পড়ে না, আবার খুব দরিদ্র হওয়ায় সামাজিক সহানুভূতিও পান না। মাসের শুরুতেই বেতন হাতে পেয়ে তারা জানেনÑ এই টাকা মাস শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যাবে। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল, সন্তানের স্কুল ফি, কোচিং খরচ, যাতায়াত ব্যয়Ñ সব মিলিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে সঞ্চয় তো দূরের কথা, অনেক পরিবার ঋণের ফাঁদে পড়ছে। বিবিএস-এর সর্বশেষ পারিবারিক আয় ও ব্যয় জরিপ বলছে, দেশের একটি বড় অংশের মানুষের মাসিক গড় আয় ১৫-২০ হাজার টাকার মধ্যে। অথচ শহরাঞ্চলে একটি চার সদস্যের পরিবারের ন্যূনতম মাসিক ব্যয়ই ২৫-৩০ হাজার টাকার নিচে নামছে না। এই ব্যবধান পূরণ করতে গিয়ে পরিবারগুলো বাধ্য হচ্ছেÑ সঞ্চয় ভাঙাতে, ঋণ নিতে কিংবা খাদ্য ও স্বাস্থ্য ব্যয় কমাতে। 

অনেকে মনে করেন মূল্যস্ফীতির চাপ শহরকেন্দ্রিক, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। গ্রামেও নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, কৃষি উপকরণের খরচ বেড়েছে, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে। কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলেও বাজারে ভোক্তা-দামে তেমন স্বস্তি নেই। ফলে উৎপাদক ও ভোক্তাÑ দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। তথ্য বলছে বাড়িভাড়া, পরিবহন ও খাদ্যব্যয় একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ শহর ছেড়ে বস্তি বা শহরতলিতে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এতে শহরের সামাজিক ভারসাম্য ও শ্রমবাজারেও প্রভাব পড়ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ পরিবারে সবচেয়ে বেশি পড়ে নারীদের ওপর। সংসার সামলানোর দায়িত্বে থাকা নারীরা প্রতিদিনই হিসাব কষছেনÑ কীভাবে কম খরচে রান্না করা যায়, কীভাবে সন্তানদের চাহিদা সামাল দেওয়া যায়। 

আমি মনে করি, মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মূল্যস্ফীতির এই চাপ মোকাবিলা করা মানে শুধু অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা নয়, বরং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষা করা। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ একা লড়াই করে টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো। সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে হলে সরকারের করণীয় হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, সমন্বিত এবং দ্রুত কার্যকরযোগ্য। মূল্যস্ফীতি কেবল বাজারের সমস্যা নয়; এটি সরবরাহ, নীতি, রাজস্ব ও সামাজিক সুরক্ষার সম্মিলিত চ্যালেঞ্জ। তাই একক কোনো পদক্ষেপে নয়, বরং বহুমুখী উদ্যোগেই এই চাপ কমানো সম্ভব।

প্রথমত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। চাল, তেল, ডাল, পেঁয়াজ, চিনিÑ এসব পণ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা দাম বাড়ায়, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু অভিযান নয়, বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল মনিটরিং, মজুদ তথ্য প্রকাশ এবং সরবরাহ চেইন ট্র্যাকিং জোরদার করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সরবরাহ বাড়ানো ও আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যে সময়মতো আমদানি নিশ্চিত না হলে বাজার অস্থির হয়। শুল্ক ও কর কাঠামো সাময়িকভাবে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে এনে নিত্যপণ্যের দাম কমানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে কৃষক ও উৎপাদকদের প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে আমদানি-নির্ভরতা কমে। তৃতীয়ত, কৃষি খাতে ব্যয় কমানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সার, বীজ, সেচ ও ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখলে উৎপাদন খরচ কমবে, যা সরাসরি বাজার-দামে প্রতিফলিত হবে।  চতুর্থত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। বর্তমান ভাতা ও সহায়তার অঙ্ক অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব ব্যয়ের তুলনায় অপ্রতুল। মূল্যস্ফীতির হার অনুযায়ী ভাতা সমন্বয় এবং উপকারভোগী নির্বাচন আরও লক্ষ্যভিত্তিক করলে নিম্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যবিত্ত শ্রেণি কিছুটা স্বস্তি পাবে। পঞ্চমত, মজুরি ও বেতন কাঠামোতে বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। 

এ ছাড়া মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় অপরিহার্য। অতিরিক্ত ঋণ সম্প্রসারণ বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দেয়। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের মধ্যে সমন্বিত নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্য আনতে হবে, যাতে একদিকে বাজার স্থিতিশীল থাকে, অন্যদিকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

পরিশেষে বলব, মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো শুধু অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বও। সাধারণ মানুষের জীবনযাপন যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন সরকারের সক্রিয় ও মানবিক ভূমিকা অনিবার্য। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক নীতি, দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এই চাপ থেকে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া সম্ভব। কারণ মানুষ চায় ভাত-কাপড়। মানুষ চায় নিরাপত্তা, মানুষ চায় একটু স্বস্তির জীবন। 

সাম্প্রতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ গড় মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কিছু অগ্রগতি দেখালেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পিছিয়ে যাচ্ছে। এই সত্য মেনে আমাদেরকে সংশ্লিষ্ট সকল ক্ষেত্রেই আরও কঠোর, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল হতে হবে। মনে রাখা দরকার, অর্থনীতি শুধু নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবনের মান নির্ধারণেরও বিষয়। তাই মানুষের জীবনকে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে উচ্চ মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এই ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে সংকট শুধু আজকের সুসময়ের দিকে আঘাত করবে নাÑ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নকেও বিপন্ন করবে।



মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল

কলাম লেখক ও শিল্প-উদ্যোক্তা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা