× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিআইপির গোলটেবিল আলোচনা

প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নের ফাঁদ কেটে বেরোতে হবে

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৯ এএম

 প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নের ফাঁদ কেটে বেরোতে হবে

২০৫০ সালের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যায় আরও তিন-চার কোটি মানুষ যুক্ত হবে। একই সময়ে অর্থনীতির আকারও বাড়বে বহুগুণে। কিন্তু উন্নয়ননির্ভরতায় যদি এভাবে প্রকল্পভিত্তিক ও বিচ্ছিন্নতা চলতে থাকে, তাহলে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকট আরও গভীর হবে। এমন এক বাস্তবতায়, উন্নয়ন পরিকল্পনার সংকট, সমন্বয়ের অভাব এবং প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন ধারা থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টি সামনে আসছে। এ কথা সত্য যে, স্বাধীনতার দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে দেশে কোনো জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

১৮ জানুয়ারি, রবিবার রাজধানীর সিক্স সিজনস হোটেলে ‘রাজনৈতিক চর্চায় পরিকল্পিত নগরায়ণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বিষয়টি তুলে ধরেন। তারা দেশকে প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নের ধারা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) আয়োজিত এই আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরাও একমত হন যে, পরিকল্পিত নগরায়ণ ছাড়া বাসযোগ্য শহর এবং টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বক্তারা পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনা, সাধারণ সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং নারী ও শিশুবান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিতের গুরুত্ব দেন। সকলেই একমত হন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ও অঙ্গীকার স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, গত দুই দশকে বাংলাদেশে উন্নয়নের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তার কেন্দ্রে ছিল বড় বড় প্রকল্প। মেগাপ্রকল্প, মাইলফলক প্রকল্প, স্বপ্নের প্রকল্পÑ এমন নানা নামে এসব উদ্যোগকে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। অবকাঠামো দৃশ্যমান হয়েছে, সেতু হয়েছে, ফ্লাইওভার হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন কি মানুষের জীবনমানের টেকসই পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পেরেছে, নাকি দেশকে ধীরে ধীরে একটি গভীর ফাঁদের দিকে ঠেলে দিয়েছে?

প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়নের বড় সমস্যা হলো, এখানে উন্নয়নের লক্ষ্য মানুষের প্রয়োজন নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়ন নিজেই হয়ে ওঠে মূল উদ্দেশ্য। একটি প্রকল্প অনুমোদন, বরাদ্দ, বাস্তবায়ন ও উদ্বোধনের মধ্যেই সাফল্য মাপা হয়। কিন্তু প্রকল্প শেষে কী হলোÑ মানুষের আয় বাড়ল কি না, কর্মসংস্থান টেকসই হলো কি না, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হলো কি নাÑ এসব প্রশ্ন প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। ফলে কাগজে-কলমে উন্নয়ন হলেও বাস্তবে বৈষম্য, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।

আরও উদ্বেগজনক দিক হলো, প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন দুর্নীতির উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। ব্যয় বাড়ানো, নকশা পরিবর্তন, সময় বাড়ানোর নামে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হয়। জনগণের করের টাকা ও বিদেশি ঋণের অর্থ প্রকল্পে ঢাললেও তার প্রকৃত সুফল সীমিত গোষ্ঠীর হাতে আটকে পড়ে। প্রকল্প শেষ হয়, কিন্তু ঋণের বোঝা থেকে যায়, যা পরিশোধ করতে হয় সাধারণ মানুষকে কর ও মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে।

আসলে এই উন্নয়ন মডেল রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারকেও বিকৃত করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষার মতো মানবিক খাতগুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না, কারণ এসব খাতে বড় উদ্বোধন বা দৃশ্যমান ফলাফল দেখানো কঠিন। অথচ একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে দক্ষ মানবসম্পদ, সুস্বাস্থ্য ও ন্যায়ভিত্তিক সুযোগের ওপর। কংক্রিটের কাঠামো যতই উঁচু হোক, ভেতরে যদি সক্ষম মানুষ না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না।

প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নের আরেকটি ফাঁদ হলো কেন্দ্রিকতা। অধিকাংশ বড় প্রকল্প রাজধানী বা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়। গ্রাম, প্রত্যন্ত অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বঞ্চিত থেকে যায়। ফলে আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়ে, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন তীব্র হয়, শহরে চাপ বাড়ে এবং সামাজিক সংকট গভীরতর হয়।

আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতি থেকে বেরোতে হলে উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। উন্নয়ন মানে কেবল প্রকল্প নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি। বাজেট পরিকল্পনায় প্রকল্পের সংখ্যা নয়, ফলাফলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে তৃণমূলভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। প্রতিটি প্রকল্পের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। বড় প্রকল্প নয়, বরং ছোট কিন্তু কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নকে সামনে আনতে হবে।

দেশের মানুষের সামনে এখন দুটি পথÑ কংক্রিট ও ঋণনির্ভর উন্নয়ন নাকি মানুষকেন্দ্রিক টেকসই উন্নয়ন। আমরা মনে করি, লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্বিতীয়টি। কারণ ঋণনির্ভর প্রকল্পের উন্নয়নের ফাঁদ কেটে বেরোতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে দেওয়া হবেÑ দেনার বোঝা ও অসম সমাজ। তাই সময় এসেছে উন্নয়নের অর্থ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করারÑ যেখানে মানুষই হবে মূল প্রকল্প। আমরা চাই, প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নের ফাঁদ কেটে জাতি বের হয়ে আসুক।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা