× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্লেষণ

প্রেসিডেন্ট জিয়ার রাজনীতি

আমিরুল ইসলাম কাগজী

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৭ এএম

প্রেসিডেন্ট জিয়ার রাজনীতি

দৈনিক বাংলার ১৯৮১ সালের জুন সংখ্যায় একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন পত্রিকার তৎকালীন সিনিয়র রিপোর্টার মরহুম আব্দুল খালেক। শিরোনাম ছিল ‘যিনি ছিলেন কিষানের জীবনের শরিক’। লেখার মালমসলা তিনি আবার ধার করেছেন ওই পত্রিকারই আরেকজন রিপোর্টার, যিনি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সফরসঙ্গী হয়ে গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে ঘুরে ঘুরে রিপোর্ট করেছেন। তিনি হলেন হেদায়েত হোসাইন মোর্শেদ। সেইসব রিপোর্ট এক সুতায় গেঁথে তিনি রচনা করেছেন একখানা গ্রন্থ যার নাম ‘একজন জিয়া’। গ্রন্থের শিরোনামটা খুব আকর্ষণীয়। শুধু শিরোনাম নয়, গোটা গ্রন্থখানি পড়লে পরে বোঝা যায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কীভাবে গ্রামের মাঠেময়দানে হেঁটে হেঁটে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। যে কারণে তিনি আজও মানুষের কাছে এত জনপ্রিয়, তার রাজনীতি এত জনবান্ধব। সাংবাদিক হেদায়েত হোসেন মোর্শেদ তার গ্রন্থের একটি অংশে লিখেছেন,

এক.

‘কৃষকের মনের কথা জানতে, তাদের হাঁড়ির খবর জানতে প্রেসিডেন্ট জিয়া গ্রামেগঞ্জে মেঠোপথ ধরে হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল। কখনও ধানক্ষেতের আইল ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় মিশে গেছেন কৃষকের সাথে। প্রেসিডেন্ট জিয়া মনে করতেন, গ্রামের একজন সাধারণ কৃষকের কাছে সবচেয়ে প্রিয় প্রসঙ্গ তার ফসলের মাঠ, হালের গরু, ফলের গাছ, পুকুরের মাছ, খালের পানি, মোটা কাপড়, আর গামছা ইত্যাদি। আমি এসবেরই খোঁজ করি। যদি বলেন এটা আমার রাজনীতি, অস্বীকার করব না। আমি যেন এই প্রিয় প্রসঙ্গের রাজনীতি করে যেতে পারি সেই দোয়া করবেন।

ঘটনাটি ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ের। প্রেসিডেন্ট জিয়া সে বছর অনুষ্ঠিত রেফারেন্ডামের আগে দেশব্যাপী ব্যাপক গণসংযোগ সফর করছেন। ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তÑ এমনকি সন্ধ্যার পরও প্রেসিডেন্ট জিয়া দিনে ৩০ থেকে ৩৫টি জনসভায় বক্তৃতা করতেন। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার পথে অনেক অনির্ধারিত পথসভায়ও বক্তৃতা করেছেন।

এই গণসংযোগ সফরের সময় একবার বগুড়া থেকে তিনি পাবনা যাচ্ছিলেন। সঙ্গে বহু সফরসঙ্গী। প্রেসিডেন্ট নিজ হাতে জিপ ড্রাইভ করছেন। পরনে সাফারি। চোখে সানগ্লাস। মাথায় ফেলটেড ক্যাপ। সুদীর্ঘ পথ অতিক্রমকালে এক জায়গায় মোটর থামিয়ে নেমে পড়লেন। ঢুকে পড়েন গ্রামে। একটি পুরনো দীঘির পাড়ে বিরাট কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে পড়লেন হাত-পা ছড়িয়ে । চৈত্রের খর দুপুর খাঁখাঁ রোদ। জুতা, মোজা খুললেন। সাফারির বোতাম দিলেন খুলে। মাথার টুপি আর সানগ্লাস খুলে রাখলেন পাশে। তারপর দীঘির কালো জলে অনেকক্ষণ হাতমুখ ধুলেন। গলার রুপোর চেনের ছোট্ট কুরআনশরিফের লকেটটি খুলে দীঘির শানবাঁধানো ঘাটে রাখলেন। ইতোমধ্যে সারা গাঁয়ের মানুষ ভেঙে পড়েছে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে একনজর দেখতে।

প্রেসিডেন্ট জিয়া উঠে দাঁড়ালেন। হাসতে হাসতে মিশে গেলেন গ্রামবাসীর ভিড়ে। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছেন এক কৃষকের বাড়িতে। আঙিনায় পা দিয়ে বললেন, ‘এই বাড়ির মালিক কারা? গেরস্তরা এসে দাঁড়ালেন প্রেসিডেন্টের সামনে। কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, ‘কই আপনার উঠোনে তো হাঁসমুরগি দেখছি না। ঘরে কয়টা ডিম আছে? আনেন দেখি।’ বাড়ির মালিক তখন কাঁচুমাচু করছিলেন। প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘হাঁস-মুরগি পালছেন না কেন? আপনার তো উঠোনভর্তি মুরগি থাকার কথা। বাড়িতে গাছগাছড়া নেই কেন? তরিতরকারি, গাছগাছড়া কোথায়?’ গেরস্তের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পিছনে বাধা গরুর কাছে গিয়ে বললেন, ‘গরুর স্বাস্থ্য এত হাড়জিরজিরে কেন? ছাগল-বকরিও তো দেখছি না। আমি তো আপনার মেহমান। ডিম নেই, ফলের গাছ নেই, ডাবগাছ নেই, পেঁপেগাছ নেই, এখন আমাকে কি খেতে দেবেন?’ তিনি বলেন, ‘আপনারা হাঁস-মুরগি পালন করুন, পতিত জায়গা চাষ করুন, হাজামজা পুকুর পরিষ্কার করে মাছের চাষ করুনÑ তাহলে নিজের যেমন উন্নতি হবে তেমনি দেশের উন্নতি হবে।’

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। রাস্তাঘাট, কলকারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান সবখানেই হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের আলামত। সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে সংগ্রামী মানুষের জেগে ওঠার প্রাণান্ত চেষ্টা। জিয়াউর রহমান তখন উপপ্রধান সেনাপতি। সেনানিবাসগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ, বলতে গেলে বসবাসের অযোগ্য। সৈনিকদের জন্য নেই কোনো পোশাক। নেই থাকার তেমন সুব্যবস্থা। এসব দেখে বসে থাকতে পারেননি জিয়াউর রহমান। তিনি অর্থের জোগান পাওয়ার জন্য কীভাবে সরকারি দপ্তরে যাওয়া-আসা করতেন তার একটা সাক্ষ্য দিয়েছেন সে সময়কার ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী এইচএম কামরুজ্জামানের পিএস জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী।’

সাংবাদিক হেদায়েত হোসেন মোর্শেদ লিখেছেন,

দুই.

‘জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময়ে, যখন আমি ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী এএইচএম কামরুজ্জামান সাহেবের একান্ত সচিব। জিয়াউর রহমান তখন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান। তিনি প্রায়ই কামরুজ্জামান সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন যুদ্ধবিধ্বস্ত সেনানিবাসগুলোতে ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করার জন্য তদবির করতে। জিয়াউর রহমানের আমন্ত্রণে কামরুজ্জামান সাহেব কয়েকবার ঢাকা সেনানিবাসে গিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান সচিবালয়ে এলেই আমার সঙ্গে দেখা হতো, বিশেষ করে, মন্ত্রীর অপেক্ষায় আমার কক্ষে এসে বসে থাকতেন। মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে সাধারণত আসতেন সংসদ সদস্য বা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। মেজর জেনারেল জিয়া এক ব্যতিক্রমী সাক্ষাৎপ্রার্থী ছিলেন। তখনকার দিনে মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের বিষয়টি সরকারি রীতি বা রেওয়াজের সঙ্গে মিল রেখে চলত না। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর উপপ্রধান বলে মন্ত্রী যে তার সঙ্গে দেখা করবেন না সেটা কোনো কারণ ছিল না। তবে আর একটি কারণ ছিল যে কামরুজ্জামান জিয়াউর রহমানকে খুব পছন্দ করতেন। তাদের ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন জিয়াউর রহমান একটি সেক্টরের কমান্ডার আর কামরুজ্জামান ছিলেন প্রবাসী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কামরুজ্জামান নিজে আমাকে একবার বলেছিলেন যে জিয়াউর রহমানের ওপর অন্যায় করা হয়েছে তাকে সেনাপ্রধান না করে।’

ঘটনাটি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়। মেজর জিয়া তখন জেড ফোর্সের ব্রিগেড কমান্ডার। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর রণাঙ্গনের অবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য তিনি মাঝেমধ্যে লঞ্চ নিয়ে খোঁজখবর নিতেন। একদিন তার লঞ্চ যখন রৌমারী এলাকা যাচ্ছিল তখন নদীর ধারে একটি স্কুলের মাঠে বেশ কিছু তরুণ যুবককে তিনি পিটি করতে দেখেন। সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন শাফায়েত জামিল। মেজর জিয়া তাকে লঞ্চ থামাতে বললেন। শাফায়াত জামিল লঞ্চ থামিয়ে মেজর জিয়াকে নিয়ে তাদের সাথে কথা বলিয়ে দিলেন। সেই ঘটনা সম্পর্কে শাফায়াত জামিল বলেন,

তিন.

‘একদিন লঞ্চে করে মেজর জিয়াকে নিয়ে মুক্ত অঞ্চল পরিদর্শনে যাচ্ছি। হঠাৎ নদীর তীরের একটি অদ্ভুত দৃশ্যের প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো আমাদের। নদীর পাড়ে একটি খোলা মাঠের মধ্যে বেশ কিছু কিশোর তরুণ পিটি করছে। তাদের সংখ্যা অন্তত পাঁচ ছয়শ হবে। এরকম কোনো ক্যাম্পের খবর আমাদের জানা ছিল না। মেজর জিয়া বললেন, লঞ্চ থামাতে বলো। এরা কে, উদ্দেশ্যই বা কি একটু খোঁজখবর নেওয়া দরকার।

লঞ্চ থামিয়ে আমরা তীরে নামলাম। একজন মাঝবয়সি লোক পিটি পরিচালনা করছেন। জিজ্ঞেস করে জানা গেল তিনি একজন স্কুল শিক্ষক। এই তরুণদের শরীরচর্চা করাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তোলার লক্ষ্যে। ছেলেগুলোর চেহারা মলিন। শিক্ষকটির কাছে শুনলাম ক’দিন ধরে একপেট আধপেট খেয়ে পিটি করছে ওরা। তবুও কারও মুখে টুঁ শব্দটি নাই। এদের অদম্য মনোবল আর দেশাত্মবোধের পরিচয় পেয়ে চমৎকৃত হলাম। জিয়া আমাকে বললেন, ‘শাফায়াত তোমাদের তো অনেক সময় বাড়তি রেশন টেশন থাকে মাঝেমধ্যে এদের জন্য কিছু পাঠিয়ে দিও।’ এই হলো তরুণ মেজর জিয়ার মানবিক মূল্যবোধ।

দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অনেক সময় পরিবারের প্রতি নজর দিতে পারতেন না। সারাক্ষণ কাজ আর কাজ। কাজপাগল জিয়াউর রহমান কেবলমাত্র দায়িত্ববোধ এবং কাজের কারণে স্ত্রী-পুত্রদের দিকে তেমন খেয়াল রাখতে পারতেন না, যার অনেক ঘটনার সাক্ষী সাবেক সিএসপি অফিসার জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী। পরিবারের প্রতি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এমন একটি অবহেলাজনিত ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন তিনি । তার বর্ণনা এমন,

চার.

‘আমাদের অবাক করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া তার চট্টগ্রাম সফরে সঙ্গে নিয়ে আসেন তার স্ত্রী আর দুই ছেলেকে। প্রেসিডেন্ট তার পরিবারকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রেখে চলে যান পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্দেশে। তিনি তার পরিবারকে কেনই-বা সঙ্গে করে আনলেন আর কেনই-বা এখানে রেখে গেলেন, বুঝতে পারছিলাম না। যা-ই হোক, প্রেসিডেন্ট চলে গেলে আমি আমার অফিসারদের তাদের ভালোভাবে দেখভাল করতে বলে যে-ই অফিসের দিকে যাচ্ছি, অমনি একজন কর্মচারী এসে বলল যে, ওপর থেকে বেগম জিয়া আমাকে ডাকছেন।

আমি ওপরে গেলে বেগম জিয়া খুব মৃদুস্বরে বললেন, ভাই, উনি (মানে প্রেসিডেন্ট) তো আমাদের চট্টগ্রাম দেখাবেন বলে নিয়ে এলেন আর কিছু না বলেই চলে গেলেন। এখন দেখেন ছেলে দুটির স্কুল ছুটি, তাদের নিয়ে এসে এখানে এখন কি করি। শুনেছি, এখানে কাছেই আছে কাপ্তাই লেক। সেখানে কি আমাদের ঘোরার একটু বন্দোবস্ত করে দিতে পারেন?

আমি বেগম জিয়ার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম। প্রেসিডেন্টের স্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করছেন তার আর তার ছেলে দুটির বেড়ানোর বন্দোবস্ত করে দিতে পারি কি না! প্রেসিডেন্ট কেন, বাংলাদেশের যেকোনো মন্ত্রী বা সচিবের স্ত্রীরাও তাদের কর্তাদের অধীন কর্মচারীদের যেকোনো আদেশ দিলে তারা সে আদেশ বা অনুরোধ রক্ষা না করে পারেন না। আমি তাকে শুধু বললাম যে, আমাকে এক ঘণ্টা সময় দিতে। এর মধ্যেই আমি তাদের কাপ্তাই লেক ভ্রমণের বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি। নিচে নেমেই আমি আমার পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে ফোন করলাম, যাদের কাপ্তাই লেকে একটি বড় লঞ্চ আছে , প্রেসিডেন্টের পরিবারের জন্য সেটা তৈরি রাখতে। কাপ্তাই লেকে অবস্থিত ওয়াপদার রেস্ট হাউসে তাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করলাম। আমার স্ত্রীকে সার্কিট হাউসে এসে বেগম জিয়ার সঙ্গী হতে বললাম। কিছু পরে আমার স্ত্রীর সমভিব্যাহারে বেগম জিয়া ও তার দুই ছেলেকে কাপ্তাই পাঠিয়ে দিয়ে অফিসের কাজে এলাম। আমার ধারণা ছিল যে প্রেসিডেন্ট জিয়া সন্ধ্যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরে আসবেন। কিন্তু তিনি ফিরে এলেন বিকালে। এসে যখন দেখলেন তার স্ত্রী সন্তানেরা নেই, বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে বেয়ারাদের জিজ্ঞেস করলেন। তারা যখন বলল যে, তারা কাপ্তাই গিয়েছেন, তখন তিনি প্রশ্ন করেন, কে তাদের পাঠাল। উত্তরে স্বাভাবিকভাবেই তারা আমার কথা বললে তিনি আর কিছু বলেননি। আমি এ কথা শুনে ভাবলাম যে প্রেসিডেন্ট হয়তো আমার ওপর ক্ষেপে যাবেন। কিন্তু পরে তিনি এ নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন তোলেননি। বেগম জিয়া সন্ধ্যার আগেই ছেলেদের নিয়ে সার্কিট হাউসে ফিরে আসেন।’

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্পর্কে সিএসপি অফিসার জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী স্মৃতিচারণ করতে পারেন কারণ দুজন দুপর্বে একসঙ্গে অনেকদিন কাজ করেছেন সেই সুবাদে। প্রথমদিকে কাজ করেছেন ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর পিএস থাকার সুবাদে এবং পরবর্তীতে প্রথমে নোয়াখালীর ডিসি এবং সর্বশেষ চট্টগ্রামের ডিসি হিসেবে কাজ করার কারণে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গ্রামের কৃষকদের খোঁজখবর নিতে বেশ কয়েকবার নোয়াখালী জেলা সফর করেন। সে সময় জেলা প্রশাসক হিসেবে এই জিয়াউদ্দিন চৌধুরী প্রেসিডেন্ট জিয়াকে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতেন। তখন জেলা এবং থানা শহরে রাজনৈতিক নেতাকর্মী বলতে আওয়ামী লীগের প্রাধান্যই ছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়া তাদের মধ্য থেকেই দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী নেতা খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। আবার বাম ঘরানা এবং সাবেক মুসলিম লীগ কিংবা ডানপন্থী নেতাকর্মী, যাদের সঙ্গে আলোচনা হতো তাদেরকেও তিনি একটি স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। ফলে কট্টর আওয়ামী লীগের বাইরে যারা ছিলেন তারা প্রায় সবাই প্রেসিডেন্ট জিয়ার কর্মকাণ্ড এবং বক্তৃতা-বিবৃতি শুনে নতুন দলের প্রতি আকৃষ্ট হতেন। এভাবেই হাঁটিহাঁটি পা পা করে প্রেসিডেন্ট জিয়া একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এটাই ছিল সাবেক সিএসপি অফিসার জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ।

পাঁচ.

যুক্তিতর্ক আর মেধার খেলায় মেজর জিয়া কতটা পারঙ্গম ছিলেন তার হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছিলেন ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিবাহিনীর (এফ এফ) পাশাপাশি বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) গঠন নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএজি ওসমানীর মধ্যে একটি তিক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যার ফলশ্রুতিতে সর্বাধিনায়কের পদ থেকে পদত্যাগ করেন কর্নেল ওসমানী। সে সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গঠিত ১১টি সেক্টরের অধীনে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ওই মুক্তিবাহিনীতে ছিল ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, আনসার এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যগণ, যারা নিয়মিত বাহিনী হিসেবে কাজ করছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হয় সদ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্র-যুবকদের দল, যাদের একত্রে বলা হয় ফ্রিডম ফাইটার (এফএফ)। এর পাশাপাশি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (র) বিশেষ উপসংস্থার প্রধান জেনারেল উবান সিং-এর তত্ত্বাবধানে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)। কর্নেল এমএজি ওসমানীকে না জানিয়ে এই বাহিনী গঠন করা হয়। এটা নিয়েই দ্বন্দ্বের জেরে ওসমানী সাহেব পদ ত্যাগ করেন।

পদত্যাগের আগেই কর্নেল ওসমানী ৮ জুলাই কলকাতায় সেক্টরস কমান্ডারদের একটা মিটিং ডেকেছিলেন, যা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ১১ এবং ১২ জুলাই। সেক্টর কমান্ডারগণ কলকাতায় পৌঁছলে কর্নেল ওসমানীর পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কথা বলেন ক্যাপ্টেন ডালিম ও ক্যাপ্টেন নুর।

১১ জুলাই সেক্টর কমান্ডার্স সম্মেলন উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বক্তব্য দিতে গিয়ে কর্নেল ওসমানীর পদত্যাগের বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন ‘সেক্টর কমান্ডারদের অনাস্থাবশত কর্নেল ওসমানী পদত্যাগ দাখিল করেছেন।’ তখন কমান্ডারদের মধ্য থেকে কয়েকজন দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কর্নেল ওসমানীর ওপর কমান্ডারদের আস্থা নেইÑ এ কথা প্রধানমন্ত্রী কি করে জানলেন?’ প্রধানমন্ত্রী এই প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে না পারায় বাগ্‌বিতণ্ডার সৃষ্টি হয় এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সভা শেষ করতে হয়। পরে মেজর জিয়াউর রহমান অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।

মেজর জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যকার কথোপকথন :

মেজর জিয়া : আপনি কোন যুক্তির ভিত্তিতে সকালে আপনার বক্তব্যে বললেন সেক্টর কমান্ডারদের অনাস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কর্নেল ওসমানী পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

তাজউদ্দীন (কিছুটা বিব্রত) : তার কাছে খবর রয়েছে যে বেশকিছু কমান্ডার জনাব ওসমানীর ওপর অনাস্থা পোষণ করেছেন।

মেজর জিয়া : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই, শুধুমাত্র কমান্ডারদের তরফ থেকেই নয়, সমগ্র মুক্তি ফৌজের তরফ থেকে আমাদের পূর্ণ আস্থাই যে রয়েছে কর্নেল ওসমানীর ওপর মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তা নয়Ñ তিনি আমাদের অতি শ্রদ্ধার পাত্রও বটে। তার পরিবর্তে অন্য কাউকে যদি কমান্ডার ইন চিফ বানাবার চিন্তা-ভাবনা করে থাকেন, তবে বলতে বাধ্য হচ্ছি আমাদের বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধার কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারেন। প্রবাসী সরকারের হয়তো-বা ক্ষমতা থাকতে পারে, সরকার ইচ্ছামতো একজন সর্বাধিনায়ক নিয়োগ দিতে পারে কিন্তু তার পরিণতি কি হবে সেটাও একটু ভেবে দেখবেন।’ (জনাব নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ দুজনই মেজর জিয়ার কথা শুনে ভীষণভাবে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন।কিছুক্ষণ ভেবে তাজউদ্দীন সাহেব কথা বললেন।

তাজউদ্দীন : ওসমানী সাহেব স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন। তিনি সেটা প্রত্যাহার করলে সরকার পুনঃনিয়োগ সম্পর্কে বিবেচনা করতে পারে।

মেজর জিয়া : তিনি স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিয়েছেন সেটা ঠিক। কিন্তু সম্মেলনে আপনি যে কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন সেটা সত্য নয়। কী কারণে তিনি পদত্যাগপত্র সরকারকে স্বেচ্ছায় দিয়েছেন সেটা আমরা অবশ্যই শুনব তার কাছ থেকেই। আমাদের অনুরোধ কাল সম্মেলনে আপনি বলবেন, আপনার কাছে যে খবর এসেছিল কিছু কমান্ডারের অনাস্থার ব্যাপারে সেটা তদন্তে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, আপনি আরও বলবেন উপস্থিত সব কমান্ডার এবং সমগ্র মুক্তি ফৌজের দাবি একমাত্র কর্নেল ওসমানী থাকবেন কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে। অন্য কেউ নয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে সবার তরফ থেকে আপনি স্বয়ং তাকে তার ইস্তফা প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাবেন এবং একমাত্র সেই ক্ষেত্রেই তিনি তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করবেন।

কথার ধরন দেখে বুদ্ধিমান তাজউদ্দীন আহমদ বুঝে নিলেন মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডাররা ইতোমধ্যে অনেক কিছুই জেনে গেছেন। পর্দার অন্তরালে পাশা খেলার চালগুলো সম্পর্কেও হয়তো-বা অনেকেই অবগত হয়ে পড়েছেন। তাই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে না পড়ার জন্য মেজর জিয়ার অনুরোধ মেনে নিতে রাজি হলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। পুরো মিটিংয়ে নীরব সাক্ষী হয়ে নিশ্চুপ বসেছিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

পরদিন কথামতো কাজ করলেন প্রধানমন্ত্রী। তার অনুরোধে কর্নেল ওসমানী তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে সম্মেলনের নেতৃত্ব দেওয়ার স্বীকৃতি জানালে করতালির মাধ্যমে উপস্থিত সবাই কর্নেল ওসমানীর সিদ্ধান্তকে আন্তরিক অভিনন্দন জানালেন। কর্নেল ওসমানীর নেতৃত্বে শুরু হলো সম্মেলন।

ওই সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ রব বাংলাদেশ মুক্তিফৌজের চিফ অব স্টাফ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার ডেপুটি চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন।’

ছয়.

মেজর জিয়ার উদ্যোগে প্রবাসী সরকারপ্রধান এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তিতে সেক্টর কমান্ডারগণ তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। মেজর জিয়া কেবল রণাঙ্গনের একজন দক্ষ সেনানায়ক নন, দেশ গঠনে রেখেছেন অনন্য সাধারণ ভূমিকা। তিনি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে জানতেন, স্বপ্ন দেখাতে পারতেন। তার কথায় কৃষক-শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীÑ সবাই দেশ গঠনে এগিয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াকে ভালোবেসেই মানুষ নতুন উদ্যমে দেশ গঠনের কাজে নিয়োজিত হয়েছে, যার কারণে তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব-দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। দেশের আপামর মানুষ তাকে কেমন ভালোবাসত তার নজির আমরা দেখেছি তার শেষ বিদায়ের দিনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর বিশাল জানাজায়।


আমিরুল ইসলাম কাগজী

সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা