জাতীয় সংসদ নির্বাচন
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৯ এএম
আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১২ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তুতি, নির্বাচনী মাঠে থাকা কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আস্থাহীনতা, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচন প্রশ্নে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। এমন এক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জামায়াত আমির বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে কেউ কোনো ধরনের মেকানিজম (কারসাজি) করার চিন্তা করলে তারা পালাতে বাধ্য হবে।’ বক্তব্যটি উচ্চারণের পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছেÑ এই ‘মেকানিজম’ বলতে তিনি কাদের বোঝালেন? তার এই হুঁশিয়ারি কার উদ্দেশে? আর এর রাজনৈতিক তাৎপর্যই বা কী?
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘মেকানিজম’ শব্দটি নতুন নয়। বিরোধী দলগুলোর ভাষায় এটি সাধারণত বোঝায় প্রশাসনিক প্রভাব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহার, কেন্দ্র দখল, ব্যালট কারচুপি কিংবা ফলাফল প্রভাবিত করার নানা কৌশল। জামায়াত আমির সরাসরি কোনো দল বা গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্যের ভাষা ও সময় নির্বাচন করে দেওয়া বার্তাটি স্পষ্টÑ তিনি অতীতের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর পুনরাবৃত্তি মেনে নিতে রাজি নন।
শফিকুর রহমানের বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ভোটাধিকার ও ভোটের পরিবেশের প্রশ্ন। তার ভাষায়, জামায়াত এমন একটি নির্বাচন চায়, যেখানে ভোটাররা ‘স্বস্তির সঙ্গে’ ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন, যেখানে কোনো ভয় বা সংশয় থাকবে না। এটি কেবল জামায়াতের দাবি নয়Ñ এটি দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দলগুলোর অভিন্ন অভিযোগ ও জনমতের প্রতিফলন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে জামায়াত নিজেদের এমন একটি অবস্থানে দাঁড় করাতে চাচ্ছে, যেখানে তারা শুধু একটি দল নয়, বরং ভোটাধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের প্রসঙ্গ তুলে ধরা জামায়াতের জন্য একটি কৌশলগত অবস্থান বলেও মনে করছেন অনেকে।
‘পালাতে বাধ্য হবে’Ñ কতটা হুঁশিয়ারি, কতটা রাজনৈতিক ভাষণ?
জামায়াত আমিরের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলোÑ ‘পালাতে বাধ্য হবে ইনশা আল্লাহ।’ এই ভাষা রাজনৈতিক হুঁশিয়ারির ইঙ্গিত বহন করে। তবে প্রশ্ন হলো, এটি কি কোনো আন্দোলনের ইঙ্গিত, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক ভাষণের অংশ?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াত সরাসরি সহিংস বা সংঘাতের বার্তা দেয়নি। বরং ‘সচেতন দেশবাসী’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে তিনি জনসচেতনতা ও প্রতিরোধের কথা বলেছেন। অর্থাৎ, তিনি মূলত রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের কথাই বোঝাতে চেয়েছেনÑ এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই, এই বক্তব্যে একটি কঠোর মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। অতীতে জামায়াত রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ করছে, রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে শফিকুর রহমানের কণ্ঠে এমন দৃঢ় উচ্চারণ দলটির আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির ইঙ্গিতও দেয়।
জামায়াত আমিরের বক্তব্যে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রতি সরাসরি চাপ সৃষ্টি করার বার্তাও স্পষ্ট। প্রতিটি ভোটিং বুথে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি তুলে তিনি বলেন, অর্থের অভাব নেই, অভাব সদিচ্ছার। তার মতে, সুষ্ঠু নির্বাচনই সুশাসনের পূর্বশর্ত। এখানে জামায়াত একটি বাস্তবমুখী প্রস্তাব সামনে এনেছে। যদিও সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এখনও এই প্রস্তাব নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবু এটি ভবিষ্যতে আলোচনার টেবিলে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বক্তব্যের শেষভাগে শফিকুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা তুলে ধরেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সামরিক বাহিনীর অবদানের স্বীকৃতির দাবি করেন। এই অংশটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। বিশ্লেষকদের মতে, এটি জামায়াতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানেরই প্রতিফলন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে বাংলাদেশে বরাবরই রাজনৈতিক বিভাজন রয়েছে। জামায়াত আমিরের এই বক্তব্য সেই বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, জামায়াত আমিরের এই বক্তব্যের পর এখনও বড় কোনো রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে নীরবতার মধ্যেও আলোচনা চলছে। কারা ‘মেকানিজম’ করবেÑ এই প্রশ্ন ঘিরে রাজনৈতিক অন্দরমহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অনেকে মনে করছেন, এই বক্তব্য মূলত ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশেই দেওয়া। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটি নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের জন্যও একটি বার্তা-নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে তার দায় এড়ানো যাবে না।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যকে শুধু একটি রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি একদিকে যেমন ভোটাধিকার প্রশ্নে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের একটি প্রয়াস। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এমন বক্তব্য আরও শোনা যাবেÑ এটাই স্বাভাবিক।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টÑ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন এখন আর শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়Ñ এটি আস্থা, অংশগ্রহণ ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। সেই বাস্তবতায় জামায়াত আমিরের ‘মেকানিজম’ সংক্রান্ত হুঁশিয়ারি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার খোরাক জোগাল, যা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
লেখক: ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, সাংবাদিক