ভাসমান বাগান
ড. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৩৬ পিএম
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৪৪ পিএম
বরিশালের বানারীপাড়ায় জলাভূমিতে ভাসমান বাগানে সবজি সংগ্রহ করছেন গ্রামীণ নারীরা
বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগ, যার বিপুল অংশ জুড়ে রয়েছে নদী, খাল, বিল ও জলাভূমি। জলবায়ু পরিবর্তনের চরমতম অভিঘাত যেমন লবণাক্ততা, আকস্মিক বন্যা আর জলাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এখানকার মানুষ লড়াই করছে প্রতিদিন। এমন সংকটময় পরিবেশে বরিশালের বানারীপাড়ায় গড়ে উঠেছে এক অনন্য অভিযোজন পদ্ধতি, যা পরিচিত হয়ে উঠেছে বায়রা বা ‘ভাসমান বাগান’ বা ‘ভাসমান কৃষি’ নামে। আর এই কৃষি বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন এই এলাকার গ্রামীণ নারীরা। তারা এখানে শুধু একটি নতুন কৃষিপদ্ধতি সামাজিক প্রচলন ও চর্চা করছেন না, বরং সমাজে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করছেন।
ভাসমান বাগান মূলত জলাভূমির ওপরে পানিতে ভাসমান ভিত্তি তৈরি করে সেখানে সবজি, মসলা, এমনকি ফসল চাষাবাদের পদ্ধতি। স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য কচুরিপানা, নলখাগড়া বা কলাগাছের ভেলা তৈরি করে তার ওপর মাটি বা জৈবসার দিয়ে তৈরি করা হয় এই জীবন্ত, সবুজ ভূমি। এই কৌশল বরিশালের জলাবদ্ধ ও বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য স্বর্গীয় এক আবিষ্কার। যখন গ্রীষ্ম-বর্ষায় জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয় জমি, তখন এই বাগানগুলো পানির ওপরে ভেসে থেকে নিরাপদে টিকে থাকে। এটি প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঁচার এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত।
এই কৃষি কার্যক্রমে নারীদের সাবলীল সম্পৃক্ততার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, এটি তাদের নতুন অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সুযোগ করে দিয়েছে। বাড়ির আশপাশের জলাশয়ে অবসর সময়ে দলবেঁধে তারা নিজেরাই তৈরি করছেন এই ভাসমান বাগান। লাউ, কুমড়া, পটোল, ঢেঁড়স, পালংশাক, ধনিয়া, পুঁইশাÑ এসব শাকসবজি চাষ, ফলন ও বিক্রি করে তারা পরিবারের আয়ে সরাসরি অবদান রাখছেন। আগে যেখানে নারীর শ্রম মূলত গৃহস্থালি ও সন্তান লালন-পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে এখন তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য স্থানীয় বাজার দখল করছে। এই আয়ের মূল অংশ যাচ্ছে সরাসরি নারীদের হাতেই, তাদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানো, সন্তানের পড়ালেখা, এমনকি ছোট ছোট সঞ্চয়ের নতুন পথ তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এটি গড়ে তুলেছে স্থানীয় নারীদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস। ভাসমান বাগান তৈরির কৌশল রপ্ত করা থেকে শুরু করে ফসল নির্বাচন, সার ব্যবস্থাপনা, বিপণন, এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নারীরা হয়ে উঠছেন দক্ষ কৃষি উদ্যোক্তা। তারা স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, একে অপরের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময় করছেন এবং নিজেদের মধ্যে জোট গড়ে তুলছেন। এই জ্ঞান তাদেরকে শুধু কৃষকই নয়, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ‘ইনোভেটর’-এ পরিণত করছে।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি। যখন একজন নারী পরিবারের আয়ের উল্লেখযোগ্য উৎস হয়ে ওঠেন, তখন তার কথার গুরুত্বও পরিবারে ও সমাজে বাড়ে। তিনি শুধু উপার্জনই করছেন না, তার সিদ্ধান্ত এখন কৃষিকাজ, বিনিয়োগ, এমনকি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় প্রভাব ফেলছে। এটি নারীর ক্ষমতায়নের একটি মৌলিক শর্ত পূরণ করছে।
তবে এই পথগুলো এতটা মসৃণ একেবারেই নয়। নারীরা এখনও জমি ও সম্পদে মালিকানার ক্ষেত্রে নানান সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। জলাশয়গুলোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রায়শই অস্পষ্ট। আধুনিক বাজারব্যবস্থা ও অর্থের জোগান নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। তবুও, তারা যে বিপ্লবের সূচনা করেছেন, তা স্থানীয় সমাজভিত্তিক টেকসই উন্নয়নের নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
এখন দরকার ভাসমান কৃষিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি বৈপ্লবিক কৃষি মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। নারী কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণ, তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং বিপণনের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকারকে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করে জলাশয় সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের হাতে দেওয়া যেতে পারে। বরিশালের নারীরা দেখিয়ে দিচ্ছেন, সংকটই কেবলই সংকট নয়, সেটি নতুন কোনো সম্ভাবনার জন্মস্থানও হতে পারে। ওনারা বন্যার ও জলাবদ্ধতার জলকে সমস্যা হিসেবে না দেখে, একে সমস্যা সমাধানের সঙ্গী করে নিয়েছেন। ভাসমান বাগান তাই শুধু খাদ্য নিরাপত্তার হাতিয়ার নয়; এটি বর্তমানে নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ু-সহিষ্ণুতা এবং স্থানীয় উদ্ভাবনের এক সুন্দর সম্মিলিত উদাহরণ। নারীদের হাতে গড়া এই সবুজ, ভাসমান স্বপ্ন বাংলাদেশের জলাবদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলের ভবিষ্যৎ গড়ার এক অনিবার্য ও প্রেরণাদায়ক প্রচেষ্টা।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিআইজিএম)