জন্মদিন
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৪৫ পিএম
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৪১ পিএম
শহীদ জিয়াউর রহমান
জিয়াউর রহমানের নামের সঙ্গে আমার পরিচয় পঞ্চান্ন বছর আগে। স্কুল পড়ুয়া বালক আমি সে সময়। একাত্তরের সে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ দিনগুলোতে মানুষ যখন উৎকণ্ঠিত, কী হবে তা নিয়ে উদ্বেগের সীমা নেই, তখনই ইথারে ভেসে এসেছিল এ নামটি। মার্চ মাসের এক সন্ধ্যায় (সম্ভবত ২৮ মার্চ) রেডিওর ক্ষীণ আওয়াজে অনেকের সঙ্গে বসে শুনতে পেয়েছিলাম, ‘আই মেজর জিয়া...।’ সম্ভবত ওটা ছিল আগের দিন প্রচারিত সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার পুনঃপ্রচার। ঢাকা থেকে প্রায় কুড়ি মাইল দূরের এক নিভৃত গ্রামে সেদিন সন্ধ্যায় ট্রানজিস্টার সেটের সামনে যারা বসেছিলামÑ বৃদ্ধ, যুবক, শিশু, কিশোর, সবাই সে ঘোষণা শুনে হর্ষোৎফুল্ল কণ্ঠে আওয়াজ তুলেছিলাম ‘জয় বাংলা’। আজ যখন বয়স মধ্য ষাট পার করছি, তখন হিসাব করে দেখছি, দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার আমি সাক্ষী। এক. সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি নতুন দেশের জন্ম হতে দেখা। দুই, সে যুদ্ধের যিনি ঘোষক, সেই তরুণ মেজরকে একসময় ইতিহাস সৃষ্টিকারী রাজনীতিবিদে পরিণত হতে দেখা। শত বঞ্চনার মধ্যেও মাঝেমধ্যে নিজেকে আমার এজন্য সৌভাগ্যবান মনে হয়। কারণ আমি সেই মহান মানুষটির রাজনৈতিক আদর্শের পতাকাদণ্ড হাতে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।
একাত্তরের মেজর জিয়া পঁচাত্তরে এসে হলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।
রাজনীতির টালমাটাল সময়ে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির মুখে, ত্রাণকর্তা
হিসেবে তিনি আবার আবির্ভূত হলেন। বললেন, ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বলছি…।’
সেই অভয়বাণী। ঠিক একাত্তরের মতোই। জনগণ ভরসা পেল। না, আমরা অসহায় নই। একজন অন্তত আছেন,
যিনি এই দেশ, এ দেশের মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন। এমনি করেই একজন জিয়া হয়ে উঠেছেন
বাংলাদেশের আপামর মানুষের আপনজন। ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে তিনি বারবার আবির্ভূত হয়েছেন
দিশারি হিসেবে। পথ দেখিয়েছেন এ দেশের দিশাহারা মানুষকে। একাত্তরে দেখিয়েছিলেন যুদ্ধ
করে স্বাধীনতা অর্জনের। আর পঁচাত্তরে দেখিয়েছেন সে স্বাধীনতাকে সংহত করে সার্বভৌমত্ব
রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার।
জিয়া কি ইতিহাসের সৃষ্টি, নাকি তিনি নিজেই ইতিহাসের নির্মাতা? প্রশ্নটা
যত সরল, উত্তরটা ততই কঠিন। তবে তাকে ইতিহাসের নির্মাতা বললে তা অত্যুক্তি হবে না। কেননা,
তিনি ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে একটি জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
করে স্বদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া তো নতুন ইতিহাসেরই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন।
সে ঘোষণা তিনি যার বরাতেই দিয়ে থাকুন, ওই ক্রান্তিকালে সে ঘোষণা যে কী অপরিমেয় শক্তি
সঞ্চার করেছিল অসহায় জাতির বুকে, যারা তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী, তারাই শুধু অনুভব করতে
পারবেন। এখনও ষাটোর্ধ্ব বয়সের যারা বেঁচে আছেন, তাদের অনেকেরই সে শিহরণ-জাগানো স্মৃতি
স্মরণে থাকার কথা।
স্বাধীনতার পর জিয়া নামটি খুব একটা উচ্চারিত হয়নি। আমরা জানতেও পারিনি
তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কী করছেন। অনেকেরই মনে প্রশ্নটি জেগেছে, মানুষটি গেল কোথায়?
উত্তাল সাগরে নিমজ্জমান জাহাজকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য যিনি দক্ষ ক্যাপ্টেনের
ন্যায় আবির্ভূত হয়েছিলেন, তিনি কোথায় হারিয়ে গেলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে? আসলে তিনি হারিয়ে
যাননি। তিনি ছিলেন তার সঠিক ঠিকানায়। একজন দেশপ্রেমিক ও আদর্শ সৈনিকের যা কর্তব্য,
তিনি সেটাই পালন করেছেন। যুদ্ধ-ফেরত জিয়া চলে গিয়েছিলেন তার কর্মস্থলে। রাষ্ট্রের একজন
অনুগত সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্তব্য পালনে তিনি ছিলেন নিষ্ঠ। তাই পঁচাত্তরের মধ্য
আগস্টে রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত
হওয়ার পর ২৪ আগস্ট সরকার তাকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত না করা পর্যন্ত তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালেই
ছিলেন। তবে চোখের সামনে না থাকলেও তিনি যে এ দেশের মানুষের মনের পর্দায় একাত্তরের মতোই
ঝকঝকে ছবি হয়েছিলেন তা বোঝা গেল এর পরেই। ওই বছর নভেম্বরে আধিপত্যবাদী শক্তির ক্রীড়নকদের
পাল্টা অভ্যুত্থান ও হটকারী বিপ্লবীদের দেশ বিধ্বংসী সশস্ত্র তৎপরতার সেই ঘনঘোর অমানিশাসম
সময়ে তার আবির্ভাব ঘটে রাষ্ট্রক্ষমতার পাদপ্রদীপের আলোয়। সেদিন তার সতেজ কণ্ঠের ঘোষণায়
জনমনে প্রত্যয় জন্মে, এই দেশ, এই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য
তিনি আছেন। ছিলেনও তিনি। একেবারে আমৃত্যু।
জিয়াউর রহমানকে যারা ইতিহাস-নির্মাতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, তারা
এতটুকু ভুল বলেননি, অতিশয়োক্তিও করেননি। পঁচাত্তরের নভেম্বরের ঝড়ো হাওয়ার দিনগুলোতে
তিনি যখন বাংলাদেশ নামের এই জাতি-রাষ্ট্রটির কান্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে শন্তি-শৃঙ্খলা
প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন আরেক ইতিহাসের বিনির্মাণ শুরু করলেন। রাজনীতিতে এসে তিনি
বললেনÑ ‘আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট’। তার এ উক্তিকে বিরুদ্ধবাদীরা নানা রকম অপব্যাখ্যা
করেছে। তাকে রাজনীতির ভিলেন বানানোরও কম অপচেষ্টা হয়নি। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির
গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই রাজনীতিকে কঠিন করে দিয়েছেন; যা তাকে এ দেশের
রাজনৈতিক ইতিহাসে ভিলেন নয়, রিয়েল হিরোতে পরিণত করেছে। মূলত বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতির
ধরনকে বদলে দেওয়ার চিন্তাভাবনা থেকেই ছিল তার এ উক্তি। কেননা, তিনি দেখেছেন, অতীতে
রাজনীতিকরা দূর থেকে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতেন, জনগণকে ব্যবহার করে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের
কথা বলে নিজেদের ভাগ্যের চাকাটাকে ঘুরিয়ে নিয়েছেন। জিয়াউর রহমান এই গণবিরোধী রাজনৈতিক
ধারাকে বদলে দিতে চাইলেন। তিনি বলতে চাইলেন, জনগণ আর রাজনীতি বা রাজনীতিকদের কাছে যাবে
না। বরং রাজনীতি ও রাজনীতিকদের যেতে হবে জনগণের কাছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের
সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে তিনি রাজনীতির যে নতুন ধারার প্রবর্তন করেন, পরবর্তী
পাঁচ দশক ধরে সে ধারাতেই চলছে দেশের রাজনীতি।
রাজনীতির মাঠে নেমেই মধ্যমাঠ থেকে গোল করলেন জিয়াউর রহমান। তিনি এমন
এক রাজনীতির কথা শোনালেন, বাংলাদেশের মানুষ যা আগে শোনেনি। তিনি বললেনÑ ‘এবারের রাজনীতি
হবে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি।’ সারা দেশে স্লোগান উঠলÑ ‘এবারের রাজনীতি, উন্নয়নের
রাজনীতি/ এবারের রাজনীতি, উৎপাদনের রাজনীতি।’ প্রশ্ন উঠলÑ এ আবার কেমন রাজনীতি? রাজনীতির
সঙ্গে উন্নয়ন আর উৎপাদনের সম্পর্ক কোথায়? দুটো যে পৃথক বিষয়। কিন্তু জিয়া বুঝিয়ে দিলেন,
উন্নয়ন ও উৎপাদন মোটেই রাজনীতি থেকে পৃথক কোনো বিষয় নয়। বরং অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি
আরেকটির পরিপূরক। একটি ছাড়া আরেকটি অর্থহীন। তিনি ঘোষণা করলেন, তার ঐতিহাসিক ১৯ দফা
কর্মসূচি। কী বলবেন ওই কর্মসূচিকে? শুধুই একটি রাজিনৈতিক কর্মসূচি, নাকি একটি আর্থ-সামাজিক
উন্নয়ন কর্মসূচি? জিয়া জানালেন, যে রাজনীতিতে দেশের উন্নয়ন ও জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক
উন্নয়নের পরিকল্পনা থাকে না, সে রাজনীতি জনগণের জন্য নয়। রাজনীতি হতে হবে জনসম্পৃক্ত।
থাকতে হবে তাদের ভাগ্যোন্নয়নের রূপরেখা। জিয়ার এই রাজনৈতিক চিন্তাধারা বাংলাদেশের মানুষ,
যারা এতকাল নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে অসচেতন ছিল, তারা যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। নিজেদের
অধিকার আদায়ে তারা এতটাই সচেতন হয়ে উঠল যে, ফাঁকা বুলি আওড়ে রাজনৈতিক বৈতরণী পার হওয়ার
সুযোগটাই সংকুচিত হয়ে গেল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে এটা প্রতিভাত
হয়ে ওঠে, পরবর্তী সময়ে সব রাজনীতিককেই সরাসরি জনগণের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। রাজনীতিকে
গণমানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া বা তৃণমূলে নিয়ে যাওয়ার এই ধারণাই জিয়াউর রহমানকে অনন্য
বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
এখানেও জিয়া নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। রাজনীতিতে তার আগমন ছিল আকস্মিক।
অনেকটা পরিস্থিতির অনিবার্যতার কারণে। অবস্থানও ছিল স্বল্পকালীন। জিয়ার সাফল্য হলো,
যেখানে অনেক রাজনীতিক যুগ যুগ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থেকেও জনমনে স্থানলাভ করতে পারেননি,
সেখানে জিয়াউর রহমান মাত্র পাঁচ বছরে এমন এক আসন লাভ করেছেন, যা তাকে অমরত্ব দিয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, তার প্রবর্তিত রাজনৈতিক নীতি-আদর্শ আজ অনেক রাজনৈতিক দলের কাছে অনুসরণীয়।
খেয়াল করার বিষয় হলো, ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে জিয়াউর রহমান এ দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন
ও অর্থ-সামাজিক উন্নয়নের যে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন, তার বাইরে এখন পর্যন্ত কোনো সরকার
যেতে পারেনি। হয়তো তারা তাদের কর্মসূচি সাজাতে গিয়ে জিয়াউর রহমানের নাম নেয়নি। তবে
তাদের গৃহীত কর্মসূচিতে জিয়া প্রবর্তিত উন্নয়নের রূপরেখা ছিল দেদীপ্যমান। তিনি তার
১৯ দফা কর্মসূচিতে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন জাতীয় ঐক্য, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, জনগণের
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি ও শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধি, নিজস্ব
সংস্কৃতির বিকাশ ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি। বলা যায়, একটি দেশ বা জাতির সামনে
এগিয়ে চলার জন্য যেসব অনুষঙ্গ দরকার তার সবই তিনি তার ১৯ দফায় উদ্ধৃত করে গেছেন। আর
তাই জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচিকে বাতিঘর হিসেবে আখ্যায়িত করাটা অযৌক্তিক হবে না।
অন্ধকার রাতে সমুদ্রগামী জাহাজকে বাতিঘর যেমন সঠিক পথে চলার দিকনির্দেশনা দেয়, তেমনি
জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা বাংলাদেশকে সামনে চলার সঠিক পথ দেখিয়ে চলছে।
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলীর এক নিভৃত পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেছিল একটি শিশু; সবাই আদর করে যার নাম রেখেছিল ‘কমল’। সেই শিশুটি একদিন এ দেশের নতুন ইতিহাস পরিবর্তনের দিকপাল হিসেবে আবির্ভূত হবে, এটা হয়তো তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। অথচ তারই কণ্ঠে এ দেশের মানুষ শুনেছিল অভয়বাণী, তিনিই বাজিয়েছিলেন স্বাধীনতার ডঙ্কা-নিনাদ। স্বীয় দেশপ্রেম আর মানবকল্যাণের দ্বারা সেদিনের শিশু কমল পরিণত হয়েছেন বাংলাদেশের হৃদ-কমলে। ক্ষণজন্মা সে মহান মানুষটির প্রতি জানাই শ্রদ্ধা।