পাহাড় কাটা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৫ এএম
পাহাড়-বন-সাগর ও জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য মিলনস্থল টেকনাফ। কিন্তু সেই টেকনাফ আজ ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখে। দিনের পর দিন সেখানে চলছে নির্বিচার পাহাড় কাটা। এক্সকাভেটর (ভেকু) ও শ্রমিক দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি ও বিভিন্ন ভরাট কাজ চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো হেলদোল নেই। বলা চলে বিনা বাধায়, প্রকাশ্যেই চলছে পাহাড় ধ্বংসের এক ভয়ংকর ‘মচ্ছব’। যেখানে আইন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ সবই যেন উপেক্ষিত। টেকনাফের সৌন্দর্য, পর্যটন সম্ভাবনা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য পাহাড়ের ওপর নির্ভরশীল। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা হয়তো সাময়িক লাভ দেবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা পুরো অঞ্চলের জন্য আত্মঘাতী।
১৭ জানুয়ারি প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এ ‘টেকনাফে দিনেদুপুরে চলছে পাহাড় কাটার মচ্ছব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য
উঠে এসেছে। প্রকাশিত
প্রতিবেদনে জানা যায়, এলাকার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের আমতলী, দৈংগাফাটা ও লাতুরীখোলা এলাকায়
রাতের আঁধারে, আবার কখনও প্রকাশ্যেই পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব মাটি ভরাট
ও নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী
মহল দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। তারা সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন
পাহাড় দখল করে নির্বিচারে পাহাড় কেটে পরিবেশ ধ্বংস করছে। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট
হওয়ার পাশাপাশি ধুলাবালু ও ভারী ড্রামট্রাক চলাচলের কারণে হোয়াইক্যং-শামলাপুর সড়কসহ
আশপাশের এলাকার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি এবং হুমকির মুখে
পড়ছে পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বসতবাড়ি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা। ধ্বংস হচ্ছে বনজ সম্পদ
ও জীববৈচিত্র্য। পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে ভূমিধসের ঝুঁকি
বহুগুণে বেড়ে যাবে এবং বর্ষা মৌসুমে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত
পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর অভিযান, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পরিবেশ রক্ষায়
স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি তাদের।
আসলে পাহাড় কাটা
শুধু ভূমির গঠন বদলায় না, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। টেকনাফের
পাহাড়ি অঞ্চল মূলত বনভূমি, যেখানে রয়েছে বিরল উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক জলাধার।
এসব পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়ার ফলে প্রথম আঘাত আসে বনজ সম্পদের ওপর। গাছ কাটা হয়,
প্রাণীর আবাস ধ্বংস হয়, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যায়। পরিবেশের এই ক্ষতি একবার হলে তা আর
সহজে পূরণ হয় না। ইতোমধ্যে টেকনাফে ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। বর্ষা এলেই দেখা
দেয় পাহাড়ধসের শঙ্কা। অতীতে কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলে পাহাড়ধসে প্রাণহানির বহু নজির
রয়েছে। পাহাড় কেটে সমতল করার ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ নষ্ট হয়, ফলে ভারী বৃষ্টিতে
পানি জমে মাটি সরে যায়। এর পরিণতি হয় ভয়াবহÑ মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর ওপর
নেমে আসে বিপর্যয়।
আমরা মনে করি,
এটি শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়Ñ এটি জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিবেশ সংকটের সঙ্গে যুক্ত। পাহাড়
ও বন উজাড়ের ফলে কার্বন শোষণের ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সমুদ্রের কাছাকাছি এই অঞ্চলে পাহাড় ধ্বংস হলে লবণাক্ততা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, ক্ষতিগ্রস্ত
হয় কৃষি ও মিঠাপানির উৎস।
পরিবেশের পাশাপাশি
সামাজিক সমস্যাও বেড়ে যায়। পাহাড় কেটে গড়ে উঠছে অবৈধ বসতি, হোটেল-মোটেল, দোকানপাট ও
বিভিন্ন স্থাপনা। স্থানীয় প্রশাসনের চোখের সামনে, কখনও-বা নীরব সম্মতিতে, পাহাড় কাটা
চলতে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। পরিবেশ আইন থাকলেও তার বাস্তব
প্রয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ।
বলা বাহুল্য,
টেকনাফে পাহাড় কাটা একটি প্রতীকী চিত্র মাত্র। কার্যত সারা দেশে পাহাড়-অধ্যুষিত প্রতিটি
এলাকার চিত্র একই। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে এই পরিবেশ ধ্বংসের
কাজ চলে। দুঃখজনক হলো, আমরা উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ক্রমাগত ধ্বংস করছি। এ এক আত্মবিধ্বংসী
প্রবণতা।
তাই এখনই প্রয়োজন
কঠোর পদক্ষেপ। দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে, সে যত প্রভাবশালীই হোক।
অবিলম্বে পাহাড় কাটা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও স্থানীয়
প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে পাহাড় সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত
করতে হবে। টেকনাফের পাহাড় শুধু মাটির স্তূপ নয়; এটি প্রকৃতির ঢাল, মানুষের নিরাপত্তা
ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ। পাহাড় কাটার এই মচ্ছব বন্ধ না হলে একদিন টেকনাফ নিজেই তার
অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। তাই পরিবেশ ধ্বংসের এই নীরব উৎসব আর চলতে দেওয়া যায় না। আমরা
মনে করি, পরিবেশ বাঁচাতে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবেÑ নীরব দর্শক হয়ে থাকার আর সুযোগ নেই।