× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জাতীয় সংসদ নির্বাচন

মনোনয়নপত্র বাতিলের পরে বৈধতা পাওয়া

হোসেন আবদুল মান্নান

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৫ এএম

মনোনয়নপত্র বাতিলের পরে বৈধতা পাওয়া

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটা অদ্ভুত ব্যাপার চলমান থাকে। বিষয়টি লক্ষ করার মতনও বটে। বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চিত্র প্রায় একই। দেশজুড়ে শত শত প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রাথমিক পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হয়ে যায়, পরবর্তীতে সবাই একে একে নির্বাচন কমিশন এবং উচ্চ আদালতে গিয়ে তার বৈধতা পায়। মধ্যবর্তী সময়টা একজন এমপি প্রার্থীকে কীভাবে পার করতে হয় সেটা কেবল তিনি এবং তার সমর্থকই উপলব্ধি করতে পারবেন, অন্যরা নয়। দেশের জাতীয় সংসদের সদস্য পদের যোগ্য যেকোনো প্রার্থীর জন্যেই এটা দুর্ভাগ্যজনক ও সম্মানহানিকর বিষয় বলে প্রতীয়মান হয়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ে অর্থাৎ রিটার্নিং কর্মকর্তার কর্যালয় থেকে এমনটা হচ্ছে। সচরাচর রিটার্নিং কর্মকর্তারা কমিশন নির্ধারিত তার সহযোগীদের মাধ্যমে দাখিলকৃত কাগজপত্রের চুলচেরা হিসাবনিকাশ করে থাকেন। তখন তারা প্রার্থীদের প্রতি সদয় থাকতে পারেন না। সকলের জন্য সমান নীতিতে চলেন কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করতে যান না।

এ সময় তারা ঝুঁকি এড়িয়ে গিয়ে নির্বিঘ্নে দায়িত্বে থাকতে পছন্দ করেন। বিতর্ককে পরিহার করার নানা কৌশল অবলম্বন করেন। অনেক সময় দেখা যায়, অতি নগণ্য বা তুচ্ছ কারণেও একজন স্বনামধন্য জাতীয় ব্যক্তিত্বেরও মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে, যা হয়তো জেলা পর্যায়েই সুরাহাযোগ্য ছিল। কিন্তু না, প্রার্থীকে প্রথমে নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে হবে। কমিশনের আদেশের বিপক্ষে সংক্ষুব্ধ হলে শেষে হাইকোর্ট বিভাগ ও চেম্বার জজ করে এবং বড় বড় বিখ্যাত, প্রভাবশালী অ্যাডভোকেটদের সহযোগিতায় কূলকিনারা করেন। এর জন্যে সুপ্রিম কোর্টের করিডোর ধরে তাকে বেশ কিছু দিন নিরন্তরভাবে দৌড়াতে হয়। এবং অভাবনীয় পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা সফলকাম হচ্ছেন। তাৎক্ষণিক হাইকোর্ট থেকেই মেসেজ চলে যাচ্ছে তার মনোনয়ন বৈধ হয়েছে, তিনি বিজয় নিয়ে এলাকায় ফিরে আসছেন। বিজয় মিছিলের আয়োজন করা হবে। কিন্তু মাঝখানের ক’দিনের অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপস্থিতি তার ইমেজকে ভূলুণ্ঠিত করে ফেলতে পারে। নির্বাচনী এলাকার সাধারণ ভোটারের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তার ওপর তৈরি জনমতে বিরূপ মনোভাব আসতে পারে। এমন অবস্থার মুখোমুখি হওয়া একজন প্রার্থীর জন্যে কখনোই শোভনীয় নয়। ধরা যাক, একজন প্রার্থীর আবাসিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যুৎ বিলের বকেয়া, একাডেমিক সনদপত্রের কপি সরবরাহে অনাগ্রহিতা বা ভুলবশত দাখিল না করা, ব্যাংক লেনদেনের হেরফের হওয়া এমনসব বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তর থেকে কিছু সময় দিয়ে সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারেন এবং একই সঙ্গে ‘মনোনয়ন বাতিল’ করা হয়েছে বা এ মর্মে তাৎক্ষণিকভাবে প্রচার না করা।

 

নমিনেশনপত্র দাখিলের পরে আরেকটা বড় সমস্যা সামনে আসে তা হলো, স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকার ১% ভোটারের স্বাক্ষর/টিপসহি সংগ্রহ করে তালিকা জমা দেওয়া। আবার কেউ কেউ জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিসহ রিটার্নিং অফিসার বরাবর দাখিল করে থাকেন। এতে কোনো নির্বাচনী এলাকায় ৫ লাখ ভোটার হলে ৫ হাজার সমর্থকের স্বাক্ষর/টিপসহি বা ভোটারের আইডি কার্ডের কপি সংগ্রহপূর্বক জমা দেওয়ার ঝামেলায় পড়ে। পরবর্তীতে কমিশনের মনোনীত কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কম্পিউটার প্রোগ্রামের মাধ্যমে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে ১০টা স্বাক্ষর/ টিপসহি যাচাই করার সময় একটি বা দুটোতে গরমিল হতে পারে। অথবা অজানা কারণে কোনো সমর্থক হঠাৎ করে অস্বীকার করতে পারে যে, স্বাক্ষরটি তার নয়। জানা যায়, এখানেই সমস্যা হচ্ছে সর্বাধিক। দেখা যাচ্ছে যে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়াই সবচেয়ে বেশি ঝামেলাপূর্ণ। ফলে যেকোনো দলনিরপেক্ষ, যোগ্য, উচ্চশিক্ষিত তথা জনপ্রিয় প্রার্থীও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে হতাশ হয়ে ফিরে আসছেন। অথচ একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও অবাধ করতে চাইলে স্বতন্ত্র প্রার্থীকেই বিশেষভাবে স্থান করে দেওয়া উচিত বলে সুশীল সমাজ মনে করে। কেননা তারা নিবন্ধিত কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী নন। তারা দলান্ধ বা চাটুকারিতার বাইরে, তারাই প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের প্রধান অনুষঙ্গ এবং সৌন্দর্য। তাদেরকে হেয় করে, তাচ্ছিল্য করে কখনও ভালো নির্বাচন প্রত্যাশা করা অমূলক। ইতোমধ্যেই দেশের কয়েকজন শীর্ষ স্থানীয় প্রার্থী এ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক বলে মন্তব্য করেছেন। ভবিষ্যতে এই নীতিমালায় সংশোধন আনা না হলে দেশে ভালো মানুষের অংশ-গ্রহণে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশা সুদূরপরাহত।

অন্যদিকে সামগ্রিক যোগ্যতায় পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও দলীয় ব্যানারে যে কেউ যেকোনো প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছেন। তার বেলায় বিশেষ কোনো জটিলতা পোহাতে হচ্ছে না।


কেন রিটার্নিং অফিসারের অফিস থেকে গণহারে প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়? এমন প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, মূলত আরপিও বা গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২ এবং পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বিভিন্ন আদেশের ভাষায় কিছুটা অস্পষ্টতা থাকা, স্থানীয়ভাবে প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক চাপ থাকা এবং রিটার্নিং কর্মকর্তার নিজস্ব কিছু এখতিয়ারকে খর্ব করার কারণেই আপিলের মিছিল এত প্রলম্বিত হয়ে থাকে। বাতিলের পরে প্রায় সকলেই ধরে নেন, অসুবিধা নেই আপিল করে নিয়ে আসতে হবে। এতে কেউ উদ্বিগ্ন না হয়ে বরং তার কর্মী, সমর্থকদের আশ্বস্ত করেন, চিন্তা কর না আপিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। পত্রিকায় প্রকাশ, ‘ইসিতে প্রথম দিনের এমন শুনানিতে ৭০টি আপিলের মধ্যে ৫২টি মঞ্জুর হয়েছে’। বাকি ১৫টি হয়তো উচ্চ আদালতে যাবে এবং স্ব স্ব প্রার্থিতা বৈধ করে নিয়ে আসবে। তাহলে কেন এই অপমান, অপদস্ত আর মানসিক যাতনা? পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে আরও বলা হয়েছে, ‘আইনি দুর্বলতায় বাতিলকৃতরা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় টিকে যাচ্ছে’।

এমন বাস্তবতায় বলা যায়, সময় বদলে গেছে, যুগের হাওয়া পরিবর্তন হয়েছে। গতানুগতিক নীতিমালা ও শর্তে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান দিন দিন জটিলতা বাড়াচ্ছে। কাজেই নির্বাচন কমিশন তথা সরকারকে আরপিওতে সময়োপযোগী সংশোধনী আনতে হবে। বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের যুগে একজন প্রার্থী কেন এতটা ঝক্কিঝামেলার মুখোমুখি হবেন সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। যেখানে একটা সিঙ্গেল ক্লিকই তার জন্য কী কী করণীয় বা বর্জনীয় সে দিকনির্দেশনা দিতে পারে। যদিও নির্বাচনের জন্য প্রধান পূর্বশর্তসমূহ বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত রয়েছে। অবশিষ্ট শর্তাবলি আরপিওর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। যেকোনো জাতীয় নির্বাচনে নাগরিকের অংশগ্রহণকে আরও সহজবোধ্য এবং শঙ্কামুক্ত করা প্রয়োজন। বলা বাহুল্য, প্রার্থীর সংখ্যা বেশি মানে ভোটারের উপস্থিতি বেশি। সকল নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে হলে, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত মিলনমেলা দেখতে হলে আরপিওতে আধুনিক প্রযুক্তি সহায়ক করে পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি।


 

হোসেন আবদুল মান্নান

গল্পকার ও কলামিস্ট 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা