× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পদ্মা সেতু

এটি আমাদের বন্ডের টাকায়ও হতে পারত

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, দাউদ ইব্রাহিম হাসান

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২১ এএম

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৬ এএম

পদ্মা সেতু

পদ্মা সেতু

আজ যখন পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে শত শত গাড়ি হুহু করে ছুটে চলে, তখন বুকটা এক গভীর আবেগে ভরে ওঠে। এই সেতু তো শুধু কংক্রিট আর স্টিলের কাঠামো নয়, এটি আমাদের জাতীয় স্বপ্নের, আমাদের সক্ষমতার এক মহাকাব্য। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অব্যক্ত বেদনার সুর যেখানে আমরা, এই দেশের সাধারণ মানুষ, আমাদের এই আপন সম্পদের সরাসরি অংশীদার হতে পারিনি। আমাদের কাছে যে টাকা ছিল, যে ভালোবাসা ছিল, তা সরাসরি আমাদের স্বপ্নের কারিগর হতে পারত। মনে পড়ে, যখন বিশ্বব্যাংক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তখন জাতি একাট্টা হয়ে শপথ নিয়েছিল : ‘আমরা পারব!’ আমরা পেরেছি, কিন্তু সেই পারার মধ্যে যদি জনগণের বন্ডের মাধ্যমে আরও নিবিড় অংশগ্রহণ থাকত, তবে সে গর্বের ওজন আরও হাজারগুণ বেড়ে যেত।

আসুন, একবার পরিসংখ্যানের আয়নায় নিজেদের দেখি। ২০১৫ থেকে আজ ২০২৫ সাল পর্যন্ত, আমাদের মেগা প্রকল্পগুলো যেন এক বিরাট অঙ্কের খেলা খেলছে। যখন সরকার বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য হাত বাড়ায়, তখন তার প্রথম পছন্দ হয় বিদেশি বন্ধু বা সংস্থা। এই দশকের (২০১৫-২০২৫) প্রধান প্রকল্প, যেমন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল (এমআরটি), মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অবশ্যই পদ্মা সেতুÑ সব মিলে মোট প্রায় $৭০ বিলিয়ন ডলার (৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা)-এর বিনিয়োগ। এর মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ (প্রায় $৪৩.৪ বিলিয়ন ডলার বা ৩,৪৫,৩০৮ কোটি টাকা) আসে বৈদেশিক ঋণ হিসেবে। এই তথ্য আমরা পেয়েছি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সমীক্ষা, পরিকল্পনা কমিশন এবং সিপিডি প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে। এই বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে যখন কাজ হয়, তখন একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার মন কেঁদে ওঠে কেন আমার সঞ্চয় দেশের কাজে সরাসরি লাগল না? কেন আমাদের টাকা, যা ব্যাংকে বা সঞ্চয়পত্রে সামান্য সুদে পড়ে আছে, তা দিয়ে আমাদেরই স্বপ্নের ইমারত গড়ে উঠল না?

সরকার কেন এই সহজ পথে গেল না? কেন দেশের মানুষের কাছ থেকে বন্ডের মাধ্যমে টাকা নিয়ে এই গর্বের অংশীদারত্ব দিল না? এর কারণগুলো শুধু অর্থশাস্ত্রের জটিল সমীকরণ নয়, বরং তা আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক নির্ভরতার এক কঠিন বাস্তবতার গল্প। আমাদের মনের এক কোণে ৩০টি প্রশ্ন কাঁটার মতো বিঁধে আছে। প্রথমত, আমাদের পুঁজিবাজার কি এত বিশাল অঙ্কের (যেমন, পদ্মা সেতুর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা) বন্ড শোষণ করার মতো যথেষ্ট পরিপক্ব ছিল? হয়তো ছিল না। জনগণ তাদের কষ্টের টাকায় সব সময় একটি নিরাপদ ও উচ্চ সুদের হার (সঞ্চয়পত্রের মতো, প্রায় ১০%+) আশা করে। অন্যদিকে, বিদেশ থেকে জাপান বা চীন যে ঋণ দেয়, তা আসে মাত্র ১% থেকে ৪% সুদে, সঙ্গে থাকে দীর্ঘ ১৫ থেকে ৪০ বছরের পরিশোধের সময়। আবেগের জোরে যদি জনগণের বন্ড নিতাম, তবে সরকারের ওপর সুদের বোঝা অনেক বেশি চাপত। এটি একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা, যা বৈদেশিক ঋণের স্বল্প সুদের হার এবং দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ড (৫-১০ বছর পর্যন্ত) পাওয়ার সুযোগকে প্রাধান্য দেয়।

দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে আসে ডলার, যা মেগা প্রকল্পের যন্ত্রপাতি, প্রকৌশলী ও সরঞ্জাম আমদানির জন্য অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রযুক্তি-নির্ভর প্রকল্পে বিদেশি কারিগরি সহায়তা ও ডলার ছাড়া এক কদমও এগোনো সম্ভব ছিল না। এই ঋণ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও দরকারি, যা বিশ্বমঞ্চে আমাদের দরকষাকষির শক্তি বাড়ায়। কিন্তু এই সুবিধাগুলো ভোগ করার পরিণতি হলোÑ ঋণের দায় বেড়ে যাওয়া এবং সুদের অর্থ বিদেশিদের পকেটে চলে যাওয়া।

যদি আমরা সাহস করে জনগণের বন্ডের পথে হাঁটতাম, তবে আজ আমাদের গল্পটা অন্য রকম হতো। আমরা পেতাম ৩০টি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফলের এক স্বর্ণালি ফসল। ধরুন, পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্পের জন্য যদি ‘পদ্মা বন্ড’ ছাড়া হতো, তবে এই দেশের প্রতিটি নাগরিক সেই সম্পদের মালিকানার গর্ব নিয়ে বাঁচতে পারত। আমাদের প্রথম এবং প্রধান সুফল হতো অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব। প্রতিবছর বিদেশি ঋণের সুদ হিসেবে যে শত শত কোটি টাকা ডলার আকারে বিদেশে চলে যাচ্ছে, সেই টাকাটা দেশের জনগণের হাতে ফিরে আসত।

অন্যদিকে, আমাদের প্রকৌশলী ও দেশীয় ঠিকাদাররা দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পেত। যদি দেশীয় প্রকৌশলীদের ৭০% কাজ দেওয়া যেত, তবে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা প্রায় ২৫% থেকে ৩০% বেড়ে যেত। আমরা কেবল অন্যের ডিজাইন অনুসরণ না করে, নিজস্ব মেধা দিয়ে বিশ্বমানের কাজ উপহার দিতে পারতাম। সর্বোপরি, এই প্রক্রিয়ায় জনগণের কঠোর নজরদারি তৈরি হতো, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলত।

ঋণের বোঝা কমানোর যে ১০টি কারণ আপনি জানতে চেয়েছেন, তা আজকের পরিস্থিতিতে এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলার মতো। যদি আমরা বন্ডে অর্থায়ন করতাম, তবে আমাদের বৈদেশিক ঋণ/জিডিপি অনুপাত প্রায় ৫% থেকে ১০% কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। কিন্তু এখন অবস্থাটা কী? এই সারণিটির দিকে তাকালে বুক কেঁপে ওঠে। এখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ঋণের চাপ কীভাবে বছর বছর বাড়ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এই দায় কীভাবে চেপে বসছে।

 

অর্থবছর

সরকারি ঋণ (জিডিপির শতাংশে)

বৈদেশিক ঋণের স্থিতি (বিলিয়ন ডলারে)

সুদ পরিশোধ (বিলিয়ন ডলারে, আনুমানিক)

মন্তব্য ও প্রক্ষেপণ

২০১৫-১৬

৩৫.৯৮%

$৪০.৮

$১.০৫

ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে শুরু (অর্থ মন্ত্রণালয়)

২০১৮-১৯

৩৪.৬৫%

$৫২.২

$১.৪৬

মেগা প্রকল্পগুলো গতি পায় (বাংলাদেশ ব্যাংক)

২০২০-২১

৪০.৪০%

$৬১.৫

$১.৮০

কোভিড-পরবর্তী ঘাটতি মেটাতে ঋণ বৃদ্ধি (আইএমএফ)

২০২২-২৩

৪১.০৭%

$৭৬.৬

$২.৮৮

চাপ সর্বোচ্চ, রিজার্ভ সংকটের শুরু (অর্থ বিভাগ)

২০২৪-২৫ (প্রাক্কলন)

৩৯.৩৭%

$৮৪.০

$৩.৫০

ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ চাপ। আইএমএফ-এর শর্ত পালন। (বাজেট ডকুমেন্টস ও বিশ্বব্যাংক প্রক্ষেপণ)

২০৩০ (প্রক্ষেপণ)

৪৩.০০%

$১১০.০

$৫.২০

বড় ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হবে। চাপ আরও বাড়বে। (সিপিডি বিশ্লেষণ)

২০৪০ (আশা)

৩০.০০%

$৮০.০

$৩.০০

যদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কঠোর হয়। (লেখকের বিশ্লেষণ)

 

২০২৪-২৫ সালের প্রক্ষেপণ (সারণি অনুসারে) বলছে, আমাদের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি প্রায় ৮৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে এবং সুদ পরিশোধের জন্য বছরে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাবে। ভাবুন, এই বিপুল অঙ্কের টাকা যদি দেশের অভ্যন্তরে থাকত! আর ২০৩০ সালের প্রক্ষেপণ আরও ভয়াবহÑ যখন বড় ঋণগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হবে, তখন ঋণের বোঝা আরও বেড়ে যাবে এবং জিডিপির ৪৩% পর্যন্ত ঠেকতে পারে। এই ঋণের বোঝা তো আমরা, অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বহন করবে। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আলোর রেখা দেখতে হবে। এই পরিবর্তনের জন্য কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, বরং সাধারণ মানুষ ও সকল সংস্থার একযোগে কাজ করতে হবে।

তাই, আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। এখন থেকে সঞ্চয়পত্রের মতো পরিচিত ও আরামদায়ক বিনিয়োগের পাশাপাশি নতুন জাতীয় অবকাঠামো বন্ড-এ বিনিয়োগে আগ্রহী হতে হবে, যদিও প্রাথমিকভাবে সুদের হার হয়তো কিছুটা কম হতে পারে। দেশের উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখার যে জাতীয় গর্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, তা বোঝার মাধ্যমে আমরা আমাদের বিনিয়োগের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারি। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সংস্থার করণীয় (ব্যাংক, বীমা, পুঁজিবাজার) : ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডগুলোকে তাদের মোট সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন, ২% থেকে ৫%) জাতীয় অবকাঠামো বন্ডে বিনিয়োগের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

তৃতীয়ত, সরকারের মূল ভূমিকা (২০২৬-২০৫০) : সরকারকে অবশ্যই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত প্রতিটি টাকার হিসাব, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং আর্থিক বিবরণ জনগণের কাছে নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে হবে। একটি শক্তিশালী ‘সভরেন গ্যারান্টি ফান্ড’ তৈরি করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ সময়মতো পরিশোধের নিশ্চয়তা দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাজস্ব আহরণের হার দ্রুত বাড়াতে হবে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই ২০৫০ সালের মধ্যে আমরা বৈদেশিক ঋণের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনে, দেশের অর্থেই দেশের স্বপ্নের ইমারত গড়ার সেই চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব। বিদেশি ঋণের ভারে নয়, আমাদেরই রক্তের উষ্ণতায় গড়ে উঠুক স্বপ্নের সকল ভিত্তি; হৃদয়ে জাগুক বিদ্রোহী সুরÑ ‘আমার অর্থেই আমার গর্ব, আমার উন্নয়নেই আমার মুক্তি!’


ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা