ইমেইল থেকে
আসাদুজ্জামান খান মুকুল
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১৩ এএম
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১৭ এএম
শীতকাল আসে। কুয়াশার চাদরে ঢেকে দেয় চারদিক। হিমেল বাতাসের ছোঁয়ায় শরীরে শিহরণ জাগে। ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দু মুক্তোর মতো চিকচিক করে। বাড়ি বাড়ি নবান্নের ঘ্রাণ, ধানকাটা শেষে চারদিকে খোলা মাঠ। শীতকালের এমন সৌন্দর্যের মাঝেই গ্রামের মানুষ একসময় নানান রকম উৎসবে মেতে উঠত। সেইসব উৎসবের আজ কিছুই দেখা যায় না। হারিয়ে গেছে শীত ঘিরে আমাদের সেই চিরায়ত প্রাণের স্পন্দন। প্রকৃতি তার অমোঘ নিয়মে চলে এলেও মানুষ আজ হয়ে পড়েছে বড় বেশি যান্ত্রিক, বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক। গ্রামবাংলার শীতের সেই ঐতিহ্য আজ কেবল আমাদের মতো কিছু মানুষের স্মৃতির পাতায় ধুলো-মলিন হয়ে বেঁচে আছে।
আমাদের ছোটবেলায় শীত আসত উৎসবের বার্তা
নিয়ে। তখন শীত মানে কেবল হাড়কাঁপানো ঠান্ডা ছিল নাÑ ছিল এক অন্য রকম কর্মযজ্ঞ।
এখনকার মতো ঘুম থেকে উঠে মোবাইল ফোনের পর্দায় মগ্ন হওয়া নয়, বরং কুয়াশাভেজা ভোরেই
শুরু হতো জীবনের চাঞ্চল্য। গ্রামের ঘরে ঘরে ঢেঁকির শব্দে ঘুম ভাঙত মানুষের। নতুন
আমন ধান সেদ্ধ করে শুকিয়ে চাল করা, তারপর সেই চালের গুঁড়ো দিয়ে পিঠা বানানোর
তোড়জোড় ছিল দেখার মতো। মা-চাচিদের সেই হাতের জাদু আর পরম মমতায় তৈরি ভাপা, চিতই
কিংবা নকশিপিঠার সুঘ্রাণে ম-ম করত সারা বাড়ি। বাড়ির উঠোনে খড়কুটো জ্বালিয়ে যে
আগুনের কুণ্ডলী তৈরি হতো তাকে ঘিরে চলত পাড়াপড়শির আড্ডা। কুয়াশা ভেদ করে সূর্য
ওঠার আগ পর্যন্ত চলত হাসি-গল্পের সেই আসর। আজ মানুষ ঘরের কোণে হিটার বা দামি কম্বল
মুড়ি দিয়ে বসে থাকে। যে কারণে সেই সামাজিক প্রীতি আর হৃদয়ের উষ্ণ বন্ধনটা আর কারও
মাঝে নেই। যান্ত্রিকতা আমাদের আরাম দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে প্রাণের সেই
অমলিন আনন্দ।
সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে শীতের বিকালের সেই
গাছিদের ব্যস্ততা। মাটির কলস হাতে নিয়ে গাছিরা সারিবদ্ধভাবে খেজুর গাছে উঠতেই শুরু
হতো আমাদের অপেক্ষার পালা। কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে সেই টাটকা রসের স্বাদ
নেওয়া ছিল এক দারুণ অনুভূতি। এখন গ্রামের মাঝে আগের মতো সারিবদ্ধ খেজুর গাছ চোখে
পড়ে না, গাছিরা তো বিলুপ্তপ্রায় এক পেশাজীবী। নগরায়ণের করাল গ্রাসে কাটা পড়ছে গাছ
আর আধুনিক যুগের খাদ্যাভ্যাসের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে সেই স্বাদ। সেই রসের পায়েস এখন
হয়তো শহরের কোনো বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ বা মেলায় চড়া দামে কেনা যায়। কিন্তু তাতে সেই
মেঠো গন্ধ আর মানুষের হাতের ছোঁয়ার আন্তরিকতা পাওয়া যায় না।
শীতের সেই সোনালি দিনগুলোতে আমাদের
সবচেয়ে বড় বিনোদন ছিল গ্রামের বিশাল খালি মাঠগুলো। আজ সেই মাঠগুলোর দিকে তাকালে
মনটা হাহাকার করে ওঠে। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন এই মাঠগুলোই ছিল আমাদের কৈশোরের
আনন্দের ঠিকানা। শীতের দুপুরে বা বিকালে আমরা মেতে উঠতাম হা-ডু-ডু, দাঁড়িয়াবান্ধা
আর গোল্লাছুটে। একদলের দশ-বারোজন যখন হা-ডু-ডু খেলায় প্রতিপক্ষকে জাপটে ধরতাম, তখন
শরীরের তপ্ত রক্তে শীতের প্রকোপ নিমেষেই উধাও হয়ে যেত। ধুলোমাখা গায়ে সন্ধ্যায় ঘরে
ফিরলেও সেই ক্লান্তির মাঝেই লুকিয়ে থাকত অপার্থিব এক সুখ। আজ সেই মাঠগুলো নতুন
নতুন ঘরবাড়ির ভিড়ে সংকুচিত হয়ে গেছে। কেউবা নিজের প্রয়োজনমতো কাজে লাগাচ্ছে। তাই
আর অল্পবিস্তর জায়গায় গোল্লাছুটের দাগ কাটে না আমাদের শিশুরা। যে কারণে আগের মতো
শোনা যায় না শিশুদের সেই মধুর কলকাকলি। আজকের প্রজন্মের শৈশব বন্দি হয়ে গেছে চার
দেয়ালের মাঝে ভিডিও গেমসের কৃত্রিম জগতে। তারা জানলই না মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে
থাকা প্রাচীন সেই উল্লাস।
রাতের বিনোদন ছিল আরও চমৎকার ও
বৈচিত্র্যময়। পাড়ায় পাড়ায় বসত পুঁথি পাঠের আসর, বাউল গান, লাঠিখেলা, যাত্রাপালা
কিংবা নাট্যশালার অস্থায়ী মঞ্চ। হারিকেন আর টর্চলাইটের আলোয় মানুষ মাইলের পর মাইল
কুয়াশা ঠেলে হেঁটে যেত পালাগান শুনতে। কুয়াশাচ্ছন্ন সেই রাতগুলো বিষণ্ন ছিল না,
বরং ছিল উৎসবমুখর। খড়ের গাদায় বসে রাতভর জারি-সারি শোনা কিংবা নবান্নের মেলায় গিয়ে
বাঁশের বাঁশি কেনাÑ এসবই ছিল বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন মেলা বসে
ঠিকই, কিন্তু সেখানে প্লাস্টিক আর যান্ত্রিক কোলাহলের ভিড়ে নিখুঁত শিল্পের কারুকাজ
খুঁজে পাওয়া যায় না। যাত্রা বা জারিগানের ঐতিহ্যবাহী জায়গা আজ দখল করেছে
উচ্চশব্দের ডিজে বক্স আর স্মার্টফোনের ভার্চুয়াল জগৎ। এই পরিবর্তন কেবল বিনোদনের
নয়, বরং আমাদের রুচি ও সংস্কৃতির অবক্ষয়েরও ইঙ্গিত দেয়।
প্রকৃতিও আজ তার ভারসাম্য হারাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীতের স্থায়িত্ব কমছে, ঋতুচক্র ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে।
নগরায়ণের চাপে গ্রামের সেই সবুজ মেঠোপথ আজ পিচঢালা রাস্তায় রূপ নিয়েছে। আর খোলা
মাঠ দখল নিচ্ছে যত্রতত্র ইটভাটা। জলাশয় ভরাট হচ্ছে, গাছপালা উজাড় হচ্ছে। এর ফলেই
শীতের সেই নির্মল আমেজ আজ মলিন হয়ে পড়েছে। আমাদের শৈশব, আমাদের লোকজ খেলাধুলা আর
মানুষের সঙ্গে মানুষের সেই নিবিড় বন্ধন যেন সময়ের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে। স্মৃতির
জানালা দিয়ে যখন উঁকি দেই, তখন সেই খেজুরগাছ, সেই খেলার মাঠ আর বন্ধুদের সেই
অকৃত্রিম হাসিমুখগুলো আজও মনের কোণে সজোরে কড়া নাড়ে।
আমরা হয়তো আধুনিকতার অনেক সুবিধা
পেয়েছি, জীবন হয়েছে সহজ ও আরামদায়ক। তবু শীত এলেই মনে পড়ে যায়Ñ এই আরামের ভেতর
কোথাও যেন একটা শূন্যতা রয়ে গেছে। ঢেঁকির শব্দ নেই, মাঠভরা ছেলেবেলার দৌড়ঝাঁপ নেই,
সন্ধ্যার আড্ডাগুলোও আর গড়ে ওঠে না। শীত এখন আর উৎসব হয়ে আসে না, আসে কেবল
ক্যালেন্ডারের একটি ঋতু হয়ে।
কখনও কুয়াশাভেজা ভোরে দাঁড়িয়ে মনে হয়,
আমরা হয়তো অনেক দূর এগিয়েছি, কিন্তু ফেলে এসেছি এমন কিছু জিনিসÑ যেগুলোর কোনো
বিকল্প নেই। সেই হারিয়ে যাওয়া শীতের দিনগুলো আর ফিরবে কি না জানি না। শুধু জানি,
স্মৃতির ভেতর তারা আজও নীরবে বেঁচে আছে।
আসাদুজ্জামান খান মুকুল
হেমগঞ্জ বাজার, নান্দাইল,
ময়মনসিংহ