ইমেইল থেকে
কাজী আশফিক রাসেল
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৮ এএম
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ছিল শুক্রবার। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পুরো প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়া, নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে প্রশ্নফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে সারা দেশে শতাধিক জালিয়াতি চক্রের সদস্য ও অসাধু পরীক্ষার্থী আটক হয়েছে। সকল দিক নির্মোহভাবে বিবেচনা করলে এটা বললে অত্যুক্তি হবে না, এবারের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায়।
১৪ হাজারেরও বেশি পদের বিশাল এই নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন পরীক্ষার কয়েক
ঘণ্টা আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়া এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সয়লাব হয়ে যাওয়ার ঘটনা
এদেশের লাখো বেকার তরুণের স্বপ্নকে নির্মমভাবে চূর্ণ করেছে। যাদের কাছে এই পরীক্ষা
ছিল জীবনের মোড় ঘোরানোর একমাত্র সুযোগ, তাদের কাছে এটি এখন রাষ্ট্রীয় অবহেলার
প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও যখন প্রতিযোগিতামূলক
পরীক্ষার প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়, তখন মেধা, শ্রম ও সততার কোনো মূল্য থাকে না। রাষ্ট্র
নিজেই যদি প্রতারণার সুযোগ করে দেয়, তখন তরুণদের আর কিসে আস্থা রাখার কথা?
জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং স্বৈরাচার পতনের মূল
চালিকাশক্তি ছিলেন দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী তরুণরা। বুকের তাজা
রক্ত ঢেলে দিয়ে তারা একটি ন্যায্য, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন
দেখেছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এসে সেই তরুণ সমাজই আজ সবচেয়ে বেশি
উপেক্ষিত। রাষ্ট্র সংস্কারের বড় বড় বুলি শোনা গেলেও বেকার সমাজের দুর্দশা লাঘবে
এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এই প্রশ্নফাঁসের ঘটনা আবারও প্রমাণ করে
দিয়েছে, বিদ্যমান নিয়োগ ব্যবস্থা পুরোপুরি পচে গেছে। নিয়োগ পদ্ধতির আমূল সংস্কার
না করে একের পর এক পরীক্ষা আয়োজন মানেই চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে নির্মম তামাশা করা।
প্রশ্ন থেকে শুরু করে পরীক্ষা কেন্দ্র, সবখানেই দুর্নীতির জাল এতটাই বিস্তৃত যে
সাধারণ মেধাবীদের জন্য সেখানে জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার দায় কে নেবে?
বছরের পর বছর রক্ত জল করা পরিশ্রম কি শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল চোরদের পকেটেই যাবে? এই
প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়ে রাষ্ট্র যদি আবারও নির্বিকার থাকে, তবে তরুণ সমাজের
হতাশা ভয়াবহ রূপ নিতেই পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও প্রশ্নফাঁস বন্ধ
হয়নি, নিয়োগ বাণিজ্যও থামেনি। আমরা এমন একটি সরকার আশা করেছিলাম, যারা ক্ষমতায়
বসেই পুরনো দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো ভেঙে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা পাচ্ছি একটি
পুতুল সরকার, যারা প্রয়োজনীয় সংস্কারের সাহস দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রায় দুই হাজার
জুলাই শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে সরকার পরিবর্তনের শপথ নিয়েছিল, তারা আজ সেই
শপথ রক্ষা করতে পারছে না।
আমি মনে করি, প্রশ্নফাঁসের দায় এড়ানোর একমাত্র পথ হলো, এই নিয়োগ
পরীক্ষা বাতিল করা এবং সম্পূর্ণ সংস্কারকৃত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায়
নতুন করে পরীক্ষা আয়োজন করা। অন্যথায় এই অন্যায়ের দায় ইতিহাস ক্ষমা করবে না।
কাজী আশফিক রাসেল
হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট।