একাদশ সংসদ নির্বাচন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৫১ পিএম
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি ছিল অর্থ ও ক্ষমতার জোরে রাষ্ট্র ও সরকার-কাঠামোকে দখলে রাখার সুপরিকল্পিত অপরাধযজ্ঞ। ওই নির্বাচনে ব্যাংক দখল ও ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে এবং ব্যক্তি কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি চাঁদাবাজি করা হয়। ওই অর্থ দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করা হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন তথা পুরো নির্বাচন-কাঠামো। বিভিন্ন সূত্র, তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ওই নির্বাচনে ভোটডাকাতি ও অর্থ লুটপাটের পরিকল্পিত অপরাধযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে জেতাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিনের ভোট আগের দিন রাতে করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এই তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তারাই কমিশনের কাছে রাতে সিল মেরে রাখার কথা স্বীকার করেছেন। কমিশন বলেছে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, সরকারি কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা কঠিন ছিল।
১৫
জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ হাসিনার রেজিমে একাদশ সংসদ নির্বাচন চিত্র :
সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের
ওই নির্বাচনে পুলিশ বাহিনী ছিল পরিকল্পিত ওই অপরাধযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দুতে। একই
সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও তিনটি ইউনিট, দুটি গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসন
ক্যাডারের (ডিসি, ইউএনও ও বিভাগীয় কমিশনার) কর্মকর্তারাও প্রত্যক্ষভাবে এতে জড়িত
ছিলেন। ভোটডাকাতিতে উৎসাহ দিতে এদের হাতে ‘প্রণোদনা’র মোড়কে তুলে দেওয়া হয়
আনুমানিক সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা।
জানা
গেছে, ২০১৮ সালের ১৭ ডিসেম্বরের পর থেকে তৎকালীন ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, আটটি
রেঞ্জের ডিআইজি, আটটি মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার এবং বিশেষ ইউনিটপ্রধানদের হাতে
এই অর্থ তুলে দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অর্থসংগ্রহের মূল দায়িত্ব দেওয়া
হয়েছিল সরকারের অনুগত একজন শীর্ষ ব্যবসায়ীকে। ভোটডাকাতির পুরো সাড়ে ৮ হাজার কোটি
টাকাই সংগ্রহ করেন তিনি। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাতকে জিম্মি করে চাঁদাবাজি ও
লুটপাটের একমাত্র লক্ষ্য ছিল নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা ধরে রাখা।
আসলে গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হলো জনগণের অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।
পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে গত তিনটি নির্বাচনেই সেই শর্তগুলোকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা
করা হয়। একাদশ সংসদ নির্বাচনেও বিরোধী দল ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার
পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। ভোটের তিন দিন আগে থেকেই সরকারের হয়ে মাঠ দখলে সক্রিয় ছিল
প্রশাসন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আগের দিন রাত ১০টা থেকে রাত ৩টার মধ্যেই প্রশাসন
এবং দলীয় কর্মীরা মিলে ভোটডাকাতি করে। পরের দিন ভোটার উপস্থিতির অস্বাভাবিক পরিসংখ্যান
এবং প্রশাসনের একচেটিয়া ভূমিকা প্রমাণ করেÑ এটি ছিল জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন একটি নির্বাচন।
নির্বাচনটি ছিল জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়ার নির্মম উদাহরণ, যেখানে
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি অবৈধ সরকার ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে। নির্বাচন নামের
যে প্রক্রিয়াটি গণতন্ত্রের প্রাণ, সেই প্রক্রিয়াকেই পরিকল্পিতভাবে ভেঙে চুরমার করা
হয়েছিল। জনগণ সেদিন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি, বরং ভোটের আগের রাতেই
ব্যালট বাক্স ভরে ফেলার অভিযোগ দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়। সেই বিবেচনায় একাদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক গভীর কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
আমরা মনে করি, এই নির্বাচনের মাধ্যমে সেদিন যে সরকার গঠিত হয়, তাকে
অবৈধ বলার পেছনে শক্ত যুক্তি রয়েছে। কারণ ক্ষমতার বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকে, আর
সেই সম্মতি যদি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নিশ্চিত না হয়, তবে সেই সরকার গণতান্ত্রিক
বৈধতা হারায়। একাদশ সংসদের ক্ষেত্রে জনগণের সেই সম্মতি স্পষ্টভাবে অনুপস্থিত ছিল। ফলে
রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার জায়গাও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
ভোটাধিকার হরণ শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে
রাষ্ট্র ও সমাজে। নাগরিকরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তরুণ সমাজ হতাশ হয়, আর রাষ্ট্রীয়
প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা ভেঙে পড়ে। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর
নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এর ফলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, শক্তিশালী হয় কর্তৃত্ববাদী
শাসনব্যবস্থা। ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী বাংলাদেশের চিত্র ছিল সেরকমই।
একাদশ সংসদ নির্বাচন
আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়Ñ গণতন্ত্র কখনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকে থাকে না, তাকে রক্ষা করতে
হয় সচেতন নাগরিক শক্তি দিয়ে। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া মানে জনগণের কণ্ঠরোধ করা, রাষ্ট্রকে
জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। একটি অবৈধ সরকার কেবল রাজনৈতিক ক্ষতিই করে না, বরং
অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। এই অভিজ্ঞতা থেকে
শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
আমরা মনে করি, জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী
করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতেই কেবল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব। আমরা
একাদশ সংসদ নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি চাই না। আমরা চাই, চিরদিনের জন্য অতীত হোক সেই কলঙ্ক।