× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নতুন অভিবাসন

ইউরোপের দুর্গ, বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত

আবু জুবায়ের

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪০ পিএম

ইউরোপের দুর্গ, বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত

ভূমধ্যসাগরের লোনা জলে প্রতিবছর কত স্বপ্ন তলিয়ে যায়, তার সঠিক পরিসংখ্যান কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার ডায়েরিতে লেখা থাকে না। কিন্তু তিউনিসিয়া কিংবা লিবিয়ার উপকূলে ভেসে ওঠা একেকটি লাশ একেকটি পরিবারের সারা জীবনের স্বপ্নভঙ্গের গল্প হয়ে থাকে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অভিবাসন নীতিতে যে আমূল পরিবর্তন এনেছে, তা ভূমধ্যসাগরের ওই উত্তাল ঢেউয়ের মতোই বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে ধেয়ে আসছে। এতদিন আমরা অভিবাসন সংকটকে কেবল মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছি, নৌকাডুবি, মৃত্যু কিংবা ডিটেনশন সেন্টারের কান্না হিসেবে। কিন্তু ইউরোপের নতুন অভিবাসন চুক্তি বা ‘নিউ প্যাক্ট অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম’ কার্যকর হওয়ার পর বিষয়টি আর কেবল মানবিক সংকটে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অস্তিত্বের সংকটে রূপ নিয়েছে।

একসময়ের উদারনৈতিক ইউরোপ এখন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। সীমান্তে তারা তুলে দিচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া, আইনে আনছে কঠোরতা। এই পরিবর্তনকে বিশ্লেষকরা বলছেন ‘ফোর্ট্রেস ইউরোপ’ বা ‘দুর্গ ইউরোপ’-এর উত্থান। আর এই দুর্গের দরজা বন্ধ হওয়ার বড় আঘাতটি আসছে বাংলাদেশের ওপর।

বদলে যাওয়া ইউরোপ ও ডানপন্থার দাপট এক দশক আগেও ইউরোপের চিত্র এমন ছিল না। ২০১৫ সালে সিরীয় শরণার্থী সংকটের সময় জার্মানির তৎকালীন চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল বলেছিলেন, ‘আমরা সামলাতে পারব।’ কিন্তু ২০২৪-২৫ সালে এসে ইউরোপের সুর সম্পূর্ণ উল্টো। ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও হাঙ্গেরির মতো দেশে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান অভিবাসনবিরোধী মনোভাবকে উস্কে দিয়েছে। তারা এখন অভিবাসীদের দেখছে ‘নিরাপত্তার হুমকি’ হিসেবে।

নতুন ইইউ চুক্তির মূল কথাই হলো সীমান্তে কঠোর স্ক্রিনিং, দ্রুততম সময়ে আশ্রয়ের আবেদন বাতিল করা এবং যাদের আবেদন টিকবে না, তাদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। আগে যেখানে একজন অভিবাসী ইউরোপে ঢুকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বছরের পর বছর থাকার সুযোগ পেতেন, নতুন আইনে সীমান্তে বসেই তাকে ‘না’ বলে দেওয়া হবে। ফ্রন্টেক্সের তথ্যমতে, অনিয়মিত পথে ইউরোপে প্রবেশকারীদের তালিকায় বাংলাদেশিদের অবস্থান ওপরের দিকে। ফলে এই ‘না’ শোনার তালিকায় সবার আগে থাকবে আমাদের দেশের তরুণেরা।

ফেরত পাঠানোর রাজনীতি ও আর্টিক্যাল ২৫-এ সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ইইউ ভিসা কোডের ‘আর্টিক্যাল ২৫-এ’। এই ধারাটি বাংলাদেশের জন্য এক বড় কূটনৈতিক চপেটাঘাত। সহজ কথায়, ইউরোপ বলছে ‘তোমরা যদি তোমাদের অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত না নাও, তবে আমরা তোমাদের সাধারণ নাগরিকদেরও ভিসা দেব না।’

এটি কোনো ফাঁকা বুলি নয়। এর আগেও সাময়িকভাবে বাংলাদেশের ওপর এই চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ইউরোপ যদি সত্যি সত্যি এই ধারা কঠোরভাবে প্রয়োগ করে, তবে কেবল অবৈধ অভিবাসী নয়, বরং বৈধ পথে যারা উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চান, যারা ব্যবসায়ী কিংবা যারা নিছক পর্যটক সবাই ভুক্তভোগী হবেন। ভিসার প্রসেসিং সময় বেড়ে যাবে, ফি বাড়বে এবং রিজেকশন রেট বা প্রত্যাখ্যানের হার আকাশচুম্বী হবে। এটি একটি সার্বভৌম দেশের জন্য চরম অবমাননাকর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি এই আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস পাচ্ছে? নাকি আমরা কেবল ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (SOP) স্বাক্ষর করেই দায় সারছি?

রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটার আশঙ্কা বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড তিনটি কৃষি, তৈরি পোশাক এবং রেমিট্যান্স। এর মধ্যে ইউরোপ থেকে আসা রেমিট্যান্সের বড় অংশ পাঠান তারা, যারা সেখানে অনিয়মিতভাবে বা ‘অড জব’ করে টিকে আছেন। নতুন আইনের ‘রিটার্ন স্পন্সরশিপ’ বা ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া জোরদার হলে হাজার হাজার বাংলাদেশি কাজ হারাবেন। একজন তরুণ যখন ১০-১৫ লাখ টাকা খরচ করে, জমিজমা বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ইউরোপে যান, তখন তার ওপর পুরো পরিবারের আশা-ভরসা থাকে। তাকে যখন শূন্য হাতে ফেরত পাঠানো হয়, তখন তিনি কেবল ‘ডিপোর্টি’ হিসেবে ফেরেন না, তিনি ফেরেন ঋণের বিশাল বোঝা মাথায় নিয়ে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামাবে। সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণতা এবং হতাশা বাড়বে। যে রেমিট্যান্স আমাদের রিজার্ভকে পুষ্ট করে, ইউরোপের দরজা বন্ধ হলে সেই প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে, যা বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য মোটেই সুখকর নয়।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এখন জোরালো দাবি উঠছে যে, বাণিজ্য সুবিধাকে অভিবাসন সহযোগিতার শর্তের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হোক। অর্থাৎ, বাংলাদেশ যদি অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত নিতে গড়িমসি করে, তবে তাদের শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল বা স্থগিত করা হতে পারে। যদি এমনটি ঘটে, তবে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীদের কাছে বাজার হারাবে। লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হবেন।

মেধার অপচয় বনাম মেধা পাচার ইউরোপের নীতি এখন দ্বিমুখী। তারা একদিকে ‘ব্লু কার্ড’ বা ট্যালেন্ট পার্টনারশিপের মাধ্যমে আমাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও আইটি বিশেষজ্ঞদের স্বাগত জানাচ্ছে, অন্যদিকে অদক্ষ শ্রমিকদের তাড়িয়ে দিচ্ছে। একে বলা হচ্ছে ‘সিলেক্টিভ মাইগ্রেশন’। এর ফলে বাংলাদেশ ‘ব্রেন ড্রেইন’ বা মেধা পাচারের শিকার হচ্ছে। আমাদের সেরা সন্তানরা চলে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের বিশাল অদক্ষ যুবগোষ্ঠী যাদের কর্মসংস্থান দরকার তাদের পথ রুদ্ধ হচ্ছে।

অথচ ইউরোপের জনসংখ্যা কমছে, তাদের বুড়ো হয়ে যাওয়া সমাজের জন্য কেয়ারগিভার, কৃষিশ্রমিক ও নির্মাণশ্রমিক প্রয়োজন। বাংলাদেশ এই চাহিদা পূরণ করতে পারত। কিন্তু আমাদের দক্ষ জনশক্তি তৈরির ব্যর্থতা এবং কূটনৈতিক দুর্বলতার কারণে আমরা সেই বাজার ধরতে পারছি না। আমরা পাঠাচ্ছি অদক্ষ মানুষ, যারা গিয়ে অবৈধ হয়ে পড়ছেন, আর ইউরোপ নিচ্ছে আমাদের মেধা। এই সমীকরণটি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী।

আমাদের করণীয় কী? সমস্যাটি জটিল, কিন্তু সমাধান অসম্ভব নয়। ‘দুর্গ ইউরোপ’ ভাঙার সাধ্য আমাদের নেই, কিন্তু সেই দুর্গে প্রবেশের সম্মানজনক চাবিটি আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।

প্রথমত, অন্ধের মতো জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ করতে হবে। ইউরোপ এখন অদক্ষ মানুষ চায় না। আমাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে (TTC) ঢেলে সাজাতে হবে। ইউরোপের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, শেফ, নার্স তৈরি করতে হবে। একজন দক্ষ কর্মীকে ইউরোপ কখনোই ফেরাবে না।

দ্বিতীয়ত, মানব পাচার ও দালালের দৌরাত্ম্য থামাতে হবে। গ্রামপর্যায়ে যে দালাল চক্র ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ভূমধ্যসাগরের মৃত্যুফাঁদে তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে, তাদের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। রাষ্ট্র যদি এখানে কঠোর না হয়, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে না।

তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ‘কূটনৈতিক দরকষাকষি’। ইউরোপ আমাদের ওপর চাপ দেবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদেরও পাল্টা যুক্তি থাকতে হবে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার একটি দেশ। আমাদের মানুষদের আশ্রয় দেওয়া উন্নত বিশ্বের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এ ছাড়া, আমরা যে তাদের সস্তা শ্রম ও পোশাকের জোগান দিচ্ছি, সেই বিষয়টিকে আলোচনার টেবিলে আনতে হবে।

আমি বলতে চাই, ইউরোপের অভিবাসন আইনকে কেবল ‘পরের বাড়ির সমস্যা’ ভাবার সুযোগ নেই। এটি এখন আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। একবিংশ শতাব্দীতে এসে কোনো দেশ তার সীমানা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে না, কিন্তু যারা নিজেদের দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে পারে না, তাদের জন্য দরজা খোলারও কেউ নেই। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আমরা কি প্রস্তুত?


আবু জুবায়ের 

কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা