× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জাতীয় সংসদ নির্বাচন

ইশতেহারে শিক্ষাখাতে সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

ড. মাহরুফ চৌধুরী

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৫৫ পিএম

ইশতেহারে শিক্ষাখাতে সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের আয়োজন নয়; পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এটি জাতির জন্য আত্মপরিচয় পুনর্নির্মাণ ও ভবিষ্যৎ দিগ্‌দর্শন নির্ধারণের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। এমন সময়ে নির্বাচনী ইশতেহার কোনো সাধারণ ঘোষণাপত্রের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং তা হতে হবে একটি রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রচিন্তার দলিল, যেখানে প্রতিফলিত রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্র পরিচালনায় তাদের নৈতিক অবস্থান, মানবিক সংবেদনশীলতা, বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমাজকে কোন পথে এগিয়ে নিতে চায় তার সুস্পষ্ট রূপরেখা। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বারবার দেখা গেছে, শিক্ষা বিষয়ে অধিকাংশ ইশতেহারে ঘুরেফিরে এসেছে কিছু অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ও পুনরাবৃত্তিমূলক বাক্যবন্ধ। সেখানে প্রস্তাবিত রূপকল্পে অনুপস্থিত থেকেছে গভীর দার্শনিক ভিত্তি, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও কাঠামোগত সংস্কারের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিকÑ গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নবযাত্রা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পুনর্গঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমরা কি এমন এক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শিক্ষা কেবল প্রশাসনিক একটি খাত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এমন এক সমাজ নির্মাণের সাহস দেখাব, যেখানে শিক্ষা হবে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, নাগরিক চরিত্র গঠনের প্রধান মাধ্যম এবং বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার? এ প্রশ্নের উত্তর থাকা চাই প্রতিটি রাজনৈতিক দল বা জোটের নির্বাচনী ইশতেহারে।

দর্শনের ইতিহাস আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয় যে, একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের চরিত্র ও মানসিক কাঠামো তার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক প্লেটো (৪২৭-৩৪৮ খ্রিস্টপূর্ব) তার রিপাবলিক গ্রন্থে বলেছেন, রাষ্ট্র যেমন মানুষ তৈরি করে, মানুষ তেমনি রাষ্ট্রকে গড়ে তোলেÑ এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো শিক্ষা। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্ব) আরও এগিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রকে একটি নৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যেখানে নাগরিকদের গুণাবলি গড়ে তোলাই ছিল শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য। আধুনিক যুগে এই ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন মার্কিন শিক্ষাবিদ জন ডিউই (১৮৫৯-১৯৫২); তিনি শিক্ষা ও গণতন্ত্রকে অপরিহার্যভাবে একত্রিত করেছেন। তার মতে, শিক্ষা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাবের কারণে শিক্ষা হয়ে ওঠে যান্ত্রিক, নীরস ও প্রাণহীন। এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি শিক্ষাকে রাষ্ট্রগঠনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করছে, নাকি কেবল উন্নয়ন সূচকের একটি পরিসংখ্যানমূলক খাত হিসেবে দেখছে?

আমাদের সমাজে শিক্ষার বিস্তার যে ঘটেছে, তা সত্য, কিন্তু তার মান, গভীরতা এবং জীবনঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। শিক্ষার ভেতর ক্রমশ ঢুকে পড়েছে নম্বর অর্জনের প্রতিযোগিতা, ডিগ্রির মোহ এবং চাকরির নিশ্চয়তার একমুখী আকাঙ্ক্ষা, যা শিক্ষাকে কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থের উপকরণে পরিণত করছে। অথচ প্রকৃত শিক্ষা কখনোই শুধু অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম নয়Ñ এটি মানুষের নৈতিক বোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, যুক্তি ও সমালোচনামূলক চিন্তার ভিত্তি নির্মাণের প্রক্রিয়া।

স্বৈরাচারী রাষ্ট্রব্যবস্থায় দলীয়করণের কারণে শিক্ষার রাজনীতি একদিকে যেমন কলুষিত হয়ে পড়েছে, তেমনি দুর্নীতির করালগ্রাস শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। এমন অবস্থায় জাতিকে সত্যিকারের মুক্তি দিতে হলে শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং বিশেষভাবে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আরও স্পষ্ট ও সুসংহত হতে হবে। আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষার গুণগত মান কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে মাপা যায় নাÑ এটি নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মানবিকতা, পেশাগত নৈতিকতা ও আত্মসম্মানবোধের চর্চা, গবেষণার স্বতন্ত্র পরিবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কল্যাণমুখী সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে। যদি নির্বাচনী ইশতেহারে শুধুমাত্র অবকাঠামো নির্মাণ, প্রযুক্তির ব্যবহার বা সংখ্যা-পরিসংখ্যানের কথাই বলা হয়, কিন্তু শিক্ষকের পেশাগত মান উন্নয়ন, শিক্ষার দর্শন ও নৈতিক কাঠামো নিয়ে নীরবতা বজায় থাকে, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত বাহ্যিক, অস্থায়ী এবং গভীর মানসিক ও সামাজিক প্রভাবশূন্য হয়ে পড়ে। শিক্ষা তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করার বদলে কেবল প্রশাসনিক খাতের ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের কর্মকাণ্ডেই আবদ্ধ থাকবে।

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, আসন্ন এই নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রেক্ষাপটগুলোর একটি হলো নতুন প্রজন্মের বিপুল সংখ্যক প্রথমবারের মতো ভোটাধিকারপ্রাপ্ত ভোটারদের অংশগ্রহণ। তারা এমন একসময়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করছে এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে যখন বিশ্বব্যবস্থা অনিশ্চিত, শ্রমবাজার ক্রমশ রূপান্তরশীল এবং পরিচয়ের সংকট গভীর। এই তরুণদের কাছে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়Ñ এটি অর্থপূর্ণ জীবনের সন্ধান, রাষ্ট্রের পরিসরে নাগরিকদের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার নিশ্চয়তা। তারা জানতে চায়, রাষ্ট্র তাদেরকে কেমন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাদের নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর রূপকল্পটি কেমন এবং সেখানের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাটা কেমন হবে।

রাষ্ট্র ও শিক্ষার সম্পর্ক স্বভাবতই সুনিবিড় এবং একে অন্যের পরিপূরক হলেও সেটা একদিকে নৈতিক, অন্যদিকে ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক। যে রাষ্ট্র শিক্ষাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেয় না, তা কেবল নাগরিকদের ভবিষ্যতের দক্ষতা বা সক্ষমতা বিকাশে ব্যর্থ হয় না, বরং তাদের নৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকেও উপেক্ষা করে। আর তার প্রতিফলন পড়ে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর নানাভাবে; বিশেষ করে সর্বত্র দুর্নীতির স্বাভাবিকীকরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সহিংসতার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদে ন্যায়ভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, তারা প্রথমেই সমন্বয় সাধন করেছে রাষ্ট্রীয় দর্শনের সঙ্গে শিক্ষার দর্শনের এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে বছরের পর বছর ধরে। সেখানে শিক্ষা কেবল দক্ষতা বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির মাধ্যম নয়; এটি চরিত্র নির্মাণ, নৈতিক বোধ জাগরণ এবং যোগ্য নেতৃত্ব গঠনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে সেই সমাজে শিক্ষা ও রাষ্ট্রের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিশ্চিত করেছিল দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, ন্যায়সংগত ব্যবস্থাপনা এবং সমৃদ্ধ জনগণের অংশগ্রহণ।

গণতন্ত্র কেবল রাস্তাঘাট, পথপ্রান্তর, মাঠময়দান ও গণমাধ্যমে হুঙ্কার কিংবা হাহাকার করার মাধ্যমে টিকে থাকে না; এটি জীবনের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি মানুষের আচার-আচরণে এবং সমাজের কাঠামোয় জীবন্ত হতে হবে। এজন্য শিক্ষার মাধ্যমে গণতন্ত্রায়ণের প্রাথমিক হাতেখড়ি ও সেটাকে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়িত্ব দেওয়া অত্যাবশ্যক। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য শিক্ষার রূপরেখা সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করার সময় এখন। পাশাপাশি থাকতে হবে শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা পুনর্নির্ধারণের অঙ্গীকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুশাসনের রূপরেখা, বৈষম্য নিরোধের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ, গবেষণার স্বাধীনতা ও পরিবেশ, সমালোচনামূলক চিন্তার সুরক্ষা এবং সর্বোপরি মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রতিশ্রুতি, যা শিক্ষাকে শুধু জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলবে।

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে বাস্তব অর্থেই বুঝতে শিখতে হবে যে, কোনো বিমূর্ত ধারণা বা কাঠামো নয়; রাষ্ট্র হলো মানুষের সমষ্টিগত নৈতিক সত্তা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শিক্ষার মাধ্যমে নির্মিত হয় এবং শিক্ষাই জাতীয় গৌরবের পরম্পরা ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে। যদি নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাকে কেবল প্রশাসনিক খাতে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে রাজনীতি তার গভীরতম দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায় এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ক্ষীণ হয়ে পড়ে। তাই ন্যায়নীতি, সাম্য এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করতে হলে শিক্ষাকে কেবল উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; শিক্ষা হতে হবে রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু যেখানে নাগরিক অধিকার সুনিশ্চিত করতে মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার শিক্ষা, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং রীতিনীতি চ্যালেঞ্জ করার নৈতিক শক্তি, আইন ও সামাজিক ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতার চর্চা সুদৃঢ়ভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শিক্ষার এই পূর্ণাঙ্গ রূপকল্পই হবে গণতান্ত্রিক, ন্যায়নিষ্ঠ এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের অন্যতম প্রাথমিক স্তম্ভ। তারই সূচনা করতে হবে রাজনৈতিক দল বা জোটের নির্বাচনী ইশতেহারের ঘোষণায়।


ড. মাহরুফ চৌধুরী

ভিজিটিং ফ্যাকাল্টিইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটনযুক্তরাজ্য

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা